মনের বালিশ

শামীম আজাদ

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

সত্তরের শেষের দিকে ’পদাবলী’ নামে একটি সংগঠন করেছিলেন ( আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ , শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ যার অগ্রনী ছিলেন) ক’জন স্বনাম ধন্য কবি । যার মাধ্যমে বাংলাদেশে সর্ব প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে কবিদের কবিতা পাঠ শুরু হয়। পদাবলীর প্রথম পরিবেশনায় সবার আগে মঞ্চে উঠেছিলেন সাইয়িদ আতিকুল্লাহ। মঞ্চে নীল আলোর অঙ্গার আর পেছনে সুরযন্ত্রের স্বাদ। প্রথম দর্শক মুখোমুখি আতিকুল্লাহ ভাই। এদিকে আমরা সেইসব গ্রহের কূচোরাও মহা উত্তেজিত। আমি আর দিলারা হাফিজ দরোজাতেই দর্শকদের হাতে তুলে দিচ্ছিলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনের রাঙা গোলাপ ও ব্রশিওর ।

একফাঁকে গ্রীনরুমে এসে দেখি আমাদের কবিকূলের যা অবস্থা! গরম চায়ে গলা পরিষ্কার করছেন রফিক ভাই, পানির গ্লাস হাতে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন বেলাল ভাই। তারপর ঘেমে নেয়ে মঞ্চে উঠলেন এবং নামলেন শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুন, বেলাল চৌধুরী এবং শেষে সকলেই তাদের দায় মুক্ত হলেন।

পরদিন ঢাকা শহরে, বিটিভির সংবাদে ও পত্রিকায় হৈ চৈ। কবিদের পারফর্মেন্স বলে কথা ! ভাবী কালে তাদের অনেকেই অত্যন্ত ভালো পারফর্ম করলেও সেদিন কিন্তু সন্ধ্যে হতেই দর্শক আসতে থাকলে গ্রীণ রুমে অনেকেরই হাড়ের শব্দ শোনা গেছে।

পদাবলীর দ্বিতীয় অনুষ্ঠাণে (দিলারা হাফিজ ও রুবি রহমানের সংগে ডানের ছবিতে ৩য় শো’এর) সত্যিকার পারফমেন্স পোয়েট্রি পেলাম বন্ধু ত্রিদিব দস্তিদারের ’তাবিজ’ কবিতায়। বেইলী রোড গাইড হাউস মঞ্চে। শূশ্র মন্ডিত জিন্স পরা ত্রিদিবের কোমড়ের কাছে তখন চেইনদিয়ে আটকানো থাকতো তার চাবি। সেদিন সে দীর্ঘ ও কন্ঠস্থ কবিতার সঙ্গে তার শরীর সংকেতে সেটাই হয়ে ঠেছিলো এক সোনার তাবিজ।

দিলারা হাফিজ ও রুবি রহমানের সংগে ডানের ছবিতে ৩য় শো’তে

কবির স্বনির্বাচিত পঙক্তি বিন্যাসই তার আবাস ও আশ্রয়। আর “কবির বিশ্বাস এবং সত্যই – তার কবিতা (জীবনানন্দ দাশ)।” তবে এও বলা যায় বিশ্বাস মানেই যুক্তিহীণতা। কতগুলো ঘটনার পরম্পরা ও পৌণঃপূনিকতা থেকে জন্ম নেয়া এক ধরণের মনো-আস্ফালণ। কবিমনে বাস্তব ঘটনার পারম্পর্য ও মূহুর্ত মনোলোকে যে প্রতিচ্ছায়া বা প্রতিরূপ তৈরি করে – যে বাণীরূপ জন্ম দেয় তার অন্তে ঝোলে ওই বিশ্বাস নামের এক অলীক শব্দ। কী তার রূপ, যার মরমে তা প্রতিস্থাপিত হয় কেবল সেই তা জানে তার বেদনা-আনন্দ। কবি তো সেই স্ফটিক স্বচ্ছ অশ্রুই ঝরাতে চান কাব্য প্রেমিকের প্রাণে। চান তার মনের মৃত্তিকায় বিশ্বাস বৃক্ষ বুনতে। আর সে বৃক্ষ কান্ডে ফোটে ফুল কিন্তু গায়ে লতিয়ে ওঠে অর্কিড। কোনো কার্যকরণের কম্পোস্ট ছাড়াই।

’কবিতা পারফরমেন্স’ হচ্ছে কবিতা বৃক্ষের এক সজাগ অর্কিড যা কিনা তা জড়িয়ে জেগে ওঠে। পারফর্মেনস এর বাংলা পরিবেশনা বলা যায় কিন্তু তাতে ঠিক ব্যপারটা বোঝা যাচ্ছেনা। কবিতা পারফরমেন্স বললে একটু নাটকের প্রতিভাস জেগে উঠে যা কিনা আসলে নাটকীয়ভাবে কবিতা পরিবেশনই।কখনো লাইভ মিউজিক, দর্শকদের হাতের তুড়ি তালিধ্বনি, কখনো মিউজিক ট্র্যাক ব্যবহার করে কবিতার পারফরমেন্স হতে দেখেছি। শ্রোতারা কবি, অকবি, শিল্পী , শিল্পরসিক ও নানান সাধারণ মানুষ তা উপভোগ করেন। এর শ্রোতা, শুধু পাঠ এর শ্রোতা থেকে বেশি। ধারণা করি তা কবিতার নিয়মিত বোদ্ধা মহল ও ছাড়িয়ে যায়। আমার কাছে এ অপরিমেয় চিত্ত প্রশমন চর্মচক্ষু মোহন এবং শ্রবণ হরণ।

ব্যাপারটি নতুন না। সেই মহুয়া মলুয়ার কাহিনী থেকে কবির মন মনন ও মেধা ওভাবেই মানুষের কাছে ফেরী হয়েছে। হার্প আর অন্ধ হোমার জীবন্ত হয়ে উঠেছে। হয়তোবা আজো কোনো নতুন কবি কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে কূপির আগুনের আলোয় মিশেল অন্ধকারে পারফমেন্স করছেন তার নতুন পদ্য ও পয়ার। তাই আমি এখন যখন এ নতুন মিলেনিনিয়ামে লন্ডনে থিয়েটার স্ট্রাটফোর্ডে আমার প্রিয় কবি জন হেগলীকে তার ছোট্ট গিটার সদৃশ ইয়োকোলোলী সুরযন্ত্র বাজিয়ে স্যূট টাই পড়ে শরীর বাঁকিয়ে চুড়িয়ে এ্যাক্রেব্যাটদের মত আলু বা সারমেয় বিষয়ক কবিতা পারর্ফম করতে দেখি- বিস্মিত হই না, অনেক উপভোগ করি।উপভোগ করি রাস্টা কবি বেঞ্জামিন জেফানায়ার ড্রাম ও ওবো ধ্বনির সঙ্গে কথোপকথনের মত পারর্ফমেন্স। বার্মিংহামে জন্ম প্রাপ্ত কালো কবি জেফানায়া দেশে দেশে তার অনন্য পরিবেশনায়
শব্দাবলী এভাবেই র্মূত করে তোলেন।

কবিতা যে ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে তার একটি কারণ এই পারর্ফমন্স পোয়েট্রি। কবিতা উপভোগকাঙ্খী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কবিতার নতুন নতুন উপযোগিতা মূর্ত ও যুক্ত হচ্ছে। স্কুলে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কবিতা। ’লিটারেসি’ সেশনের কার্পেটে এসেছে কবিতার কারুকাজ। সংঘ, সংগঠন ও সংস্থায় কবিতার রেসিডেন্সিতে কবির আনাগোনা বেড়েছে। বুক উইক, আর্ন্তজাতিক কবিতা দিবস, ব্ল্যাক হিস্ট্রি মান্থ, লিটারেসি উইক ঘিরে ওয়ার্ক শিটের নাভীতে গেঁথে যাচ্ছে কবিতার নোঙর। সাহিত্যের মাধ্যমে সুন্দর ভাষা শেখানোটাই এখন আধুনিকতা। এর পাশাপাশি ব্যাকরণ শিখে ভাষা শেখাও চলছে সমান।

তরুন ‘পার্ফমেন্স পোয়েটরা’ এখন ওপেন উইনির্ভসিটি থেকে স্নাতক করছেন ‘পোয়েট ইন এডুকেশন’ হবার জন্য। কবিতা লেখা , মুদ্রন, পঠনের পাশাপাশি পারর্ফম করে এরা নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছেন শিক্ষালয় সমূহে। কখনো র‌্যাপ কখনো রাইম। কখনো র্দশক স্রোতারাও ধ্বনি-প্রতধ্বিনতে অর্ন্তযোগ ঘটিয়েই একটা ঘনঘটার সৃষ্টি করে তুলছেন। মহা আনন্দ হচ্ছে কবিতা নিয়ে। বিদ্যালয়, লাইব্রেরী, মঞ্চ, উৎসব, পার্ক সব স্থানে জাকিয়ে বসছে কবিতা। ছোট বড় মাঝারি, এপিক লিরিক লিমেরিক, বাদ্যসহ বাদ্যবহ, তালি তুড়ি তাল – যখন যা লাগে সবই এনে দিচ্ছে কবিতার কাল। কবিতা দিয়ে স্কুলে এ্যাসেম্বলি মাতানোর পর ক্লাশে ক্লাশে বসে যাচ্ছে কবিতার কিচেন। দিনশেষে ছেলে-মেয়েরা বাড়ি যাচ্ছে নিজের লেখা কবিতার হাল্কা ক্যান্ডি ফ্লস।

তাই বলে আদি প্রক্রিয়াটি উপেক্ষিত হচ্ছে না কোথাও।বরং এসে গেছে স্লাম পোয়েট্রি। তা তরুণদের ভীষণ টানছে। প্রবীণরা তা থেকে দূরে সরে বসছেন। তাতে কবিতার সাঁতারে বিঘ্ন হচ্ছে না কোন। এতে এতে একজন জ্ঞানে অধ্যয়নে ভীতকর ও অন্যজন প্রায় প্রীতকর হয়ে উঠতে পারেন।

প্রথম শো’তে অতিথিদের গোলাপ দিচ্ছি।

আবৃত্তিকারকেও অন্তরে কবি হতে হয়। তবেই তারা কবিতার সোদাগন্ধময় বীজ বুকে ধারণ করে আর তার খোসা উড়িয়ে বস্তুধানে গোলা ভরে তোলেন। বলতে গেলে এভাবেই মঞ্চের সেই আবৃত্তিকার পাদপ্রদীপের নিচে উদ্ভাসিত হন কবির বিগ্রহে। কবিতা হয়ে যায় তার। কবি হারিয়ে যান। যেমন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কবিতা ‘২৫ নম্বর মধু বংশীর গলি হয়ে গেল আবৃতিকার শম্ভু মিত্রর কবিতা।

তাই কোনো কোনো কবি ফল্গুধারার তোড়ে নিজেই দাঁড়িয়ে যান কবিতা হাতে। কভেন্ট গার্ডেনের পোয়েট্রি ক্যাফেতে, ক্যাম্ব্রিজের কুইন্স গার্ডেনের রোদে শোয়া মানুষদের সামনে অথবা চেলোর সঙ্গে রিদম্ ফ্যাক্টরীতে। এ অনেকটা গীতিকার এর নিজেই গাইবার মত ব্যাপার আরকি। গীতিকারকে মানুষ মনেই রাখেনা। সে গান গায়কেরই হয়ে যায়। কবিতা হয়ে যায় আবৃত্তিকারের।

ফিরে আসি আবার আমার কবিতার কিচেনে। ধরা যাক কবিতা রসিকের রসাস্বাদনের ব্যাপারটা। তা স্বভাব ভেদে তৈরী হয়? আর স্বভাব কি অভ্যাসের পূণরাবৃত্তি! তার সূত্রপাত হয় কিভাবে ? ইয়োরোসন্ট্রিক রসবোধ থেকে কি আমরা রসাস্বাদন করতে পারি? এসব নানাবিধ কথা আসতে পারে। কিন্তু রসিকই জানে তার নিজ রসনা। যাচাই বাছাইয়ে প্রথম বলে একটা কথা তো থাকে পারে। কিন্তু নিত্য সেবনে এই প্রক্রিয়ায় একটা বশ্যতার ব্যাপার চলে আসে না? যেন অন্য ভাবে খেলে তার স্বাদ আসবেনা এমন। অথবা ওই একভাবে সাধ মেটাতে মেটাতে ভিন্নভাবে নলা তোলার সাহসই এক সময় লুপ্ত হয়ে যায়। তাই দেখা যায় ছাপা কবিতার শুধু পাঠকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি নয় সর্বাধিক। আর অধিক সংখ্যকের কাছে পৌঁছবার উপায় এখনো ছাপাই। যতই ইন্টারনেটের জাল বিছানো হোক। হোক ওয়েব, ডিক্স ও টেপ এর সুনামী। পাশ ফিরে যারা শুয়েছে তারাই কেবল দেখছে জানালা দিয়ে ক্যান্ডি ফ্লসের গোলাপী চিনির সূতো।

কবিতা এখনো অধিক সংখ্যকের ব্যাক্তিগত এক সম্পৎ। কারণটি হলো কবিতায় ’চির পদার্থ’( জীবনানন্দ পূণরায়) এর উপস্থিতি। আর এ পর্যায়ে চির পদার্থের সদ্যবহার করা আর কি। তবে আবার পারফর্ম করতে গিয়ে আমি এমন ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হই সঙ্গত কারণেই – যেমন, পড়বার কবিতা আর পারমেন্স এর কবিতা কি এক? এর নির্বাচন পরিমাপক কি? শ্রোতারা কি তবে আলাদা? আচ্ছা তাদের ভাগ করলে কি কাউকে একটু ভূতলে ফেলা হচ্ছে না?

হ্যাঁ তা তো ভিন্ন হতেই পারে! তো তাতে কি আমার লেখার মান হায় হায় তোলার মত পড়ে যাচ্ছে না? না আমি তা মনে করি না। পার্ফমেন্স যোগ্য কবিতাগুলো এমন ভাবে রাঁধি যেন মহা উপাদেয় খাবার জাফরাণ ঘি সুবাসিত বিরিয়ানীর মত সবাইকে নিয়ে প্যান্ডেল করে খাওয়া যায়। খাওয়া শেষে উপসংহার পান-চা বা কফির মত কবিতা ধ্বণি ঠোঁটে লেগে থাকবে। একা একা জুঁই ফুলের মত বাঁশমতি পোলাও খেলে আনন্দ হয়না। রোজকার মাছ-ভাত-ভাজি খেতে হয় আপন দলের উপস্থিতিতে। তাতে লবনটা বেশি হল কিনা- ভাত নরম হয়ে গেল বলে ভাজিটা জমছেনা- সব্জি হারিয়েছে কিনা তার অবধারিত ক্যারোটিন! এসব বলে বলে সমালোচনা করে খেতে হয়। আবার কখনো চচ্চড়ি বা বিশেষ ফোড়ন বা খিরে মাওয়ার বারতা দিয়ে একান্তই নিজে খেয়ে পরীক্ষা করে তবে ঐ মাঝারি দলের সামনে ভূমিকার পতাকা উড়িয়ে পরিবেশন করতে হয়। পাফর্মেন্স পোয়েটকে এ তিনটি কাজই র্কাব্যজ্ঞানে করতে হয়।

আমি কুসুম। এ বেলায় যখন আমার জানালায় সূর্য গা ঘসাঘসি করছে। তখনই আমাকে গুছিয়ে নিতে হবে আমার কবিতার কিচেন। তাহলে আমার দ্বারা কি মহাকাব্য হবেনা কোনো দিনই! কি প্রয়োজন ? বরং মহাকাব্য লিখুন ওই বনষ্পতি বৃক্ষ। আমি ফোটাই আমার কবিতা আমার অর্কিডে। নতুন আনন্দে রোদে মনের বালিশ শুকোই!

ছবি: লেখক