এ জাতি নিউইর্য়ক জয় করে চলছে প্রতিনিয়ত

স্মৃতি সাহা

জেগে থাকা নিউইয়র্ক শহর। কবি লোরকার ভাষায় স্লিপলেস সিটি। সেই শহরে স্বপ্নও যেন নির্ঘুম। এই শহরের দিনরাত্রির রোজনামচা স্মৃতি সাহার কলমে প্রাণের বাংলায় নিউইয়র্ক থেকে ধারাবাহিক ভাবে।

জানুয়ারি প্রায় শেষ হয়ে এলো। এরপরেই ফেব্রুয়ারী। আর ফেব্রুয়ারী কোন বাঙালিকে আবেগতাড়িত করবে না, তা কিন্তু হয় না। ফেব্রুয়ারী ভাষার মাস। ফেব্রুয়ারী মানেই আমার ‘অ’ ‘আ’ ‘ক’ ‘খ’,। ফেব্রুয়ারী মানেই “মোদের গরব, মোদের আশা, আমরি বাংলাভাষা।” আপনারা হয়তো ভাবছেন কেন বাংলাভাষার জয়গান করছি আমি! আপনাদেরকে দ্বিধায় রাখতে চাই না। আচ্ছা, যে ভাষার জন্য আমরা গর্ব করি, যে ভাষা দিয়ে আমাদের জাতিসত্তা নির্ধারিত আসুন না আজ জানি সেই ভাষার জয়রথ কতটা অগ্রসর আমার বর্তমান শহরে। আমি আজ বাংলাভাষা আর বাংলাভাষীদের কি অবস্থান নিউইয়র্কে, সেই বিষয়ে আলোকপাত করবো। নিউইয়র্ক সিটি তে প্রায় ৫৫০০০ বাংলাদেশী অধিবাসী রয়েছে। হিসাবটা কিন্তু বেশ পুরাতন তাই বর্তমানে সংখ্যাটা আরোও বেড়েছে এটা বেশ হলফ করে বলা যায়। এরমধ্যে কুইন্সে বাস করে ৬০%, ব্রুকলিনে বাস করে ১৯%, ব্রক্সে বাস করে ১৭%, ম্যানহাটনে বাস করে ৪%, স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে বাস করে ০.৪% বাংলাদেশী। তাই খালি চোখেই বোঝা যায় সারা নিউইয়র্কে বাংলাদেশীদের বিচরণ থাকলেও কুইন্সের প্রতি এদের দূর্বলতা একটু বেশী। আর কুইন্সের কোন কোন এলাকায় বাংলাদেশীদের প্রাধান্য দেখে তো মাঝে মাঝে জায়গাটাকে বাংলাদেশ বলেই ভ্রম হয়! চারপাশে বাঙালী গ্রোসারী,রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড গুলো বাংলায় লেখা, চারপাশে অসংখ্য মানুষ বাংলায় কথা বলছে। প্রথম প্রথম পরবাসী হওয়া বাংলাদেশীরা যখন এমন কিছুর দেখা পায় তখন আবেগে গলারূদ্ধ হয়ে আসাটাকে, বাড়াবাড়ি বলাটা মনে হয় ঠিক হবে না। নিউইয়র্কের বিভিন্ন সরকারি অফিস, হাসপাতাল গুলোতে অধিকাংশ সময় পাওয়া যায় বাংলাভাষার সহায়ক। এমন কি এগুলোর মূল ফটকে অনান্য কিছু ভাষার সঙ্গে বাংলাতে যখন ” স্বাগতম” লেখাটি দেখবেন তখন আপনার মন ভাল হয়ে যাবে, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। নিউইয়র্কের বেশ কিছু এলিমেন্টটারি স্কুলে বাংলা ভাষাকে একটি আলাদা বিষয় হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। আর যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ করতে পেরে আমার নিজের খুব ভাল লাগছে তা হলো, নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্কুলে বাংলাদেশীরা নিয়োজিত আছে শিক্ষক হিসেবে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। আর এ কথার রেশ টেনেই আমি যেতে চাই নিউইয়র্কে বাংলাদেশীদের সামাজিক অবস্থানের কথায়। সাধারণত আমাদের সবার মধ্যে মধ্যে একটা ধারণা আছে যে বিদেশ মানেই “অড জব”। আর অন্য আরেকটি ধারণা বাংলাদেশের লেখাপড়া বা সার্টিফিকেট-এর একদম মূল্য নেই বিদেশে। আর এজন্যই সম্মানজনক কোন পেশায় যেতে চাইলে আবার নতুন করে ডিগ্রী নিতে হয় বিদেশে। কিন্তু নিউইয়র্ক আমার/ আপনার এই ধারণা অনেকাংশে পালটে দেয়। নিউইয়র্কে বেশকিছু সরকারী চাকুরী আছে যা এখানে “সিটি জব” নামে পরিচিত। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য নিউইয়র্ক পুলিশ, ফায়ার ডিপার্টমেন্ট, জব স্পেশালিষ্ট, নিউইয়র্ক ট্রান্সপোর্ট, হেলথ এন্ড হাইজিন, হাউজিং সহ আরোও কিছু ডিপার্টমেন্টের চাকুরী গুলো এই “সিটি জব” এর আওতাভুক্ত। এইসব চাকুরীতে শিক্ষাগত যোগ্যতা হাইস্কুল ডিপ্লোমা থেকে ব্যাচেলর চাওয়া হয় পদভেদে। আমাদের দেশের যারা প্লেইন গ্র্যাজুয়েট তারা তাদের সার্টিফিকেট ইভ্যালুয়েশন করলে এখানে হাইস্কুল ডিপ্লোমার সমমান পান। আর অন্যদিকে আমাদের দেশের যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর তারা সার্টিফিকেট ইভ্যালুয়েশন করলে পান এখানকার ব্যাচলর ডিগ্রীর সমমান। তাই আমাদের দেশের পড়াশুনো দিয়েও আমরা কিন্তু নিউইয়র্কে সরকারি চাকুরীর প্রতিযোগিতায় নামতে পারি। সত্যি বলতে,শুধু প্রতিযোগিতায় নেমেই ক্ষান্ত হয় না বরং দেশের সেই শিক্ষা দিয়েই এই প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষাগুলোতে প্রতিনিয়ত খুব ভাল ফলাফল করে চলেছে হাজারো বাংলাদেশী। আর ঠিক এ কারণেই নিউইয়র্কের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশীদের সসম্মানে অধিষ্ঠিত হতে দেখা যায় প্রতিনিয়ত। এখানে আমি ছোট একটি তথ্য দিয়ে রাখি। নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টে প্রায় কয়েক হাজার বাংলাদেশী শ্রম দিয়ে যাচ্ছে অকুতোভয়ে। আসলে নিউইয়র্ক জুড়ে বাংলা ভাষা আর বাংলাভাষীরা প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই নিজেদের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে অবিরত। আর এটা সকল বাংলাভাষী আর বাংলাদেশীদের জন্য গর্বের। একটা সময় ছিল, যখন অধিকাংশ আমেরিকান বাংলাদেশ নামটার সঙ্গে সেভাবে পরিচিত ছিল না। তাই ” আর ইউ ইন্ডিয়ান” কথাটির সঙ্গে প্রায় প্রতিটি বাংলাদেশীর পরিচয় ছিল! কিন্তু এখন সময় পালটেছে। বাংলাদেশীরা এখন স্বনামে পরিচিত। ফেব্রুয়ারী ভাষার মাস দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম। আবার ফিরি সেই ভাষার গল্পে। নিউইয়র্কে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে যেমন নিত্য চর্চা হয় বাংলাভাষা আর সংস্কৃতির তেমনি এই ভাষার গর্বের দিকগুলো সবার সামনে নিয়ে আসতেও খুব উৎসাহী। নিউইয়র্কে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় বইমেলার। যে মেলার উদ্দেশ্য থাকে বাংলা সাহিত্যকে একটি বিশ্বজনীন রূপ দেওয়া। আর সবশেষে আরেকটি তথ্য যুক্ত করতে চাইছি যা আমার মত সকল বাংলাভাষী আর বাংলাদেশীর জন্য গর্বের। নিউইয়র্ক লাগোডিয়া কলেজে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে ভাষার শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্থায়ী শহীদ মিনার। আর এ থেকেই বোঝা যায় বাংলাভাষাকে সামনে রেখেই এ জাতি নিউইর্য়ক জয় করে চলছে প্রতিনিয়ত।

ছবিঃ লেখক