বহুদুরের এক নিস্তব্দতার কন্ঠস্বর শোনা যায়..

জসিম মল্লিক,টরন্টো থেকে

এক.

গত কয়েকদিন থেকে বরিশাল আছি। বিদেশে থাকলেও প্রতি বছরই বরিশাল আসি। কখনো দুবারও। এবারই একটু বেশি সময় ধরে আছি। বৱিশাল ক্লাবেৱ গেষ্ট হাউজেৱ নিৰ্জন কক্ষে রাত কাটে আমার। বাড়িতে গেলে মায়ের শূন্য ঘরটা বড় বেশি কষ্ট দেয়। তাই ২০১০ সালে মা মারা যাওয়ার পর আর বাড়িতে থাকতে পারি না। থাকার সে রকম কোনো আয়োজন কেউ করে রাখেনি। আমি আমার মতো করে থাকি। আমার মতো করে বাঁচি। এখন আমি নিজের জন্য বাঁচতে শুরু করেছি। আমার কারো কাছে কোনো দায়বদ্ধতা নাই, কারো কাছে কোনো প্রত্যাশা নাই আর। নিজেকে নিজেই একাকী মানুষ হিসাবে ঘোষনা করেছি। একাকী থাকায় আমি অভ্যস্ত। আমার খারাপ লাগে না। বরিশাল আমার প্রিয় শহর। শুধু প্রিয় শহর বললে কম বলা হয়, অতি প্রিয় শহর। এই শহরেই আমার জন্ম, আমার বেড়ে ওঠা। এই জনপদের প্রতিটি ধুলিকনা, গাছ পালা, পশুপাখি, রাস্তাঘাট, অলি গলি, বাড়ির আনাচ কানাচ আমার অতি প্রিয়, অতি পরিচিত। একদিন বরিশাল ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম ঢাকা। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকায় পড়াশুনা করবো, প্রিয় লেখকদের কাছ থেকে দেখতে পাব। ছোটবেলা থেকেই বই পড়তে পড়তে মনে গোপন স্বপ্ন জেগেছিল আমি লেখক হবো।

বরিশার শহর

আমার অনেক না বলা কথা আছে। আমার কথাগুলো বলার কেউ নাই, শোনারও কেউ নাই। তাই আমি লিখব। লিখলে আমার ভাল লাগবে। আমার যে অনেক গোপন কষ্ট আছে, আমি যে একজন দুঃখী মানুষ তা কেউ বুঝতে পারে না। সেসব আমি লিখব। আমি একটু আজব প্রকৃতির, কারো সঙ্গে আমার কোনো মিল নেই। আমাকে কেউ কখনো বোঝেনি, মন বোঝেনি, ভাষা বোঝেনি। আমিও নিজেকে বোঝাতে পারিনি। এমনকি আমার স্ত্রী সন্তানরাও আমাকে স্পষ্ট করে বোঝেনি। স্বামী- স্ত্রী শুধু জীবন যাপন করে। একটা অভ্যাসের মতো। একজন আর একজনকে ব্যবহার করে। সেখানে কোনো প্রেম থাকে না। পরষ্পরকে বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। তারপর প্রতিদিন একা হয়ে যেতে থাকে। আমি তাদের যত ভালবাসা দিয়েছি যত ত্যাগ স্বীকার করেছি তা তারা বোঝেনি। অন্য সবার জন্য যত করেছি কেউ তার মূল্য বোঝেনি। আমি কারো কাছে কখনো কিছু চেয়ে নিইনি, অভিযোগ করিনি। কষ্টগুলো কারো সঙ্গে শেয়ার করিনি। আপনজনদের চেয়ে দূরের মানুষরা আমাকে বেশি ভালবেসেছে। তারাই আমার আপনজন হয়েছে। এভাবেই আমি বেঁচে আছি।
ঢাকা শহরও আমাকে বেঁধে রাখতে পারলোনা। আমি আসলে অস্থির প্ৰকৃতিৱ মানুষ। কোনো কিছুতে আমি সুস্থির হতে পারি না। আমাকে যারা কাছ থেকে চেনে তারা আমার এই অস্থিরতা টের পায়। একদিন আমি ঢাকা শহর ছেড়ে সুদুর কানাডার অটোয়া শহরে পাড়ি জমালাম। ঢাকা ছেড়ে দেওয়া বা দেশ ছেড়ে দেওয়ার মতো কোনো কারন ঘটেনি আমার। নিভৃত জীবন ছিল আমার। ধীরে ধীরে আমার সন্তানরা বেড়ে উঠছিল। এক অনন্ত লড়াই সংগ্রামের জীবন আমার। কিন্তু আমার সন্তানরা তার কিছুই টের পেলোনা। আমি তাদেরকে সবকিছু থেকে আড়াল করে রাখলাম। অটোয়া থেকে টরন্টো থিতু হলাম একদিন। কিন্তু মন পরে থাকলো বরিশাল। কোনো শহরই বরিশালের চেয়ে আপন হয়ে উঠতে পারল না। কেবল অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমাকে। মনে মনে ভাবি জীবনতো একটাই, একবারই এই পৃথিবীতে এসেছি। নতুন করে আর জীবন পাব না।

দুই.
এখনও যখন বরিশালের নির্জন ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটি তখন নিবিড় ঝিমঝিম, অনুত্তেজক নৈশব্দ ঘিরে ধরে আমাকে। এখানকাৱ প্ৰতিটি বৃক্ষ, কীটপতঙ্গ, তৃণভূমি, নদী, পশুপাখি সব আমার বন্ধু। সবসময় ভাবি একদিন আমি টরন্টো শহরের বাস ঘুচিয়ে চলে যাবো বরিশালে। একটা বাড়ি করবো, সেখানে থাকবে একটা লাইব্রেরী। শেষ জীবনে শুধু বই পড়বো। কত কি তো পড়া হয়নি। ছোটবেলার দেখা সেই গরুর গাড়ি, ডোবার গর্ত, পানিতে ভরভরন্ত, খানাখন্দ ভেঙে, কাদা ঘেঁটে হাঁটবো, মাটি মাখবো, ভাব করবো পৃথিবীর সঙ্গে। আল পথ দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলে যাবো। ক্ষেতগুলো ডুবে থাকবে পানিতে, চিনে জোক রক্ত চুষে নেবে, ক্রমে নিবিড় থেকে নিবিড়তর গাঁয়ের মধ্যে চলে যেতে যেতে দু’খানা চোখ রূপমুগ্ধ সম্মোহিত হয়ে মাকে খুঁজে বেড়াবে। আমরা প্রত্যকটা মানুষ এই পৃথিবীর কাছে নানাভাবে ঋণী। যে যেমনই হোক, যত বড় বা ছোট, তার উচিত সেই ঋণ একটু করে শোধ করা। রোজ শোধ করা।

মায়ের সঙ্গে

বাড়িতে সবই আছে, আগের সেই ঘর আছে, পুকুর আছে, উঠোন আছে, মানুষজন আছে শুধু মা নাই। স্মৃতিগুলো আছে শুধু। কত স্মৃতি ভীড় করে আসে মনে। পেয়ারাতলার ছোট্ট খুপরি রান্নাঘরটায় মা নিশ্চল বসে থাকতেন। একটু কুঁজো হয়ে কেমন ছেলেমানুষের মতো বসবার ভঙ্গি ছিল মা’র। যেন কোনও কিশোরীবেলার চিন্তায় বিভোর। সারাদিন কাঠকুড়নির মতো কুঁজো হয়ে হয়ে মা সারা ঘর ঘুরে বেড়ায়, খুঁজে খুঁজে ময়লা বের করে ঘর থেকে, বার বার সামান্য জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখে, বিছানার চাদর টান করে অকারনে, তারই ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ শূন্য হয়ে যায় মার চোখ, শিশুর মতো বোকা হয়ে যায় তোবড়ানো মুখ। যেন চার দিকের এই ঘড়বাড়ি. ছোটখাটো জিনিসপত্র, এই ছোট্ট সংসার- এর কোনও কিছুর অর্থই মা বুঝতে পারেন না। হাঁটু মুড়ে ছোটখাটো হয়ে মা সবসময় ঘুমোতেন, অলস সেই ঘুম, আর মাঝে মাঝে সেই মুখে একটু একটু হাসি ফুটে উঠে মিলিয়ে যেতো। তখন মনে হয় মা স্বপ্ন দেখছেন- সেই কিশোরীবেলার স্বপ্ন। এক দূর গঞ্জ কিংবা গাঁয়ের স্বপ্ন, যার সঙ্গে এই চারপাশের জীবনের লক্ষ লক্ষ মাইলের তফাত।
অপরাহ্নে এক-একদিন উঠোনে একটা অদ্ভুত আলো এসে পড়তো। শালিখের পায়ের মতো হলুদ তার রং। পাঁচালির ছায়া ঘর ছাড়িয়ে অর্ধেক উঠোন পর্যন্ত চলে যায়। পেয়ারা গাছে ফিরে আসে পাখির ঝাঁক। সেই অলৌকিক হলুদ আলো-আঁধারিতে মা কুঁজো হয়ে সড়সড় করে উঠোন ঝাঁট দেয়, বিড় বিড় করে কী যেনো কথা বলে নিজের সঙ্গে। ঝাঁট দেওয়া শেষ হলে মা ঘটি থেকে পানি ছিটিয়ে দেয় সারা উঠোন। ঠিক সেই সময় দূরে কোথাও বাচ্চা ছেলেদের খেলা ভাঙে- তাদের হাসি চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে। কোথা থেকে উঠোনে এসে পড়ে বিষন্ন সব ছায়া আর ছায়া। ভেজা মাটির গন্ধ মন্থর বাতাসে ভারী হয়ে ওঠে। তখন মা ডেকে বলে যা, ঘরে যা, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তখন অপরাহ্নের নিঃশেষ আলোয়, দীর্ঘ গাঢ় ছায়ার দিকে চেয়ে থেকে বহুদুরের এক নিস্তব্দতার কন্ঠস্বর শোনা যায়। তখন ছোট্ট উঠোনটায় শব্দহীন ভাবে শেষ হয়ে যায় এক একটা দিন।
তিন.
কয়দিন থেকে হোটেলের রুমে আমি ঠায় বসে আছি। তেমন কোথাও যাওয়ার নেই। কোনও ষ্টেশনেই নামবার নেই। ভাঙাচোড়া মনে সম্পর্কহীন একা। বড় আনমনা লাগে। বাইরের দিকে চেয়ে পৃথিবীর সঙ্গে আমার ও মানুষের সম্পর্কের বুননটা আবিষ্কারের চেষ্টা করি। পারি না। আমার চারদিকে একটা গুটিপোকার খোলস আছে। প্রকৃত আমি বাস করি সেই খোলের মধ্যে। সেখানে শক্ত হয়ে থাকি। বাইরের কারও সঙ্গেই আমার সম্পর্ক রচিত হতে চায় না সহজে। কাউকেই আমি ভাল চিনি না। এর কারন অন্য কিছু নয়, বাক্য। অভাব ভাব প্রকাশের। আমার অতি আপনজনরাও যখন আমাকে বাক্যবানে জর্জরিত করে বা ছিঁড়ে খুড়ে ফেলে আমি কিছু করতে পারি না। কিন্তু মা আমাকে কিছুটা হলেও বুঝতো।

বাড়ির পুকুর

আমি নিজেকে এক জায়গায় জড়ো করতে পারিনি। এখানে ওখানে টুকরো-টাকরা পড়ে আছে। অনেকটাই পড়ে আছে বরিশালের বাড়িতে। যেখানে আমি মায়ের সঙ্গে থেকেছি। টিনের ঘর, দারিদ্রের ক্লিষ্ট ছাপ, প্রতি পদক্ষেপে এক পয়সা দু’পয়সার হিসাব। তবু সেখানে আমার অনেকটা পড়ে আছে। আজকে এই চকচকে শহর, উন্নত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার দেশে থেকেও মনে হয় ঢাপরকাঠির সেই অজ পাড়াগাঁ আমার সঙ্গেই আছে। কাঁদা মাখা পা, উড়োখুড়ো চুল, চোখে স্বপ্ন, বিস্ময়ের পর বিস্ময়। আর আছে বরিশালের সেই সোনালী দিনগুলো।
আমি প্রতি বছর মাকে দেখতে যেতাম। যখনই গিয়েছি তখন দেখেছি কোনো সুদূর ছেলেবেলায় দেখা পুরোনো ছবিটাকে মা টেনে এনে দূর ভবিষ্যতের গায়ে টাঙিয়ে রাখছেন। দীর্ঘ সব ঘুমহীন রাত জেগে ভাবতে ভাবতে মায়ের মনে সব অতীত ভবিষ্যৎ গুলিয়ে উঠতো, জট পাকাতো। বুদ্ধুদের মতোই তখন মার মুখে কথা ভেসে উঠতো। কথা বলতে বলতে আস্তে আস্তে হাল্কা হয়ে যেতো মায়ের মন, আর তখন এসব একা একা দীর্ঘ দিনরাত্রিগুলোকে আর একটু সহনীয় মনে হতো মার। পুরনো সেই দৃশ্যের জন্ম হয়না আর। স্টিমার রকেটটি ভোঁ দিয়ে যখন বরিশাল ঘাটে থামতো তখনও রয়ে যেতো অন্ধকার। পনেরো মিনিটের মাত্র পথ। মনে হয় পথ আর ফুরোয় না। আকাশভরা তারা, তার পূবদিকে আকাশের রঙ ময়ূরের গলার মতো রঙিন। সামান্য ঠান্ডা অনুভূতি হয় ভোরের সকালে। সেই হিম ধুয়ে দেয় বাতাসকে। বাতাস তখন বড় শীতল, বড় উদার। একটু পরেই এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা হবে। এই একটি মুহূর্তের জন্যে অপেক্ষা থাকে মায়ের। ঘরের সামনে যখন রিকশাটা থামে, দেখা যায় মাথায় ঘোমটা টানা ছোট্ট বুড়িয়ে যাওয়া মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন। নিদ্রাহীন চোখে ক্লান্তির ছাপ। আমাকে জড়িয়ে ধরেন। গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে পাগলের মতো আদর করেন। তারপর বাচ্চাদের মতো লুকিয়ে কাঁদেন…।

ছবি: লেখক