২১ নম্বর বনগ্রাম রোড

আশিকুজ্জামান টুলু

(কানাডা থেকে): চারিদিকে কেমন যেন একটা ধোয়াটে অন্ধকার । আমি বনগ্রাম রোড দিয়ে গিয়ে ২১ বনগ্রাম রোডের বাড়িটার সামনে রিক্সা বিদায় করে গলির ভিতরে ঢুকলাম । একটু ঢুকেই হাতের বায়ে আমাদের বাড়ির দরজাটাটা দেখতে পাচ্ছি, হ্যা অনেক পুরানো দরজা, পুরা দরজাটা দেখলে মনে হবে হরাইজণ্টালি ৩ ভাগে বিভক্ত – নিচের ভাগটা বন্ধ কিন্তু কাঠের মধ্যে মনে হবে দুইটা জানালার ডিজাইন করা, কিন্তু আসলে জানালা না । তারপর দ্বিতীয় ভাগটা একটু উপরে উঠলেই দেখা যাবে, সেখানে আবার দুইটা ছোট ছোট লোহার শিকওয়ালা জানালা, সেই জানালাটা আবার খোলা যায় ভিতর থেকে । ওই ভাগের উপরের ভাগেও আরেক জোড়া জানালা । এসব জানালাওয়ালা দরজাগুলি পুরান ঢাকায় আগে দেখা যেতো ।
আমি দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকলাম, ঢুকেই আম্মার ঘরের দরজাটা বায়ে । আম্মার ঘরে ঢুকে গেলাম, ঘুটঘুটে অন্ধকার । আম্মার অস্তিত্ব টের পেলাম । আম্মা কি যেন বলছেন, বুঝতে পারলাম না । আবার সবকিছু কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো মুহূর্তে………………।
*****************************
আবার আমি বনগ্রাম রোড দিয়ে ঠিক ২১ নম্বর বাসার সামনে এসে রিকসা থেকে নামলাম । গলি দিয়ে আবার ঢুকলাম, বায়ে দরজাটা পেরিয়ে বাসার ভিতরে ঢুকে ঠিক আম্মার ঘরের দরজার সামনে এসে একটু দাঁড়ালাম, তারপর ঢুকে পোড়লাম ঘরের ভিতর । ঘরের ভিতরটা অন্ধকার, তবুও কিছুটা দেখা যাচ্ছে । আম্মার ঘরের ভিতরে বিরাট একটা অনেক পুরানো দিনের  কাজ করা খাট ছিলো যেটাতে আম্মা ঘুমাতেন আর তার পাশে আরেকটা ছোট্ট সিঙ্গেল খাট ছিলো, যেটাতে আমি ঘুমাতাম – ওই দুইটা খাট ঠিক আগের মতো আগের জায়গাতেই আছে, তবে আম্মা শুয়ে আছেন আমার সিঙ্গেল খাটে । আম্মার পাশে ছোট্ট একটা বাচ্চা শুয়ে । আম্মার বড় খাটটায় মামা শুয়ে আছেন । কারও মুখে কোন কথা নাই, ছোট্ট বাচ্চাটা আমাকে দেখে দাড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দিলো আমার কোলে উঠার জন্য, আমি ওকে বুকে তুলে নিলাম, শক্ত করে জড়িয়ে ধোরলাম । আম্মা আমার দিকে তাকিয়ে প্রথম কথাটা বলে উঠলেনঃ
বার বার কেন আসছো?
আমি কোন উত্তর দিতে পারলাম না । বুকের ভিতরটায় কেমন যেন একটা চাপা কষ্ট অনুভব কোরলাম । অন্ধকারটা আরও গভীর হয়ে এলো, কিচ্ছু আর দেখা যাচ্ছে না, সব ধোঁয়াটে ।
হঠাৎ অ্যালার্ম ক্লকটা প্রচণ্ড শব্দে বেজে উঠলো, আমার ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো । চোখ খুলে পাশেই দেখি স্ত্রী বাচ্চারা বেঘোরে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে । আমার একলা পৃথিবীতে আমি জেগে উঠলাম, আর আম্মাকে দেখতে পেলাম না, মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেলো । নিচে চলে গেলাম ফ্রন্টইয়ার্ডের হাঁটুঅব্দি বরফ সাফ করতে, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে আজ ভোর পর্যন্ত একটানা বরফ পড়েছে । গ্যারেজের ভিতরে ঢুকে স্নো ব্লোয়ারটা স্টার্ট দিলাম, প্রচণ্ড আওয়াজে স্নো ব্লোয়ারটা স্টার্ট হয়ে গেলো, গিয়ারে চাপ দিতেই রওনা দিলো ব্লোয়ারটা । আমি এক হাঁটু বরফ পরিষ্কার করছি সকাল সাড়ে সাতটায় । চারিদিকে ঝলমলে দিনের আলো কিন্তু আমার মনটা সেই ২১ নম্বর বনগ্রাম রোডের আম্মার অন্ধকার ঘরের ভিতর ঠিক আম্মার খাটের সামনে দাড়িয়ে আছে আর চোখ দুটো চেষ্টা করছে আম্মাকে পরিষ্কার করে দেখতে, মনের ভিতরটা অঝরে একা একা গোপনে অনবরত কেঁদে চলেছে ।

ছবি: লেখক, শামীম জাহিদ, গুগল