উগ্রতার রূপে পদ্মাবতীর রূপ ম্লান হলো

শাকিল রিয়াজ

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

স্টকহোমের হলে পদ্মাবত (পদ্মাবতী) লাগিয়েছে এবং আমরা চারজনই দেখতে গেলাম। এগারো বছর বয়সী পুত্রটির পছন্দ বর্ণাঢ্য ফিল্ম। জাঁকজমকপূর্ণ সেট, লোকেশন, পোশাক-আশাক আর দীপিকার সৌন্দর্য পুত্রের চয়েসের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। তের বছরের মেয়েটি ইতিহাসপ্রিয়। যে কোন ঐতিহাসিক ঘটনা, সংস্কৃতি বা স্হাপত্যে ওর আগ্রহ অপরিসীম। ভারতবর্ষের ইতিহাসও জানার চেষ্টা করছে সে। পদ্মাবত নিয়ে ভারতজুড়ে হৈ হল্লা আর অসহিষ্ণুতার খবর দেখেছে সে মিডিয়ায়। ছবিটি দেখতে যাওয়া এক ধরনের স্টাডি ট্যুর হিসেবেই নিল সে। স্ত্রী আমার শিল্প-সংস্কৃতি ঘরানার মানুষ। চলচ্চিত্রে কাজ করা শিল্পী। যে কোন ভাল ছবি দেখতে সে আয়োজন করে বসে। পদ্মাবত দেখার জন্যও ওর উৎসাহের কমতি ছিল না। 
আমি পদ্মাবত দেখতে গিয়েছিলাম বিশেষ একটি কারণে। ভারতের উগ্র ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর চেতনা মাপার ব্যারোমিটার হিসাবে পদ্মাবত যখন বাজারে এলো, কিনে নিলাম প্রিমিয়ারেই।
প্রায় তিন ঘণ্টার ছবিটি এক বসায় দেখলাম। ছবিটি যখন শেষ হলো, খেয়াল করলাম আমার পরিবারের তিনজনই অত্যন্ত আপ্লুত। ওরা যে যে উদ্দেশে পদ্মাবত দেখতে গিয়েছিল, মনে হলো সফল হয়েছে। একটি ঐতিহাসিক, বর্ণাঢ্য, পোশাকী ছবি। বানশালি দর্শক ধরে রাখতে জানেন।
তবে পদ্মাবত বানশালির অন্য ছবিগুলোর মত দশে দশ পাবার মত ছবি নয়। অভিনয়, সংলাপ, টেকনিকে সেই অনবদ্যতার ঘাটতি রয়েছে এখানে। বিয়োগান্ত প্রেমের উপাখ্যান কিন্তু বুক হু হু করেনা মোটেই। ছবিটি দেখে আরাম লেগেছে কিন্তু অনুভুতিকে সুরসুরি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পদ্মাবতের, সিনেমা হিসেবে, একটি ভাল স্ট্রাকচার আছে। কিন্তু আত্মা খুঁজে পাওয়া যায়নি। বোধগম্য হয়, বারবার পরিবর্তন আর কাট-ছাঁটে আত্মা উড়ে গেছে। এবং ঠিক কোথায় কোথায় জোড়াতালি দেয়া হয়েছে তা বুঝার জন্য শিল্পবোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই।
কিছু বাড়তি কথা বলা হয়ে গেল যা মোটেই আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আগেই বলেছি, ভারতের উগ্র ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর চেতনা মাপার ব্যারোমিটার হিসাবে পদ্মাবতের অবস্হান জানাটাই আমার মূল কৌতুহল।
ইতিহাসে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর অবস্হান সুস্পষ্ট হলেও পদ্মাবতী নামে কোনও রাজপুত রানীর অস্তিত্ব নেই। আলাউদ্দিন খিলজির সঙ্গে চিত্তরের রাজা রতন সিংয়ের যুদ্ধ-বিবাদের ঐতিহাসিক সত্যতা রয়েছে। এই যুদ্ধ-বিবাদ, রাজপুতদের পরাজয়, চিত্তরের পতন আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ সতীদাহের ঘটনাটিকে আশ্রয় করে সুফি কবি মালিক মুহাম্মাদ জায়সি পদ্মাবত নামে মহাকাব্য লিখেছিলেন। এই মহাকাব্যেই তিনি পদ্মিনী নামে সুন্দরী, গুণবতী এক নারীর চরিত্র এঁকেছেন যিনি চিত্তরের রাজা রতন সিংয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে রাজপরিবারে প্রবেশ করেন এবং দ্রুতই নিজের রূপে-গুণে রাজপুতদের হৃদয়ের রানীর আসনে অধিষ্ঠিত হন। ইতিহাসের সোজা পথে না গিয়ে আলাউদ্দিন খিলজীর চিত্তর আক্রমণের মূলে পদ্মিনী নামে এক কল্প চরিত্রের বর্ণাঢ্য রূপায়ন করেন জায়সি তাঁর মহাকাব্যে। মহাকাব্যের স্বার্থেই আলাউদ্দিন খিলজী আর রতন সিংয়ের বিবাদের মধ্যমণি হিসেবে পদ্মিনীকে প্রতিস্হাপন করে একটি ত্রিভুজ তৈরি করা হয় যার পরিসমাপ্তি ঘটে অত্যন্ত বেদনা বিধুরভাবে। মহাকাব্যে বিধৃত হয় রতন সিংয়ের সাহস, দেশপ্রেম আর সততার আখ্যান। দেখানো হয়, রাজপুতদের সম্মান রক্ষার্থে চিত্তরের সব নারী নিয়ে পদ্মিনীর গণ সতীদাহ। আর জনমানবশূন্য চিত্তর দখল করে, পদ্মিনীহীন প্রাসাদে প্রবেশ করে বিজয়ী খিলজী যেন মূলত পরাজিতই হলেন। এই মহাকাব্যের রেশ ধরেই পদ্মিনী বা পদ্মাবতী রাজপুতদের কাছে দেবী মর্যাদার। এই কাল্পনিক চরিত্রটির অমর্যাদার অভিযোগেই উত্তর ভারতজুরে উগ্রবাদীদের হাঙ্গামা, দাঙ্গা, নৈরাজ্য আর শিল্পী-কলাকুশলীদের কল্লা কাটার অভিযান। বিষ্ময়কর, এই সবকিছুর পেছনে হিন্দু মৌলবাদী বিজেপি সরকারের সক্রিয় অবস্হান ও ইন্ধন রয়েছে।
ধরে নিলাম, এই কল্প-চরিত্রটি সত্যি ইতিহাসের চরিত্র। কিন্তু ছবিতে তো এই চরিত্রটিকে মহীয়ষী রূপেই উপস্হাপন করা হয়েছে। রাজপুতদের অভিযোগ মনে রেখেই সিনেমাগৃহে ঢুকেছিলাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নজর রেখেছিলাম। কই, কিছুই তো মিললো না! খিলজীর এক ড্রিম সিকোয়েন্সে নাকি পদ্মাবতীর অন্তরঙ্গতার সিন ছিল। করনী সেনারা এই বায়বীয় অভিযোগ সৃষ্টি করে সেই অভিযোগের আগুনে শুধু ফুঁ দিয়ে গেছে। সারা ছবিতে সেই মহার্ঘ দৃশ্যটির জন্য অপেক্ষাই করে গেছি! নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে!
পদ্মাবত, এর মীথ ও ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী উত্তর ভারতের উগ্রতা, অসহিষ্ণুতা আর মূর্খতারই বহিরবয়ব। সুপ্রিম কোর্টের আদেশও এই উগ্র হিন্দুবাদিতাকে থামাতে পারেনি। গল্পের একটি চরিত্র, তাকে পূজার বেদীতে বসানো এবং অহেতুক অভিযোগ এনে শিল্পের কণ্ঠ চেপে ধরে উগ্র রাজপুতীয় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা এই মুহূর্তে ভারতেই সম্ভব। ভারত তো এখন এই উগ্র মৌলবাদী কীটরাই শাসন করছে!

ছবি: গুগল