সেই শহরের নৈশ জীবন

ইরাজ আহমেদ

এতো আলো ঝলমল ছিলো না সেই শহরের নিশি রাত। পথে পথে ছিলো না বিপণী বিতানের কড়া আলোর চোখ রাঙানী, ছিলো না গাড়ির ভীড়, গোপন নির্জনতার আয়োজন অথবা পুরো রাতভর মানুষের চলাচল। যে সময়ের কথা বলছি তখন সেই শহরের নিশিকাল ঘড়ির কাটার সঙ্গে মধ্য রাতের সীমানায় ঢুকেই গা ঢাকা দিতো। নির্জন হয়ে আসতো রাজপথ, আলোর অভাবে গলিগুলো ধুকতো রোগীর মতোন।মানুষের চলাচলও কমে আসতো।তখন রাত অমিতাভ বচ্চন অথবা আল পাচিনোর মতো মারকূটে ছিলো না।
স্কুল কলেজে পড়ার সময় বিকেল সন্ধ্যার ভেতরে আত্নসমর্পন করতেই আমাদের গলির মাথায় নিভে যাবার আশঙ্কা নিয়ে ধুকধুক করা স্ট্রিট লাইট জ্বলে উঠতো।খেলার মাঠ অথবা আড্ডা ছেড়ে তখন বাড়ি ফিরতেই হতো। সেটাই ছিলো এক ধরণের অলিখিত নিয়ম। পাড়ার পেটের ভেতরে গজিয়ে ওঠা মুদির দোকানে জ্বলত হ্যারিকেন, নাক টানলে পাওয়া যেতো আগরবাতির সুঘ্রাণ। আরো কিছুটা সময় জমজমাট হয়ে থাকতো শান্তিনগর মোড়ের কয়েকটা রেস্তোরাঁ, কনফেকশনারী।আরেকটু রাত বাড়লে আমাদের পাড়া নির্জন হয়ে পড়তো আরও। দু একটা বাড়িতে চলা টেলিভিশন অথবা রেডিওর আওয়াজ ভেসে আসতো। টেলিভিশন তখনও খুব বেশী বাড়িতে ছিলো না। ওই বোকা বাক্সই ছিল শহুরে মানুষের বিনোদনের প্রধান বিন্দু। বছর তিরিশ আগে এই শহরের নতুন অংশে নিউ মার্কেট অথবা বায়তুল মোকাররম ছাড়াও তৈরী হয়েছিল কয়েকটি বড় বিপনী বিতান। সন্ধ্যাবেলা তখন সেইসব কয়েক তলা বিশিষ্ট বিতানে মানুষের ভীড় লাগতো। ছুটির দিনে বিনোদনের আশায় মানুষ গুড়ের গায়ে মাছির মতো লেগে থাকতো ওইসব দোকানে। পরিবার নিয়ে বসতো আশপাশের কয়েকটা খাবারের দোকানে।তখন শহরের নতুন অংশে চীনা রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে যাওয়া ছিলো আভিজাত্য প্রকাশের অংশ। কেউ কেউ মাসে একবার সন্ধ্যা অথবা রাত্রিকালে দলবেঁধে যেত শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চৈনিক খাবারের দোকানে। তারপর খাওয়া শেষ করে কোনো সিগারেটের দোকান থেকে পান চিবাতে চিবাতে রিক্সাযোগে গৃহে প্রত্যাবর্তন। ওটুকুই ছিল সেই শহরের কিছু মানুষের রাত্রিকালীন আনন্দের উপকরণ। বলা যেতে পারে শহরের নৈশ জীবনের একটা অংশ।সন্ধ্যা ছ‘টা ন‘টার শো তে সিনেমা দেখাও তখন ছিলো সেই শহরের নাগরিকদের নৈশ জীবনের অংশ।
শুনি একটি শহর বিখ্যাত হয় তার নৈশ জীবনের জন্য। কিন্তু এই শহরের যে নৈশ জীবনের কথা লিখতে বসেছি তা একদা ছিলো বিধবা নারীর মতো বর্ণহীন।হাতে গোনা দু একটা পানশালা ছিলো শহরে। কিছু মানুষ কুখ্যাতির ভয় মাথায় নিয়েও সেখানে নিয়মিত যাতায়েত করতো। আমার শৈশবে শুনেছি এই শহরের বিখ্যাত তারকাখচিত হোটেলে বেলি ড্যান্সারদের আবির্ভাব ঘটেছিল।তারা আসতেন সুদূর মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মদিরার উল্লাসে শহরের সেইসব হোটেলে বেলি ড্যান্সারদের শরীরের লীলায়িত ছন্দ ঝরে পড়তো ড্যান্স ফ্লোরের ঘেরাটোপে। কিন্তু বাকী শহরের রাত্রিকালের আয়ু বিছানায় ঘুমের কবরে ছিলো নিমজ্জিত। তখন রাত বাড়লে জেগে থাকতো পুরনো শহর। জেগে থাকতো সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, পুরনো ঢাকার রেস্তোরাঁ, মহল্লা, বিখ্যাত পতিতা পল্লী। এখনও তেমনই দেখা যায়।
রাত এগারোটার পর একমাত্র টেলিভিশন বিনোদন বিদায় নিলে তেমন কিছুই করার থাকতো না আমাদের। তবে একেবারে কিছুই করার ছিলো না এ কথাটা সত্যের অপলাপ। আমরা বন্ধুরা তখন পাড়ার মোড়ে আড্ডা দিতাম।ওটুকই ছিলো আমাদের বিনোদন। তখন ঘুমিয়ে পড়া শহরের মানুষের নিথর ঘরবাড়ি দেখে মায়া হতো। মায়া হতো শহরটার জন্য। মনে হতো সবাই মিলে আমার শহরকে পরিত্যাক্ত করে চলে গেছে অজানা গন্তব্যে। কিন্তু এখন আর সে সুযোগ নেই। এই শহরের নিশাকাল অন্যরকম ভাবে বেঁচে থাকে শুনি। শুনে সেই জীবনে অনেক হুল্লোড়, অনেক আলো, অনেক উল্লাসের হাতছানি। কিন্তু কোথায় যেন সেই পরিত্যাক্ত, ঘুমে জড়ানো, ম্লান শহরের রাত্রির জন্য অনেকটা মায়া পড়ে থাকলো বুকের মধ্যে। কেন তা জানি না।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল