আড্ডায় বসে অমিত্রাক্ষর ছন্দ

বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের জন্ম হয়েছিলো আড্ডা দিতে দিতে। চমকে ওঠার মতো তথ্যই বটে। পুরো তথ্যটা জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের একেবারে শেষ প্রান্তে। একটা বাগানবাড়িতে আড্ডা দিচ্ছিলেন কলকাতার বেলগাছিয়া অঞ্চলের নাট্যশালার প্রতিষ্ঠাতা, পাইকপাড়ার রাজ পরিবারের দুই ভাই, রাজা প্রতাপচন্দ্র ও ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ, পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুর পরিবারের যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত। সেদিনের আড্ডায় মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল অমিত্রাক্ষর ছন্দ। মাইকেল মধুসূদন তখন সবসময়ই বলতেন, অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার শুরু না হলে বাংলা নাটকের উন্নতির কোনো আশা নেই। সেই আড্ডাতেও মধুসূদন এই বক্তব্য প্রকাশ করলে প্রতিবাদ করে উঠলেন যতীন্দ্রমোহন। তাঁর মত ছিল বাংলা ভাষায় এই ছন্দ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। মধুসূদনের কাছে ওই বক্তব্য একেবারেই গ্রহণযোগ্য হলো না। যতিন্দ্রমোহন আলোচনাকে খুঁচিয়ে আরো উত্তাপ ছড়াতে বলে বসলেন, কবি ঈশ্বর গুপ্ত এক বার নাকি, অমিত্রাক্ষর ছন্দে প্যারোডি লিখেছিলেন- “কবিতা কমলা কলা পাকা যেন কাঁদি/ ইচ্ছা হয় যত পাই পেট ভরে খাই।” তার এই রসিকতায় বেজায় রেগে গিয়েছিলেন মাইকেল। তিনি যতিন্দ্রমোহনের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন। বললেন, তিনি এই ছন্দে লিখে প্রমাণ করে দেবেন অমিত্রাক্ষর লেখার জন্য বাংলা ভাষা যথেষ্ট উপযোগী। আত্মবিশ্বাস ছিলই, প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন মধুসূদন। হিন্দু কলেজে ‘সনেট’ রচনা হোক বা ইংরেজি কাব্যনাট্য ‘রিজিয়া’, দীর্ঘ দিন এই ছন্দ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি।

কিন্তু কবির কাছ থেকে চ্যালেঞ্জ পেয়ে যতীন্দ্রমোহন সোজা ঘোষণা করে দিলেন, যদি সত্যিই তা সম্ভব হয়, মাইকেলের কবিতা তিনি নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ছাপার ব্যবস্থা করবেন। মাইকেল মধুসূদনও জানিয়ে দিলেন, দু-তিন দিনের মধ্যে অমিত্রাক্ষরে রচিত কয়েকটি স্তবক লিখে দেখাবেন।কথামত এক দিন দেখা গেল, শুধু স্তবক না, অমিত্রাক্ষর ছন্দে মধুসূদন লিখেছেন কাব্যের পুরো একটি সর্গ।এ ধরণের লেখা বাংলা ভাষায় হতে পারে ভাবতেই পারেননি যতীন্দ্রমোহন ও রাজ-ভ্রাতৃদ্বয়। বিস্মিত হয়েছিলেন হিন্দু কলেজের প্রাক্তন রাজেন্দ্রলাল মিত্রও। তাঁর ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’-তে প্রকাশ করলেন কাব্যটির প্রথম দু’টি সর্গ। তবে সেখানে কবির নাম ছিল না। রাজেন্দ্রলাল সৃষ্টির কৃতিত্ব দিয়েছিলেন কোনও ‘সুচতুর কবি’কে।

পরে সেই লেখাই ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে মধুসূদন বই উৎসর্গ করে দিলেন ‘প্রেরণা’ যতীন্দ্রমোহনকেই।

এক ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’ বাদে মধুসূদনের বাকি সমস্ত কাব্যগ্রন্থই এই ছন্দে লেখা। আর এই ছন্দে কাব্য রচনা করে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

ছবিঃ গুগল