দানব গল্পের দু‘শো বছর

মেরি শেলি

মেরি শেলির লেখা উপন্যাস ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ দু‘শো বছরে পা রাখলো। ১৮১৬ সালের জানুয়ারী মাসেই প্রকাশিত হয়েছিল উপন্যাসটি। তারও আগে জেনিভা লেকের কাছে একটি বাড়িতে বৃষ্টির দাপটে আচ্ছন্ন রাতে বন্ধুরা মিলে মোমবাতির আলোয় ভূতের গল্প পড়ছিলেন। মেরি শেলিও ছিলেন সেখানে। পড়তে পড়তে সবাই মিলে ঠিক করে ফেললেন প্রত্যেকেই একটা করে নতুন ভূতের গল্প লিখবেন। কথা অনুযায়ী শুরু হয়ে গেলো ভাবনার কাজ। কিন্তু গল্পের প্লট কোথায়? মেরির মাথায়ও কোনো প্লট আসে না। অবশেষে মাসখানেক পর জুন মাসের এক নির্ঘুম রাতে আচমকাই যেন ভূত চেপে বসলো মেরি শেলির মাথায়। পরে নিজের ডায়েরিতে গল্প ভাবনার স্মৃতি লিখেছিনে এভাবে-দেখলাম, বিবর্ণ মুখের তরুণ ছাত্রটি হাঁটু গেড়ে বসে আছে তার সৃষ্টির পাশে। দেখলাম, আকারে মানুষের মতো কিন্তু কুৎসিত এক প্রেত পড়ে আছে, আর কী এক আশ্চর্য শক্তির জোরে তার দেহে দেখা যাচ্ছে প্রাণের স্পন্দন, জেগে উঠছে সে…’ তারপর? সেই ভাবনার সূত্র ধরে শুরু হয়ে গেলো এক ভাগ্যবিড়ম্বিত দানবের কাহিনী। এক বছর ধরে উপন্যাসটি লিখেছিলেন মেরি শেলি। উপন্যাস ছাপা হয়েছিলো তারও এক বছর পরে। বাকী ইতিহাস সাহিত্যের পাঠকদের জানা।

দু’শো বছর পর আজও মেরির লেখা বই জন্ম দিচ্ছে একের পর এক নতুন চিন্তা। পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের পাঠক্রমে স্থান করে নিয়েছে ‘ ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। নৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নারীবাদী, ইকো-ক্রিটিক, সাইকোঅ্যানালিস্ট— সব তত্ত্ব, সব ভাবনার মিলন ঘটেছ এই উপন্যাসে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এই উপন্যাসের গায়ে কিন্তু ‘হরর স্টোরি’ তকমা লাগানো আছে আজও। কিন্তু কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্রে সেই তরুণ বিজ্ঞানীর নতুন প্রাণ সৃষ্টি করার অনন্য কীর্তির মাঝেই এখনকার দিনের বিজ্ঞানীরা কিন্তু খুঁজে পেয়েছেন উনিশ শতকের গণিত, অ্যালকেমি চর্চা, সমসাময়িক প্রযুক্তিভাবনা। মাত্র আঠারো বছরের মেরি যখন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন লিখছেন, তখনও ইংল্যান্ডে ‘সায়েন্টিস্ট’ শব্দটার সঙ্গে কারো পরিচয়ই হয়নি।  প্রাকৃতিক বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় নিয়ে ভাবনা ও গবেষণা করতেন যারা তাদের বলা হতো ‘ন্যাচরাল ফিলসফার’। মেরি শেলির বাবা উইলিয়াম গডউইন আর মা মেরি উলস্টোনক্রাফ্ট ছিলেন সে কালের নামকরা ‘ন্যাচরাল ফিলসফার’।তাদের কন্যা মেরি ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন প্রচুর। কাছ থেকে দেখেছেন বাবার বন্ধু রসায়নবিদ হামফ্রি ডেভিকে গ্যালভানিজম নিয়ে কাজ করতে। এই গ্যালভানিজম ছিলো মৃতদেহের স্নায়ুর ভেতর দিয়ে তড়িৎস্রোত পাঠানোর গবেষণা। পরে মেরি তার লেখায় এই বৈজ্ঞানিক চিন্তাকেই ব্যবহার করেছেন সফল ভাবে। ১৯১৮ সালে বইয়ের দুটি নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সেখানে মেরি এই পদ্ধতির ব্যবহার করেছেন। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন জ্যান্ত হয়ে ওঠে বৈদূত্যিক শকের মাধ্যমেই।

ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন নিয়ে পৃথিবীতে আলোচনা কম হয়নি। এই উপন্যাসের কাহিনী অবলম্বনে বিংশ শতাব্দীতে হলিউডে তৈরী হয়েছে অনেক সিনেমা। কিন্তু এই বই যখন প্রকাশিত হয় তখন পাঠকদের প্রতিক্রিয়া কিন্তু মেরি শেলির জন্য খুব একটা সুখকর ছিলো না। দু‘শো বছর আগে প্রকাশিত সেই বইতে তো লেখকের কোনো নামই ছিলো না। মেরির স্বামী প্রখ্যাত কবি পার্সি বিসি শেলি স্ত্রীর বইতে ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। তখন অনেক পাঠক মনে করতেন বইটাও শেলির লেখা। আবার অনেকের ধারণা ছিলো এই বই মেরি শেলি কিছুতেই লিখতে পারে না। এটা নিশ্চই তার সুপন্ডিত পিতার লেখা। তখনকার দিনে মেয়েদের বেশীর ভাগ লেখা অথবা বই প্রকাশিত হতো বে-নামে। তাতে করে পাঠক মহলে সবার ধারণা হয় বইয়ের লেখক কোনো পুরুষ। আর যারা জানতেন মেরি শেলিই লিখেছেন ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ তারা নাক সিঁটকাতেন এই বলে যে, বই মেরি লিখলেও বাবা অথবা স্বামী সব পরিমার্জনা করে ঠিক করেছে। ফলে তখনও খ্যাতির মঞ্চে মেরি শেলি রয়ে গেলেন পর্দার আড়ালে।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বিভিন্ন সময়ে হয়েছে বিদ্রুপ আর সমালোচনা। গল্প লেখার কথা যখন মনে মনে ভাবছিলেন মেরি তখনও তিনি বিবাহিত নন। মেরির জন্মের মাত্র এগারো দিনের মাথায় তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের মধ্যেই মেরির অনেক সমালোচনা ছিল। অনেকেই মন্তব্য করতেন মেরির জন্যই তার মায়ের মৃত্যু ঘটেছে। সে মন্দ ভাগ্যের কন্যা। আবার কবি শেলিকে যখন মেরি বিয়ে করে মেরি শেলি বনে যান তখনও উঠেছিল বিদ্রুপ আর সমালোচনার ঝড়। কারণ শেলি তখন ছিলেন বিবাহিত এবং সন্তানের পিতা।

এরপর মেরির জীবনে ঘটে যেতে থাকে একের পর এক দূর্ঘটনা। শেলির প্রথম স্ত্রী হ্যারিয়েট আত্মহত্যা করেন। আদালতে ঝামেলা শুরু হয় শেলির প্রথম পক্ষের সন্তানদের অভিবাবকত্ব নিয়ে। এই উত্তাল ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই মেরি শেলি দুটি সন্তান জন্ম দেন। কিন্তু সেই সন্তানরাও মারা যায়। মারা যান শেলি নৌকাডুবিতে। মেরি শেলির শ্বশুরও তাঁর পেছনে লেগে ছিলেন। তার চেষ্টা ছিল মেরি যেন কিছুতেই শেলির জীবনী প্রকাশ করতে না পারে। শেলির সন্তানের অভিবাবকত্বের প্রশ্নেও শ্বশুর মশাই বাগড়া দিয়েছিলেন। ছেলে ফ্লোরেন্স শেলিকে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। এতো ঝড়ের ভেতর দিয়ে জীবন প্রবাহিত হলেও মেরি কিন্তু লেখালেখি ছাড়েননি। উত্তর লন্ডনের একটি ছোট্ট বাড়িতে ফিরে এসে মেরি আঁকড়ে ধরেছিলেন কলম। লিখেছেন প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা আর ভ্রমণকাহিনী। লিখে গেছেন উপন্যাস ‘ফকনার’। মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মেরি শেলি মারা যাবার পর দেখা গেছে তাঁর লিখিত-সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা কুড়িটিরও বেশী।

‘আমি যদি ভালবাসার উদ্রেক না-ই করতে পারি, তা হলে ভয়েরই কারণ হব’— ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ভাগ্যবিড়ম্বিত দানব ডুকরে উঠে বলেছিল। সেই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের স্রষ্টা ভালবাসা পাননি মানুষের কাছ থেকে, কিন্তু তিনি অন্যদের ভয়েরও কারণ হননি। প্রচারণার আলোর বৃত্তে অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আজো আলোর দিশা হয়ে আছে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

ছবিঃ গুগল