মনের ভেতরে হিজিবিজি কাটাকুটি লাইন সব। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে রাখা আয়ু, লিখে রাখা ছবি, লিখে রাখা মানুষের গল্প। সেই খাতা থেকে ছেঁড়া পৃষ্ঠা একটা উড়ে গিয়ে পড়লো জঙ্গলে। আগুন জ্বলে উঠলো, বৃষ্টি এলো, হয়তো হাওয়াও দিলো। এলোমেলো হয়ে পাখির মতোন ডানা মেলে দিলো শ্রাবণ দিনে ঘরের পর্দা।সেইসব খসে পড়া পৃষ্ঠা এমনি করেই ঝড় তোলে আজো বুকের মধ্যে। মনে পড়ে ফেলে আসা দিনের কত কথা, বেদনা আনন্দের স্মৃতি।
মনের সেই ছেঁড়া পৃষ্ঠার গল্প নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন ছেঁড়া পৃষ্ঠা তোমার সঙ্গে।

ছেড়া পাতায় গল্পরা ঘুমিয়ে থাকে
রুদ্রাক্ষ রহমান ( গল্পকার )

এক..
ভর সন্ধ্যায় কারো কথা ভেবে; কারো আলোভরা মুখ ভেবে, চায়ের কাপে চুমুক দিতেই জিভ পুড়লো। সে এক ঝড়ে উড়ে আসা মুখ; আবার তুমুল ঝড়ে মিলিয়ে যাওয়া মুখশ্রী! তারপরও বুকের ভেতর তোলপাড় এখনো। তার জন্যই বলে ওঠা- ‘তার ভালো হোক; ভালো থাকুক সে।’
ছিঁড়ে যাওয়া পৃষ্ঠাদের জন্য এমন মায়া কেনো? কে দেবে উত্তর? জীবনানন্দ দাশ?
‘বলি আমি এ হৃদয়েরে:
সে কেন জলের মত ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়।’
এসব কেনোর কোনো উত্তর কেউ স্থির করে পায়নি কোনো কালে। আর পাবে বলেও আশা রাখছি না! কেবল যাপিত এ জীবনে, এতোটুকু জেনেছি জীবনপথে চলতে চলতে অনেক অনেক গল্প জমে। সেই গল্পের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে যায় কিছু, কিছুতে ধুলো জমে, আবার কিছু হারিয়ে যায় চিরতরে। আবার কিছু কিছু গল্প ঘুরে-ফিরে আসে! জামাইকান গায়ক রনি ডেভিস গাইছেন- ‘এটা আমার দুনিয়া/এখানেই আমি বাস করি/এটা আমি নিজে গড়েছি/ তোমরা আমাকে কেউ অনুসরণ করো না’- এই যে শিল্পীর তীব্র অভিমান, এই যে তার নিজের মতো করে ‘একলাজীবন’-এখানেও হাজার হাজার ছেড়াপাতার গল্প ঘুমিয়ে আছে। তার জন্য এক শিল্পীর, এক কবির গভীরতর কান্না লুকিয়ে আছে অথচ তিনি বলছেন তার ভালোবাসার মানুষটি অন্যের হাত ধরে চলে গেলেও তিনি কাঁদবেন না।
ধরা যাক, আমাদের তখন স্কুলবেলা! শরীর তখনো তেমন করে জাগেনি। জেগেছে মন। আমরা তখন সৌন্দর্যপিপাসু। আমরা তখন গাছে গাছে শালিকছানা খুঁজে বেড়াই পুষবো বলে। ঠিক তখন পাশের জানালায় শিউলি গোমেজকে ভীষণ ভালো লেগে গেলে কী আর করার থাকতে পারে। উপরের ক্লাসের তুখোড়ছাত্র শিউলি বেণি দুলিয়ে যখন স্কুলে যায় তখন আমাদের বুকের ভেতর পেন্ডুলামের মতো কী যেন দোল খায়। শীতের দুপুরে লম্বা চুল যখন রোদে শুকায় শিউলি তখন আমাদের মাঠের ক্রিকেট ফিরে আসে পাড়ার গলিতে, দৃষ্টিসীমায় থাকে যেন সে। তারপর ভুল বানানে চিঠি লিখে শিউলির আদর খাওয়া! আর আদরের ভাষাটা এমন-‘ভালো করে পড়াশোনা কর। বড় হ; আমার চেয়ে আরো কত ভালো-সুন্দর মেয়ে আসবে তোর জীবনে!’ সেই শিউলি গোমেজ এখন দূর আকাশের কোনো এক তারা। যদিও সে ছেড়াপাতায় জমে থাকা একটা গল্প-প্রথম প্রেম!

দুই..
তখন কলেজবেলা। মনকে পেছনে ফেলে শরীর জাগতে শুরু করেছে তুমুল। সবুজ মাঠের চেয়ে তখন প্রিয় কারো সঙ্গ। সেই সঙ্গ এমনি সর্বনাশা যে তুমুল টানে নিয়ে যেতে পারে যে কোনো বেনামী বন্দরে। ভাসিয়ে দিতে পারে অতলান্ত জলে। তখনো, একজন যখন বলে ওঠে‘ একদিন দেখে নিও/ চলেই যাবো ঠিক ঠাক।’ তখন ভেতরে ভেতরে গভীর বেদনাদের জন্ম হয়। এতো প্রেম-এতো বেদনা যে মুখে বলে শেষ করা যায় না। আশ্রয় হয় চিঠি। তখনো চিঠিযুগের ইতি ঘটেনি। অনেক অনেক কথা, অনেক গল্প অনেক প্রেম দিয়ে লেখা সেই চিঠি চলে যায় কারো হাতে। তারপর বিজলি গতিতে চিঠি চলে যায় ব্লাউজের ভেতর; একটু আড়ালের জন্য। সেইসব দুপুর, সেইসব যায় যায় চিঠিযুগ সেই সব ছেড়াপাতার গল্প কোথাও না কোথাও জমে আছে! যেমন জমে থাকে স্মৃতি, জমে থাকে কথা। কেনো না, এখনো বৃষ্টিদিনে এখানে মানুষ রঙধনু কিনতে আসে!

তিন..
এখন, এই হেলেপড়া জীবনে আমি ছেড়াপাতার গল্প বলতে কী আর বুঝতে পারি। উষ্ণপ্রেম, গভীরতর বেদনা-অনিবার্য বিচ্ছেদ অথবা-‘পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ?
ছেড়া পৃষ্ঠার গল্প মানে কী-‘ ঐতো নৌকো যায়, মাটির কলস যায়, ফুলদানি যায়।’ প্রিয়, একলা থাকার মতো খুব প্রিয় আবুল হাসান অথবা সুধীনন্দ্রনাথ দত্ত-
‘কিন্তু সে আজ আর কারে ভালোবাসে।
স্মৃতিপিপীলিকা তাই পুঞ্জিত করে
আমার রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণা:
সে ভুলে ভুলুক, কোটি মন্বন্তরে
আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না।।’
অনেক দেখে শুনে যদিও বলতে ইচ্ছে করে কাউকে আমার আর কোনো গল্প শোনানোর অপেক্ষা নেই; তারপরও কিসের জন্য, কোন জীবনলোভে বেজে উঠেন জয় গোস্বামী-‘আমার এক পায়ে ভয়/অন্যপায়ে কৌতূহল।’
আর বলি এই মন কে- দূরের মানুষই কেবল ফিরে ফিরে আসে। ঘুর ফিরে আসে ছেড়াপাতার গল্পরা!

সব ছেঁড়া পাতা আঁধারে মিলাক
– শারমিন শামস ( ফিল্ম নির্মাতা, লেখক, সাংবাদিক)

ঝরা পাতাদের সঙ্গে আমারও চলে যাবার কথা ছিল। ঝরা পাতাদের ভিতরে বাদামী বিষাদ হয়ে মিশে থাকবার কথা ছিল। বলছিলাম সেই সময়ের কথা যখন আমি বিষাদে ভুগতুম। আহা! সেই বিষাদদিন ও রাতের যাপনগুলি। তোমরা যারা ভুল মানুষেরা আমার জীবনে এসেছিলে একদা কোন এক বাদল শেষের রাতে, মনে হত শত জনম, না না, তারো আগে, হাজারো বর্ষ কি আলোকবর্ষ আগে, ঠিক তখন, যখন আমি অজন্তা কি ইলোরা হয়ে ঘুমিয়ে থাকতুম পাহাড়ের গায়ে; ঠিক সেই সময় সেই মানুষেরা, তোমরা যারা আমার শরীরে হাত বুলিয়ে ভালোবাসতে চাইতে কিংবা ভালোবেসেছিলে- আমার সেইসব বেদনা আদর মাখা উচাটন দিনগুলো লেখা ছিল ওইসব ঝরাপাতাদের গায়ে। লেখা ছিল ডায়েরির পাতায়। আঁকাও ছিল। আজ তারা কোথায়?
রক্তক্ষরণ কি আঁকা যায়?
যায় হয়তো। আমাদের দীর্ঘশ্বাস, ফেলে ছড়িয়ে যাওয়া প্রেম ও বিশ্বাস, আগমন, প্রত্যাবর্তণ অথবা চিরতরে কুয়াশায় হারিয়ে যাবার সাহস একেকটা ইতিহাস হয়ে জমে ওঠে। কোথায় জমে ওঠে? খাতায়? ঝরা পৃষ্ঠায়? বুকের অলিন্দে? স্তনের চোরাগলিতে? ঠোঁটের সুষমায়? ভালোবাসার অপরাধে যারা আজ নির্বাসনে গেছে তারাই কি ধরে রাখে প্রেম আর প্রতিশোধের ইতিহাস? অসুখী শৈশব, বেড়ে ওঠার নাভিশ্বাস, লুকোনো বিকেল, হু হু সন্ধ্যার সময়?
আমি কোথাও লিখে রাখিনি। কিংবা হয়তো লিখেই রেখেছিলাম। তুমি। শুধু এই দুটো অক্ষরে মিলিত প্রবাহ- যা লাভা হয়ে গড়িয়ে পড়তো আমার সর্বাঙ্গে। আমি তোমাকে লিখে রেখেছিলাম ওইখানে- ওই যে ওই ঘুঘু ডাকা দুপুরের গায়ে পাতলা চাদরের মত রোদ- তার গায়ে আমার অপেক্ষারা হেলান দিয়ে বসে রইতো রোজ, ক্লান্ত- ঘুমিয়ে পড়তো ফের। আর সন্ধ্যাগুলো একেকটা হুতুম পেঁচার মত স্তব্ধ। আগুনে মুখ রাখা সেই বেদম সময়। আহা! সব লেখা ছিল ওই সন্ধ্যার বাতাসে। সেইসব নোটবুকের জমিন থেকে শিকড় উপড়ে উপড়ে আমি তুলে ফেলি গেঁড়ে রাখা সমস্ত ভুলচুক, থরো থরো আবেগ, ঠোঁটজুড়ে কালশিটে, আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা সুগন্ধ শিশির, চাঁদের আলিঙ্গন এবং তোমাকে।
বুকের ভিতরে শিশির জমে থাকে না বলো কার? কে না লুকিয়ে রাখে আস্ত পাহাড়? কার শরীরে না ঘাপটি মেরে থাকে অতীতের দাগ? না আমি না তুমি, না ওই মোড়ের ধারের রকে বসা ছেলেপিলেগুলো, কি ওই বেনুনি দোলানো হেয়ালি মেয়েটা। কিংবা ওই দুপুরের ভাতঘুমে কোমর ভারি হয়ে ওঠা আয়েশি বউটা। ওরা সকলেই অতীত পোষে। সে কার সঞ্চয়ে অবিরাম মুখ ডুবিয়ে খোঁজে সেই নিজেকেই। জীবন, তুমি কেমন করে বও? কেমন তোমার ধারা? কারে তুমি ফেলে আসো আর কারে কুড়াও পথে পথে? যাওয়া আসার বিমল বেলায় জীবন তুমি কখনো কি ফেলে রেখে যাও আমাকেও ওই ঝরা পাতার মত? ছেঁড়া পৃষ্ঠার মত?
ঝরা পাতাদের গায়ে গায়ে লিখে রাখা আমার অতীত। আমার তরুন বেলা, কুমারী সময়ে অহেতুক দুঃখ পাবার হাস্যকর মুখর সময়, অন্ধ ছুটে যাওয়া, ছুটে গিয়ে ডুবে যাওয়া, ডুবে গিয়ে তুলে আনা – সে কি প্রেম? সে কি হিংস্রতা, মোহের বিকার? না কি সে শুধুই আমি? আমার ঝরে ঝরে গলে গলে পড়া!
ডায়েরির পাতাগুলো রক্তক্ষরণে লাল, হতাশায় বেগুনি, বেদনায় সবুজাভ, প্রেমে উন্মাদ। ধূলোপড়া নিগূঢ় অন্ধকার থেকে আমি তাকে তুলে আনি না আর। শীত শেষে উড়ে যাওয়া বিবস পাতার মত সেও উড়ে যাক, ঝরে যাক, ভেসে যাক অন্য কোন পথে। আমি তাকে আর খুঁজি না তো, ঘেটে দেখি নাতো!
সে হারাক! সব ছেঁড়া পাতা আঁধারে মিলাক….

যে লেখাটা ছিঁড়ে ফেলে দেব…
রাজা ভট্টাচার্য (শিক্ষক, লেখক)

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমি খানিক পথ আসি মেট্রোতে; তারপর ট্রেন ধরি দমদম থেকে। সেদিনও তেমনই, মেট্রো থেকে বেরিয়ে ঊর্ধ্বমুখে দাঁড়িয়ে আছি ইলেক্ট্রনিক বোর্ডটার নীচে। গাড়ির ঘোষণা হয়নি তখনও; বাঁয়ে মেট্রোর আর ডাইনে লোকাল ট্রেনের টিকিট কাটার মস্ত লাইন, মাঝে যাত্রীদের ভীড়। লোকে লোকারণ্য সমস্ত জায়গাটা। আমার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন এক দম্পতি। দু’জনেরই বয়েস ষাট পেরিয়েছে নির্ঘাত। ভদ্রমহিলা অনন্ত অসন্তোষের আকর; অনর্গল জোরালো কণ্ঠে নালিশ করে চলেছেন – এত ভীড় কেন হবে, এত ‘পাবলিক’ হন্যে হয়ে যাতায়াত করবে কেন, ট্রেন সময়ে চলে না কেন, সবাই তার গায়ে এসে পড়ার অশালীন চেষ্টা করছে কেন – ইত্যাদি। খামোখা ধমকাচ্ছেন গোবেচারা স্বামীটিকেও, তিনি যদিও নিরুত্তর। আমি নিরুপায়, শুনতেই হচ্ছে।
এমন সময় সত্যিই তাঁর গায়ের উপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল এক তরুণ, বয়েস তার বছর পঁচিশেক হবে। এতক্ষণে একটি ন্যায্য অজুহাত পেয়ে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন তিনি -“মেয়েছেলে দেখলেই গায়ে গিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে – না? জানোয়ার কোথাকার! সব ব্যাটা চোখের মাথা খেয়ে বসে আছে! চোখ থাকতেও অন্ধ! দেখে চলতে পার না?”
অনিবার্য পতনের বেগ কোনোমতে সম্বরণ করে ক্ষমা চাইল ছেলেটা। তারপর সঙ্গের বন্ধুটির হাত ধরে, অন্য হাতের সাদা স্টিলের লাঠিটাকে এগিয়ে দিয়ে এপাশ-ওপাশ ঠুকতে এগিয়ে গেল সে। মুখে একফালি বিড়ম্বিত হাসি। তার বন্ধুর অগ্নিগর্ভ চাউনির দিকে তাকিয়েও দেখলেন না ‘ভদ্রমহিলা’।
তখনও তিনি উচ্চৈঃস্বরে বলে চলেছেন -“মেয়েমানুষ দেখলে আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না– না? বুঝি না কিছু?…”

হে আমার নিভৃত ঈশ্বর! এ স্মৃতি মুছে দিও চিরতরে! ছিঁড়ে ফেলো ডায়েরির এই পাতাটা…

মনেপ্রাণে ভুলতে চাই ওই চাকরি পাওয়ার দিনটা
প্রিয়ম সেনগুপ্ত (মিউজিশিয়ান, লেখক,সাংবাদিক)

দুঃখ অনেক সময় সুখের ছদ্মবেশে আসে। একথা আগে কেউ কখনও বলেছিলেন কি? না বলে থাকলে আমি বলছি। ২০১৩–র শুরুর দিকে সাংবাদিক হিসাবে কলকাতার একদম প্রথম সারির একটি সংবাদপত্রে যোগ দিই। কলকাতার যে কোনও সাংবাদিকের স্বপ্ন থাকে ওই সংবাদপত্রে কাজ করার। কারও কারও গোটা জীবন কেটে গেলেও ওখানে কাজ করার সৌভাগ্য হয় না। সেখানে দ্বিতীয় চাকরিতেই ওই হাউজ! আনন্দে, উত্তেজনায় ফুটছিলাম। মোহভঙ্গ হল দিন তিনেকের মধ্যেই। দেখলাম বিভাগীয় প্রধান একজন মানসিক ভারসাম্যহীন, মিথ্যুক, বুকনিসর্বস্ব, স্যাডিস্ট মেগ্যালোম্যানিয়াক। যে কোনও উপায়ে অধস্তনদের হেনস্থা করে তিনি অদ্ভুদ মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন। সকালে যা বলেন, বিকেলে তার উল্টো কথা বলেন। এবং সকালের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করলে, বিকেলে উল্টো কথা বলে দাবি করেন তাঁর বিভাগের প্রতিটি কর্মীই নাকি অপদার্থ। রাত তিনটেয় বাড়ি ফিরতাম প্রতিদিন। ছুটি থাকতো না সপ্তাহের পরে সপ্তাহ, মাসের পর মাস ছুটি পেতাম না। না আমি ঘুরতে যাওয়া বা অন্য কোনও কাজে অতিরিক্ত ছুটির কথা বলছি না। সপ্তাহে একদিন যে ন্যায্য ছুটি পাওয়ার কথা, সেটাও উনি দিতেন না। অথচ নির্ধারিত ছুটির আগের রাতে অফিস ছাড়ার সময় জোড়হস্ত (আক্ষরিক অর্থেই) হয়ে প্রশ্ন করতে হতো, ‘কাল কি আমার ছুটি থাকবে?’ দু’মাসে তিন–মাসে একদিন ছুটি পেতাম। অবশেষে চাকরি বদলে স্বস্তির শ্বাস ফেলেছি। যেদিন ওই হাউজে চাকরি পাই, মনে হয়েছিল জীবনে আর কিছু পাওয়ার নেই বোধহয়। মুক্তি পাওয়া যে বাকি, সেটা ভুলতেই বসেছিলাম। মনেপ্রাণে ভুলতে চাই ওই চাকরি পাওয়ার দিনটা।

পান্ডুলিপিকে ভরে দেয় ছেঁড়াপাতার অজস্র বিষাদ
মেহেরুন্নেছা ( সহকারী অধ্যাপক, লেখক )

ছোট্ট বেলাকার কথা। সবে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি। ভোরের আলো মাত্র ফুটতে শুরু করেছে। নানাবাড়ির পেছন দিকের ছাড়াবাড়ি সংলগ্ন ছোট খালটি দিয়ে নৌকো করে আবু নানা যাচ্ছিলেন। হঠাৎ উনার দৃষ্টি আটকে গেলো ছাড়াবাড়িতে। একজন পরিচিত মানুষের অবয়ব ; যেনো মানুষটি গাছের ডালে দাঁড়িয়ে আছে। ….” কে রে এখানে? তোফায়েল নাকি? এতো সকালে এখানে কি জন্য দাঁড়ায়ে আছোস? ” কিন্তু তোফায়েল কথা বলেনা। তিনি নৌকো ভেড়ালেন। ভালো করে ঠাওর করার জন্য নৌকো থেকে নেমে কাছে গিয়ে দেখেন তোফায়েল গাছের ডালে ঝুলছে। অমনি তাঁর গগন-বিদারী চিৎকার। উহ! সেই ভয়ানক-মর্মান্তিক-হৃদয়বিদারক দৃশ্য কখনো জীবনের পাতা থেকে ছিঁড়ে ফেলতে চাইলেও ছেঁড়া যাবেনা। দশম শ্রেণীতে পড়া আমার সুদর্শন জ্যাঠাতো মামা তোফায়েল আর নেই। মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছেন তার মা। একজন সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদে পুরো ধরা যেনো থমকে গেলো।
পরদিন দুপুরে পুলিশ এলো। সারারাত সেই ছাড়াবাড়িতে লাশের কাছে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে রাখা হলো। স্বজনেরা লাশ পাহারা দিলো। মধ্যবিত্ত ঘরের এই সুদর্শন মেধাবী ছেলেটি কেনো আত্মহত্যা করলো? শুনেছি দশম শ্রেণীতে উঠার পর তিনি বিষন্নতায় ভুগতে থাকেন। বয়স যত বাড়ছে ততই সেই দৃশ্যের ভয়াবহতা আমাকে গ্রাস করছে। দূর নক্ষত্রলোকের দিকে তাকিয়ে ভাবি কিসে মানবকে এতো বিষন্ন করে তোলে। সন্ধ্যে বেলাটা কেনো কারো কারো কাছে নিষ্প্রভ মনে হয়। কেনো মানব পৃথিবীর বুকে থমকে দাঁড়ায়। কেনো একজন মানব নিজেকে ব্যর্থ মনে করে। আকাশ-বাতাস, তরু-পল্লব সকলেই নিরুত্তর আর শব্দহীন। ব্যর্থ মানুষগুলো কোথাও শান্তনার বাণী খুঁজে না পেয়ে অবশেষে কঠিনভাবে নিজেকে নিয়ে যায় না ফেরার দেশে। ঘুমিয়ে পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘুমে। পৃথিবীর ধূসর পান্ডুলিপিকে ভরে দেয় ছেঁড়াপাতার অজস্র বিষাদ-সিন্ধু আর দীর্ঘশ্বাসে।

এখনও সেই ঘটনা মনে পড়লে দারুণ কষ্ট হয়
অরুণ কুমার বিশ্বাস (সরকারী কর্মকর্তা, লেখক )

তখন অনেক ছোট্ট আমি। স্কুলে পড়ি। ডায়েরি লেখা শুরু হয়নি তবে মনের খাতায় কিছু কিছু কথা লেখা হয়ে গেছে। বেশ মনে আছে সেদিন ছিল বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। খেলতে যাবো মাঠে। মা বললেন, এই নে ধর দশ টাকা। ফেরার সময় চিনি কিনে আনিস, আজ পায়েস রাঁধবো। খুশিতে বক বকম করতে করতে মাঠে যাই। বৃষ্টির মধ্যেই জমে ওঠে বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল ফুটবলা খেলা। পানি পানের বিরতিতে চিনি কিনে আনি। জমিয়ে রেখে দেই গোলপোস্টের কাছে। মায়ের আদেশ কি ভোলা যায়! তিন-এক গোলে খেলা সাঙ্গ হলো। তখন ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। যাকে বলে বিড়াল-কুকুর বৃষ্টি। জম্পেশ খেলা হয়েছে আজ, কী বলিস অনুপম! বলল আমার বন্ধু রাশেদ। সত্যি তাই। এমন জমজমাট খেলা অনেক দিন হয়নি। দু’বন্ধু কথা বলতে বলতে বাড়ির পথ ধরি। মাথার পরে কচুপাতা মেলে ধরে হাঁটি, যাতে বৃষ্টির পানিতে ঠান্ডা লেগে না যায়! বাড়ি পৌঁছতেই মা বললেন, এনেছিস চিনি! কই দে। দুধে আলোচাল দিয়েছি। এবার চিনিটুকু দিয়ে একটু নেড়েচেড়ে নামিয়ে নিলেই খেতে পারবি।
অমনি আমার ছোট্ট বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠলো। চিনির কথা তো মনে নেই! ভুলে রেখে এসেছি গোলপোস্টের কাছে। আমি র্উধ্বশ^াসে স্কুলমাঠে যাই। এইটুকুন পথ তখন এত দীর্ঘ মনে হয়! নাকি বৃষ্টি-বাদলে পথ ভুলে করে ফেলেছি! আমি ছুটি, ছুটতেই থাকি। গিয়ে দেখি প্রবল বৃষ্টিতে চিনির ঠোঙা গলে ততক্ষণে পানি হয়ে গেছে। সঙ্গে বাড়তি টাকা নেই যে নতুন করে চিনি কিনবো। ফিরে গিয়ে মাকে সব বললাম। মা সপাটে চড় কষালেন। যেন চিনি নয়, আমি তার একটি স্বপ্ন ভেঙে ফেলেছি। ছোটো ভাই জ¦রমুখে একটু পায়েস খেতে চেয়েছিল। কিন্তু আমার ভুলের কারণে পায়েস আর মিষ্টি হল না, দুধভাত রয়ে গেল। মায়ের চড় যতটা না কষ্ট দিয়েছে আমাকে, তারচেয়ে ঢের বেশি কষ্ট পেয়েছি ভাইয়ের জ¦রতপ্ত মুখচ্ছবি দেখে। এখনও সেই ঘটনা মনে পড়লে দারুণ কষ্ট হয়, চোখ ভরে ওঠে জলে।

অনেক দূরে চলে যাচ্ছিরে , তোরা একজন আরেকজনকে দেখে রাখিস
শিবব্রত দেচৌধুরী (প্রবাসী, লেখক )

ডিম্যানশিয়ায় অচেতন ছিলেন পুরো দুদিন , হসপিটালে উনার পাশে থাকার জন্য আমরা পালাক্রমে একেকজন একেক সময় উপস্থিত ছিলাম। সারারাত মা’র সঙ্গে থেকে ভোরের দিকে পূর্নিমাকে রেখে আমি বাসায় এসে ক্লান্ত শরীরটাকে বিশ্রাম দিতে বিছানায় একটু শুয়েছি , কিছুক্ষন পরই পূর্নিমার ফোন করে বললো, “এক্ষুনি চলে এসো , মা শুধু ছটফট করছেন , ‘ডাক্তার বলছেন তোমাদের জানাতে।’ আমার বাসা থেকে হসপিটাল দশ মিনিটের পথ , ওখানে গিয়ে পার্কিং পেতে দেরী হয়ে যেতে পারে তাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছি । আমাকে এভাবে উদ্ভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাশের বাসার পেরুবিয়ান ভদ্রলোক ওর গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো কী হয়েছে? আমার সমস্যার কথা খোলে বলতেই ও বললো, ‘গাড়িতে উঠো তো, আমি তোমাকে হসপিটালে ড্রপ করে আসবো ।’ আমার দু:সময়ে আমার পড়শির এই সহানুভূতি আমি কৃতজ্ঞচিত্তে মনে রাখবো আজীবন! হসপিটালে পৌঁছে মায়ের রুমে গিয়ে দেখি বেডের চারিদিকে আমার সকল আত্মীয় স্বজনরা দাঁড়িয়ে আছেন , মা ভীষন ছটফট করছেন । হঠাৎ চোক মেলে , বড় বড় চোখ করে চারিদিকে তাকালেন ,তার পর দিদি আর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন – ‘অনেক দূরে চলে যাচ্ছিরে , তোরা একজন আরেকজনকে দেখে রাখিস, আমি চলে গেলে দু:খ করিসনা, ভালো থাকিস তোরা!’ আমার মায়ের মুখে তখন কষ্ট মেশানো হাসি, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম – উনার শরীরের যন্ত্রনার চেয়েও উনার চলে যাওয়াতে আমাদের যে কষ্ট হবে সেই ব্যথায় তিনি ব্যথিত! মনিটরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম , ধীরে ধীরে পাল্স, হার্টবিট , ব্লাড প্রেসার আমাদের চোখের সামনেই শুণ্যের কোঠায় নেমে এলো ! আমরা শুধু অসহায়ের মতো ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইলাম আর আমাদের মা আমাদের চোখের সামনেই চলে গেলেন! আজ প্রায় সাত বছর হলো মাকে হারিয়েছি , বাবাকে হারিয়েছি মায়ের মৃত্যুর আরো তিন বছর আগে। এখন কোন অলস বেলায় ওদের হাসি হাসি মুখের ছবির দিকে তাকিয়ে যখন দেখি তখন মনে হয়- সত্যিই কী তাঁরা কখনো ছিলেন আমাদের মাঝে?! কেনো এমন হয় ?!!!!

বেশিরভাগ লেখাই ছিলো মনের খাতায়, ছেঁড়াও হতো মনে মনে
ইশতিয়াক নাসির (স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান)

ছেঁড়া পৃষ্ঠায় কি লেখা ছিল? অথবা কি লিখে পৃষ্ঠা ছিড়ে ফেলেছিলাম? কি জানি, আজ খুব একটা মনে পড়ছেনা। কাগজে লেখা তো সেই কবেই ছেড়ে দিয়েছি। তবে, একটা সময় ডায়রী লিখতাম। নিজের জীবনের ঘটনা না, এমনি হাবিজাবি বা ছোট কোন কবিতা। তবে, কবিতা লিখে তা ছিঁড়ে ফেলেছি অনেকবার। লজ্জা লাগতো, যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে হয়তো হাসাহাসি করবে। কলেজে পড়ার সময় তিনটা গান লিখেছিলাম, সেগুলোও ছিঁড়ে ফেলেছি। একটা আফসোস তো সারাজীবনই থাকবে, কোন প্রেমপত্র লেখা হয়নি, ফাইনাল ভার্সন রেডি হওয়ার আগে কয়েকদফা ছেঁড়াও হয়নি।বন্ধুরা পরীক্ষায় নকল লিখে নিয়ে যেতো, তারপর কাজ শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব সেটা ছিঁড়ে ফেলে দিতো। আমি এত ভীতু ছিলাম যে ধরা খাওয়ার ভয়ে কোনদিন নকলও করতে পারিনি। একদিন, ফিজিক্স পরীক্ষায় অংকের সূত্র লিখে রুমালের ভাঁজে ঢুকিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকেছিলাম। বারবার ঘাম মুছতে দেখে স্যার নিজেই এসে হাত থেকে রুমালটা নিয়ে যখন দেখলেন ভেতরে কিছু লেখা আছে, আমার আর কিছু করতে হয়নি। উনি নিজ দায়িত্বে লেখাটা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে আমার খাতাটা এক ঘন্টা আটকে রেখেছিলেন।বরাবরের চাপা স্বভাবের আমি অনেক কিছু লিখতে চেয়েও লিখতাম না। ভাবতাম কেউ যদি পড়ে ফেলে তাহলে তো আমার মনের কথা জেনে যাবে।আমার বেশিরভাগ লেখাই ছিলো মনের খাতায়, ছেঁড়াও হতো মনে মনে। এতে একটা সুবিধা হয়েছে, চোখ বন্ধ করলে সেই মনের খাতায় আজো আমার লেখাগুলো পড়তে পারি।

উড়িয়ে দিতে চাই সেই দুঃখটুকু
সাবরীনা শারমীন বাধঁন (ছাত্রী, লেখক )

বুঝতে শেখার পর থেকেই আমার দাদী’র সুবাদে বই পড়ার হাতেখড়ি। ইশকুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীগত বইয়ের বাইরেও বিরাট বইয়ের রাজ্য আছে, নানান জাতের বই পড়লে কি হয়,কি করে বইয়ের রাজ্যে বুঁদ হয়ে থাকা যায় এসব কিছুর প্রথম পাঠ তাঁর কাছেই। বইপড়া নিয়ে আমার নানা রকমের স্বপ্ন আছে। তারমধ্যে অন্যতম স্বপ্ন ছিল, এক টুকরো ছাদ কিংবা বারান্দায় সাদা খোলের শাড়ি পরে,চা বা কফি হাতে দীর্ঘসময় বইয়ের রাজ্যে ডুবে থাকা। ছাদ কিংবা বারান্দা ভর্তি গাছপালা থাকলে বিষয়টা আরও আরামের হবে,হাত বাড়ালেই যদি একখানা কৃষ্ণচূড়া গাছ থাকে তবে চাইবার আর কিছুই নেই! পড়ন্ত বিকেলে সোনা রোদ আর কৃষ্ণচূড়া মিলেমিশে এক হয়ে যাবে। এই ঢাকা শহরে একখানা পাঁচ কামরার ফ্ল্যাট কেনা হয়েছিল,অনেকটা আমার পছন্দে।বারান্দায় হাত বাড়ালেই কৃষ্ণচূড়া ছোঁয়া যেতো। এই ফ্ল্যাটের নামকরণ, সাজানো নিয়ে আমার শতশত স্বপ্ন ছিল। কিন্তু কিছুটা প্রয়োজনের তাগিদেই ফ্লাটটা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। যেদিন বিক্রি হয়ে গেল,সেদিন আমি ঢাকার বাইরে। ফোনে, আমাকে জানানো হল। খবরটা আমাকে এতটাই আহত করেছিল, যা একদম সহ্য করতে পারছিলাম না। কাউকে বলতেও পারছিলাম না।তীব্র একটা যন্ত্রণা আমায় আচ্ছন্ন করেছিল। ওই দিনের অনুভূতিটা আমি আর মনে রাখতে চাইনা। উড়িয়ে দিতে চাই সেই দুঃখটুকু, বাতাসে। এ জীবনে অনেক সুখ-দুঃখ আছে, যা ভোলা সম্ভব নয় কোনোদিন। বরং মনে করতে গেলেই সুখ হয় নয়তো একফালি হাসি ছলকে পরে।আবার দুঃখের কথা মনে করতে গেলেই,ঘা টা দগদগ করে ওঠে। কিন্তু কিছু দুঃখ আছে,যা ডায়েরীতে লিখতে হয় আর লিখেই ছিড়ে, ছুঁড়ে ফেলতে হয়। মনে রাখতে নেই।