বইমেলা…

শ্যামলী আচার্য

বাসস্টপে দাঁড়ানো মাত্রই যে বাসটি এগিয়ে আসে, তাতে সাদা কাগজ সাঁটানো।
লেখা আছে ‘বইমেলা যাবে’ …।
মন কেমন করা শব্দ। বইমেলা।
অনেক ধুলোর গন্ধ, ধুলোর ওপর ছিটিয়ে দেওয়া জলের ফোঁটায় পুরনো বইয়ের লালচে পাতার দুমড়ে যাওয়া কোনা। সরস্বতী পুজোর শুকনো ফুল আর বেলপাতা। অচেনা শব্দ। রঙ্গিন মলাট। ঝলমলে প্রচ্ছদ। চেনা লেখকের নতুন বইয়ের নাম। সব উড়ে আসে। আমাদের রথতলার ফ্ল্যাটের বাইরের ঘরের জানালায় এই সময় কৃষ্ণচূড়ার শাখা এসে উঁকি দিত। নিষ্পত্র। অনেক উঁচুতে এবার ঝাঁপিয়ে পড়বে উদ্ধত লাল রঙের ফুল। ও ফিসফিস করে জানিয়ে যেত, বই আসছে। নতুন বই।

গাছটি নেই। কেটে ফেলেছে কারা যেন।
উন্নয়ন চাই, আরও উন্নয়ন।

ছেলেবেলার বইমেলা মানে অন্তত তিন-চারটে দিন বরাদ্দ। স্কুল থেকে নিয়ে যাবে একদিন। তার আগেই কুচো কাগজে লিস্টি তৈরি। কি কি বই কিনতেই হবে। না কিনলেই নয়। না পড়া মানে পিছিয়ে পড়া। তখন তো জীবন সরল, নির্ভার। গল্পের বইকেও ‘পড়ার বই’ ভেবে এসেছি। বাড়তি চাপ মনে হয়নি। এখনো…
বাবা হাতে দিলেন দু’টি দশ টাকার নোট। মন ভরলো না। আরও একটা পেলে…। মা দেবেই না। কড়া অংক দিদিমণি। বাচ্চাদের হাতে টাকা দেওয়া গর্হিত অপরাধ। অতএব।
হাতে পাওয়া কড়কড়ে কুড়ি। আর সম্বচ্ছর ঘটে জমানো আরও কুড়ি। ওটা চুপচাপ নিয়ে সোজা ইশকুল।

স্কুলবাস নিয়ে যায় ময়দান। বইমেলায়। আমার ব্যাগে একে একে ঢুকে পড়েন ফেলুদা আর শঙ্কু। আরো বারো, এবারো বারো, এক ডজন, আরো একডজন। তখন এই সব বইগুলি আট টাকায় পাওয়া যেত। তার ওপর টেন পার্সেন্ট। বিশ্বাস না হলে এসে দেখে যান। বাড়িতে থরে থরে সাজানো। নিজের মেয়েকেও হাত দিতে দিই না।
চল্লিশ টাকায় পাঁচটি বই কিনে বীরদর্পে বাড়ি ফিরি। বিশ্বজয়ের আনন্দ।
মা নিয়ে যাবে শনিবার। আর একটা রবিবার। সেদিন রচনাবলী কেনার পর্ব। কোনও বার বঙ্কিম, তো অন্য বার মধুকবি। শরৎবাবুর কোটা কমপ্লিট হয়ে গেলে পরের বার বনফুল। জীবনী দেখলেই কিনে ফেলার বাড়তি উৎসাহ। কিংবা আত্মজীবনী। মায়ের কৃপায় এভাবেই ঝুলি ভরে ওঠে।

একার বইমেলা কিছু পরে। তখন কলেজ। বন্ধুদের সঙ্গে ভাল লাগত না। সত্যি বলতে কি, এখনো কারো সঙ্গে আমি বইমেলায় স্বচ্ছন্দ নই। আমি আর আমার বই। ব্যস। অন্য সব অবাঞ্ছিত, বহিরাগত, অনুপ্রবেশকারী। তাই একাই। দু’একবার দলে মিশেছি। চুপচাপ আলাদাও হয়েছি কখন। তারা টের পায়নি। সে সময় অবশ্য দাঁত-ভাঙ্গা আঁতেল উত্তর-আধুনিকের খপ্পরে। নিজেই পড়েছি, নিজেই বুঝেছি। কারো সংগে সে তেতো স্বাদ ভাগ করতে যাইনি। পাছে বলে, মুখ্যু!

ময়দানের গেটে দাঁড়িয়ে ছিলাম একবার। দুপুরে দেখা হওয়ার কথা। হয়নি। তখন বিকেল। অনিচ্ছুক হাঁটা লাগাই ঘরের দিকে। তখন তো চলভাষ-বিহীন জমানা। কাজেই দূরে দূরে, কাছে কাছে– সবই বিধিনির্দিষ্ট! কয়েকদিন পরে জানা গেল, সে’ও সেদিন একই সময়ে, বইমেলাতেই, ঠিক পাশের গেটে দাঁড়িয়ে ছিল অপেক্ষায়। সেদিনের সেই সদ্য-চাকরি-পাওয়া যুবকটি টিনটিন, অযাস্টেরিক্স, ‘হাঁদা-ভোঁদা’, ‘বাঁটুল’ আর ‘নন্টে-ফন্টে’র যাবতীয় বই কিনে বাড়ি চলে যায়। আমি ফিরে আসি। হাতে ধরা থাকে “আজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো”…

চার নম্বর আর পাঁচ নম্বর গেটের মুখোমুখি দেখা হয়নি। হয় না। সেদিন ওরা জানতো না। জানতো না বলেই কে যে ফুল কিনবে, আর কে যে কার ঘর সাজাবে যাবজ্জীবন– এর হিসেবটুকুই মিলল না। সতেরো বছর ধরেই চিত্রনাট্য অসমাপ্ত। বইমেলায় দেখা হয় না।

গত তিন বছর আমার জগৎ ‘দাঁড়াবার জায়গা’য়। হাঁটু ব্যথা সত্ত্বেও। বইমেলা থেকে কমিক্স কিনে বাড়ি ফিরে যাওয়া তরুণ যুবকের এখন কবিতা-যাপন। অনেক শব্দের বোঝা, অনেক প্রত্যাশার ভার। তার পাশে বসে যুক্তাক্ষর, অন্ত্যমিল। তাকে দেখে  সোহম তার ‘ল্যাম্পপোস্ট’এর তলায় বসে বসে লেখে–

‘চোখ তুললে শুধু আকাশ দেখা যায়।
এখানে সন্ধে নামে বিমানের আলোতে।
তন্ময়দা তাঁকে শ্রীকবি বলে।
আমি তার নাম লিখে রাখি
আঙুল বুলিয়ে, আর্দ্র কাচের টেবিলে ।
সে তখন ফোনে মুখ গুজে
মেসেজ করে।
যাকে তার ভালো লাগে’।

সোহমের কবিতায় ঘোর লেগে যায়। বহুদিন আগে ঘুমিয়ে পড়া ঝাউপাতা তোরঙ্গ খুলে দেখতে সাধ জাগে।

 উপাসনা রবিবারের সকাল ছিনিয়ে নেয়। দিদিমণির ব্যাগ থেকে লাল কালির কলম। কাটাকুটি। বানান ভুল। ছন্দের হোঁচট শুধরে নেয়। এবার বইমেলায় প্রথম বই। শুরুতেই ‘কিস্তিমাত’ করতে এসেছে। রিমলি, সংযুক্তার ভাঁড়ারে নিটোল শব্দের আলপনা। অনেক যত্নে দিব্যেন্দু ওদের একের পর এক বই সাজিয়ে রাখে। তার প্রকাশনীটিও তিনে পা দিল এবার। স্টলের নম্বর তিন নয় তিন।

মনে পড়ে, এই ‘দাঁড়াবার জায়গা’তেই দু’বছর আগে আমার প্রথম বই। “শান্তিনিকেতন”। তাকে তেমন সম্মান করিনি তখন। সে আমার ‘কপি-পেস্ট’। মৌলিক নয়। প্রথম সন্তান। কিন্তু দত্তক। বরং অনেক আদরের “অসমাপ্ত চিত্রনাট্য”। গত বছরের বইমেলায় যার জন্ম। তবু সেই বইমেলায় “শান্তিনিকেতন”-এর জন্মদিনে কত হৈ-চৈ। উদ্বোধনে কত মানুষের সমাগম। সেদিন বইমেলায় মুক্তমঞ্চের অনুষ্ঠানে চলে এসেছিল  অনির্বাণ। সাতাশ বছরের পুরনো দোস্ত। তার সেদিন কপালে স্টিচ, হাঁটুতে ভয়াবহ জখম। অ্যাকসিডেন্টের ট্রমা কাটিয়ে ড্রাইভ করে একা একাই। শ্যামলীর বইয়ের জন্য উন্মাদনা ওকেই মানায়। ইয়ারি হ্যায় ইমান মেরা…
এবার অনির্বাণ তার ম্যাগনোলিয়া নিয়ে…… বইমেলায়।

আপনারা?
আসছেন তো? দাঁড়াবার জায়গায়?

ছবি: গুগল