প্রকৃতির স্বর্গ রাজ্য মরিশাস…

কাকলি পৈত

আকাশে হেলান দিয়ে  ঘুমন্ত পাহাড় আর আকাশনীল ক্যানভাসে  সবুজ আর নীলের  রঙমিলন্তিতে আফ্রিকার দক্ষিণ পূর্ব উপকূল ঘেষে  মনোরম সৌন্দর্যের এক ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মরিশাস। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর  এই দেশটি ফরাসি ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকত্ব থেকে মুক্তি পায় ১৯৬৮ সালে। তবু ও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উন্নয়ন,  শিল্প সবদিক থেকে সাফল্যের তুঙ্গে এই  ছোট্ট  দেশটি।।দ্বীপটির চারদিক ঘিরে রয়েছে  ভারত মহাসাগরের জলরাশি।আফ্রিকার  স্হলভূমি থেকে এই দ্বীপটির  দুরত্ব  ২২০০ কিলোমিটার । ভ্রমণবিলাসী পর্যটকেরা যারা প্রকৃতির বিশুদ্ধতার নির্যাস টুকু আহরণ করতে চান মরিশাস তাদের জন্য আদর্শ।

মরিশাসে মাত্র  দুটি ঋতু।গ্রীষ্মকালে আর বর্ষা কাল।নভেম্বর  থেকে গ্রীষ্মকাল শুরু  হলে ও আরামদায়ক ।একটু  বেশী গরম অনুভূত হলেই  আকাশে মেঘের  দেখা পাওয়া  যায় ,বৃষ্টি  ও ঝরে। সমুদ্রে জলের রঙ কখনো নীল ,গাঢ় নীল, সবুজ, কালো নানা রঙের মেলা আর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা,সমুদ্রের নীল শায়রে দূরে দূরে  পালতোলা নৌকো  যেন  বিখ্যাত কোন চিত্রশিল্পীর রঙ তুলির খেলা। জলের রঙ দেখে সমুদ্রের প্রেমে পড়ে স্নান করতেই হবে।সমুদ্রে নানারকম water sports এর ও ব্যবস্থা আছে। সমুদ্র সৈকতের পরিস্কার সাদা মোমের মত বালিতে বিছানো বেডগুলোতে পাম গাছের ছায়ায় গা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে হবেই। সমুদ্রর জলে বিকেলের সূর্যাস্তের নানা রঙের খেলার নিঁখুত নিটোল ছবি মনে সৌন্দর্যের এক অন্য মাত্রা জুড়ে দেবে।এখানকার দ্রষ্টব্য  স্হানগুলোর মধ্যে  বেলে মেয়ার, মারিয়ানা বীচ, মেরিন পার্ক,গ্রান্ড বেসিন,সার্ফ  আইল্যান্ড, লিওন মাউন্টেন উল্লেখযোগ্য।

সার্ফ  আইল্যান্ডে   স্পীডবোটে করে জলপ্রপাত দেখতে যাবার রোমাঞ্চকর  অভিজ্ঞতা   আনন্দের ভান্ডারে একমুঠো সঞ্চয় । সমুদ্রের জল কেটে এগিয়ে  যাওয়া বোটের দুরন্ত গতি উপভোগ্য ,  দুদিকে নারিকেল আর পামের ছায়ায়  সুদৃশ্য সাদা বালির  তটভূমি  দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় । এই আইল্যান্ড  স্নানের জন্যে  ও  আদর্শ। এছাড়া ডলফিন  রাইড ও আছে যারা ডলফিনের সঙ্গে  বেড়ানোর আনন্দ  ভাগ করে নিতে চান। এছাড়া পরিচ্ছন্ন রাস্তার দুপাশে মাইলের  পর মাইল আখের  ক্ষেত কলা আনারস চা বাগান আদিগন্ত সবুজ কার্পেটের মত বিরাজ করছে। দেশের  ৯০ শতাংশের  বেশি  কৃষিজমিতে  আখের চাষ হয়। আখ এখানকার  প্রধান অর্থকরী ফসল ।পর্যটন  শিল্পের পরই এ দেশ চিনি উৎপাদনে বিখ্যাত। আগ্নেয়গিরির দ্বীপদেশ হিসেবে ও এ দেশ  বিখ্যাত। আগ্নেয়গিরি অধ্যুষিত এলাকাজুড়ে অনেক জলাশয় তৈরী হয়েছে।জাহাজ তৈরীর জন্যে ও এ দেশ বিখ্যাত। সুদৃশ্য জাহাজ তৈরী এদেশের অন্যতম শিল্প।

মরিশাসে  হিন্দু রা সংখ্যা গরিষ্ঠ  বলে  এখানে হিন্দু  দেবদেবীর অনেক  মূর্তি  স্থাপন  করা আছে।এখানকার  ‘গঙ্গা তালাব  লেক’  বিশাল  এলাকা জুড়ে  হিন্দু  পর্যটকদের জন্য  আকর্ষণীয় স্হান।  শিবের  বিশাল  প্রস্তর মূর্তি  মন্দিরে স্হাপিত। এছাড়া লেকের  ঠিক কাছেই শিব পার্বতীর ১০৮ ফিট উঁচু  মূর্তি  স্থাপন  করা আছে। পাশাপাশি  তামিল  মন্দির  মসজিদ  ও চোখে পড়ে । দেশটি  বহুজাতিক, বহু সাংস্কৃতিক  ও বহু ভাষা   অধ্যুষিত।এখানে ইংরেজি  ফরাসি  ক্রেওল ও এশিয়ান  ভাষা ব্যবহৃত  হয় ।  সমুদ্রতীরে   অবস্থিত পোর্ট লুইস এখানকার রাজধানী আর জমজমাট এলাকা। এখানে ডাচদের তৈরী  ঐতিহাসিক  কালো পাথরের প্রাচীন  দুর্গ  আছে। দুর্গের সামনে রাখা আছে বিশাল কামান।

সমুদ্রের জলে ভাসমান ছোট  ছোট  কাঠের জাহাজ  ক্যারিবিয়ান  দ্বীপের  কথা ও মনে করাতে পারে।  সমুদ্রের পারে আকাশ ছোঁয়া  অট্টালিকা  অফিস  শপিং মল সবই আছে পোর্ট  লুইসে।আফ্রিকার  বিভিন্ন  দেশে রাজনৈতিক  ও জাতি ধর্ম গত সংঘাত বিরাজমান  হলেও মরিশাসে হিন্দু  মুসলিম  খ্রিষ্টান  তিন সম্প্রদায়ের  লোকই সম্প্রীতি  ও সৌহারদ্যর সঙ্গেই সহাবস্থান  করে।

অনেক  ছোট  ছোট  দ্বীপের সমষ্টি  মরিশাস কোথাও  জলপ্রপাত কোথাও সরল বৃক্ষের বন একাধিক গল্ফ  কোর্স  পাহাড়ি  পথের চড়াই  উতরাই,  নীল সমুদ্র  সব মিলিয়ে  নয়নাভিরাম  সৌন্দর্য ।পর্যটন  শিল্পে  এই দেশটি  সারাবিশ্বে সুপরিচিত  প্রাকৃতিক  সৌন্দর্যের  জন্য ।  সবুজ  সবুজে ঘেরা নীল নীলিমায়  মরিশাস  সব ভ্রমণ বিলাসী  মানুষদের জন্য।   হানিমুনে অথবা পরিবার  পরিজনদের সাথে  অবশ্যই  ঘুরে আসা যায়  প্রকৃতির স্বর্গ রাজ্য মরিশাস।

ছবি: গুগল