প্রায় প্রতিটি রাস্তায় আছে এরকম পথের-দোকান

স্মৃতি সাহা

জেগে থাকা নিউইয়র্ক শহর। কবি লোরকার ভাষায় স্লিপলেস সিটি। সেই শহরে স্বপ্নও যেন নির্ঘুম। এই শহরের দিনরাত্রির রোজনামচা স্মৃতি সাহার কলমে প্রাণের বাংলায় নিউইয়র্ক থেকে ধারাবাহিক ভাবে।

নিউইয়র্ক; কংক্রিটের শহর, আলোর শহর, ঐতিহ্যের শহর,অভিবাসীদের শহর,পর্যটকদদের শহর, হলুদ ক্যাবের শহর, ব্রডওয়ে শো-এর শহর, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির শহর আর স্ট্রিট ফুডের শহর! একটু থমকে গেলেন কি!? পৃথিবীর সবচেয়ে বড়,আধুনিক আর সভ্য নাগরিকতার শহরে পথের খাবার! যে শহরে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় চেইন রেস্টুরেন্টগুলোর প্রধান শাখা, সেই শহরে পথে প্রান্তরে খাবার পাওয়া যায়! হ্যাঁ, পাওয়া যায়। আর সেই পথের খাবারগুলোর স্বাদ আর জনপ্রিয়তা কিন্তু খুব ঈর্ষণীয়। নিউইয়র্কে ঘুরতে আসা পর্যটকদের উইশ লিষ্টে এই স্ট্রিট ফুডের স্বাদ গ্রহনের ইচ্ছেটা থাকে সর্বাগ্রে। চলুন তাহলে নিউইয়র্কের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পরিচয় করে নিই সেখানকার স্ট্রিট ফুডের সঙ্গে।
নিউইয়র্কের সব জায়গায় এমনকি খোদ ম্যানহাটনে কোনো ব্যস্ত অথবা অলস সময়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনি দেখা পেয়ে যাবেন স্ট্রিট ফুডের ছোট ছোট দোকানগুলির। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় বসে এরকম পথের দোকান। সবার কিন্তু ব্যবসা করার ছাড়পত্র আছে। খাবারের এই আয়োজনের সঙ্গে জুড়ে থাকে ছোট ঠ্যালা গাড়ি। শহর নিউইয়র্কের রাস্তার খাবারের দোকানগুলো চারপাশ এই চারপাশ আবদ্ধ থাকায় খাবার একইসঙ্গে স্বাস্থ্যসম্মত আর পরিচ্ছন্ন। আপনি নিশ্চিন্তে এখান থেকে খাবার কিনে নিউইয়র্কের সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে নিজের রসনাকে তৃপ্ত করতে পারেন।
এবার চলুন এক ঝলক চোখ বুলিয়ে দেখে নিই কী থাকে এই খাবারের তালিকায়? হটডগ, স্যান্ডুইচ, স্ন্যাকরোল,প্রেটজেল,শর্মা,নাচোস্, ডাম্পলিং,আইস্ক্রিম, স্টাফড পিটা,ইন্ডিয়ান ক্রেপ(দোসা), বিরিয়ানি, গ্রিল্ড চিজ স্যান্ডুইচ, ট্যাকোস্, সিনামন রোল,কাঠিরোল,নুডুলস্, ওয়াফেল, স্মুদি আর আছে জায়রো। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই খাবারগুলোর স্বাদ কিন্তু গাড়ি ভেদে ভিন্ন। একেক গাড়ির খাবারের স্বাদ নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখেও সমভাবে সুস্বাদু। আপনি যদি কয়েকটি খাবারগাড়ির একই ধরণের খাবারের স্বাদ গ্রহন করেন তবে এদের স্বাদের ভিন্নতা ঠিক বুঝে যাবেন। এখানকার স্ট্রিট ফুডের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর বৈচিত্র্যতা। কোথাও চাইনিজ খাবার তো কোথাও মোগলাই খাবার। আবার কোথাও মধ্যপ্রাচ্যের খাবার তো কোথাও ইন্ডিয়ান খাবার। আর ঠিক এই বৈচিত্র্যই আপনাকে বাধ্য করবে খাবার গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে। একেকদিন একেক ধরণের খাবারের স্বাদ গ্রহনে আপনি আগ্রহী হয়ে উঠবেন। ব্যস্ত নিউইয়র্কারদের জীবনে যে কত গুরুত্বপূর্ণ এই স্ট্রিট খাবার তা বোধ হয় বলে বোঝানো যাবে না। যখন দুপুরে কাজের ফাঁকে হন্তদন্ত হয়ে কোন নিউইয়র্কার অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে জড়ানো জায়রো বা গ্রিল্ড চিজ স্যান্ডুইচ কিনে নেয় রাস্তার পাশের এই খাবারের গাড়িগুলো দেখে তখন বোঝা যায় এই খাবারগুলোর গুরুত্ব মানুষগুলোর জীবনে কত। যদিও প্রতিটি স্ট্রিট ফুড-ই সমানভাবে এখানে জনপ্রিয় তবুও একটি খাবারের কথা আমি উল্লেখ করছি এখানে, যার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। আর সেই খাবারটির নাম জায়রো। গ্রীসের এই খাবারটির স্বাদ গ্রহন করেনি এমন নিউইয়র্কারের সংখ্যা হাতে গোনা বলা যায়। এই জায়রো দুই রকমের হয়। একটি হয় পিটা রুটিতে র্যাপ আরেকটি ওভার দ্যা রাইস। চিকেন, ল্যাম্ব, বিফসহ আরোও কিছু মাংসকে ছোট টুকরো করে বিভিন্ন মশলার সহযোগে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা হয়। এরপর তা বিভিন্ন সস আর সালাদ সহ জিরা রাইস বা পিটা রুটির সঙ্গে দেওয়া হয়। ফ্লেভার আর রসালো মাংসের সমান অবস্থান এই খাবারটাকে অনন্য করে তোলে। কখনো নিউইয়র্ক এলে জায়রোর স্বাদ গ্রহন করতে ভুলবেন না যেন। নিউইয়র্কের বৈচিত্রের আসলে শেষ নেই। তা সে খাবার হোক, অধিবাসী হোক, ঐতিহ্য হোক বা সংস্কৃতি। আর এই বৈচিত্রের মাঝেই লুকিয়ে এই আলোর শহরের প্রাণচাঞ্চল্য।

ছবি: লেখক