জনমের মত হায় হয়ে গেলো হারা

সুলতানা শিরিন সাজি

( অটোয়া থেকে) : জীবনের কিছু সময়ের স্মৃতি বা অনুভূতি মনে থাকেনা। ফেব্রুয়ারী ১ ,২০১৭ তে সকাল এসেছিল গভীর এক দুঃখ বারতা নিয়ে। অস্ট্রেলিয়া থেকে দোয়েলের ফোন পেয়ে ঘুম ভেঙেছিল। এত সকালে ফোন পেয়ে ফোনটা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকি। পাছে অন্য কারো ঘুম না ভাঙে।
ঘুম ভাঙলো সবারই।

মায়ের লেখা ডাইরীর পাতা

দোয়েল তো শুধু দুটো শব্দ বলেছিল। ফুপু, দাদী………………আর তো কিছু বলে নাই।আমার সেই চিৎকার আমার কানেই বাজে।
আর তো কিছু মনে পড়েনা।

কত ভয়, কত আশংকা নিয়ে কতরাত ঘুমাতে গেছি। কত বছর।
দূরে থাকলে এমন হয়। কুশলাদি জানার জন্য কেউ রাত গভীরে বা ভোরবেলা ফোন করেনা। শুধু দুঃখগুলো এভাবেই আসে।

ভীষন এক মন খারাপ নিয়ে,আমি যখন ঘুমের অতলে তলিয়ে স্বপ্ন দেখে বেড়াচ্ছি আর মা হুট করে চলে গেলেন ওখানে। দুপুরে খেয়ে নামাজ পড়ে শুয়েছিলেন।বিকালে নামাজের আজান শুনে উঠি উঠি করছিলেন। অথচ আর উঠলেন না।
আপার চোখের সামনে চলে গেলেন মা। গোধূলী লগনে চলে গেলেন মা।

বয়সজনিত অসুখ বিসুখ তো ছিলোই। প্রায় ছয় বছর শুধু ব্লেন্ডারে লিক্যুইড করে দেয়া খাবার (মূলতঃ দুধভাত ) খেয়ে মা বেশ ছিলেন।
সপ্তাহে অন্তত ৩/৪ দিন কথা হতো। যেদিন হতোনা ,মনে হতো কি যেনো বাকি থেকে গেলো। খুব কম কথা বলতেন মা,তবু মা করে ডাকার একটা মানুষ। একটা বিশাল আশ্রয়। একটা অদ্ভুত মায়ার জায়গা। কারো প্রতি কোন অভিমান বলার জায়গা।
মা।
মাকে ছাড়া একটা বছর।
আর কথা হলোনা। ঘুমাতে যাবার আগে মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন বলি………একদিন আরো গেলো মা। আজ এক বছর।

মা ডাইরী লিখেছিলেন। যেহেতু শেষের দিকে কথা একদম বলতেন না। আপাকে বলেছিলাম মাকে একটা ডাইরী দিও। বেশ কয়েকটা পাতা লিখেছিলেন মা। প্রথম শুরু করেছিলেন এভাবে,”বিসমিল্লাহ হেররাহমা নিররাহিম,সাজির উপদেশ যেনো ডাইরী লিখি। এই ৮৪ বছর বয়সে লিখা শুরু করলাম বাকি জীবন যাতে লিখতে পারি।”

মায়ের সঙ্গে বড় ভাই ও আমরা ৩ বোন

আহা মা, মাকে কি করে আমি উপদেশ দেবো?
আমার শুধু মনে হতো, মা সারাদিন চুপ করে বসে থাকেন। কত ভাবনা,কত কথার খেলা তো চলে ,তার একটু নাহয় লিখুক। লিখেছিলেন। কয়েকটা মোটে পাতা,সেখানে শুধু মায়ের ছেলেবেলার গল্প,মায়ের মা বাবা। ভাইবোদের কথা। মায়ের নানী বাড়ির গল্প। যেটা এখন কলেজ। আরো কত কথা। খুব ইচ্ছা ছিলো মা লিখবে ,সেটা নিয়ে একটা বই ছাপাবো। মা ছোটবেলায় গল্প করেছিলেন,নানী নিজের হাতে লিখে একটা বই বাঁধিয়েছিলেন। নাম “তৃষিত মরু”। নানী সম্ভবত নিজের জীবনী লিখেছিলেন।
আমার মায়ের হাতে লেখা সেই পাতাগুলো দিয়ে আমার বই এর একটা অধ্যায় হবে। এটা আমার ইচ্ছা।আমার বই “রানুর আকাশ” এ আ্রমার মায়ের হাতের লেখা সেই পাতাগুলো থাকবে। আমাকে লেখা মায়ের অজস্র চিঠি আছে। সেই চিঠিগুলো পড়লে চোখ ভেসে যায়।

ভালো থাকো মা। যেখানে গেছো সেখানে কি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার মত ‘হাওয়া বয় শন শন তারারা কাঁপে, ”
সেখানে কি আমাদের জন্য মন কেমন করে মা?
আমার তো চোখে ভেসে যায় মা। যখন তখন ,খুব মন খারাপ হয়ে যায়। আজকাল অভিমান ও হয় ছোটবেলার মতন।অভিমানের সেই কথা কাউকে বলা হয়না। একা বসে থাকলে মন কেমন করে।

দেশের যাবার কথা হচ্ছে। কার কাছে যাবো মা? কোথায় যাবো? আর একবার ছুঁয়ে দেখার সাধ ছিল। আজকাল নিজের হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে তোমাকে মনে পড়ে মা। কপাল,চুল,চোখের কোন ।আমি কি তোমার মত হয়ে যাচ্ছি মা।খুব শূন্য লাগে মা। হাহাকারের মত দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে।
অনেক ঋনী মা তোমার কাছে, আমাকে জন্ম দেবার জন্য। নিজে মা হয়ে বুঝেছি , মা হবার আনন্দ। ভালোবাসি মা। প্রার্থনা করি শান্তিতে থাকো।যেখানে চলে গেছো সেখানে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে