বেঁচে থাকুক একান্নবর্তী পরিবার

তামান্না সেতু

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

একান্নবর্তী পরিবারে এক ভাই-বোন বা দুই ভাই-বোন বলে কিছু হয় না। কম করে হলেও দশ-বারো ভাই-বোন হয়। এক মা-বাবা বলেও কিছু হয় না। বড় চাচি বা খালাকে বড় মা, বড় চাচাকে বড় বাবা বলা হয়। আবার মেঝো খালাকে মামনি, মেঝো চাচাকে মেঝো বাবা বা অনেক অনেক আজব আজব আদরের ডাক দিয়ে মা বাবাই ডাকা হয় তাদের। বাচ্চারা বড় না হওয়া অব্দি আপন মা আর খালা মায়ের তফাৎ বোঝে না। আপন বোন আর চাচাতো বোনের তফাৎ বোঝে না।

আমার কাছে পৃথিবীর সবথেকে আনন্দদায়ক যায়গা হচ্ছে একান্নবর্তী পরিবার। প্রাইভেসি নামক স্মার্ট শব্দের ভীড় সেখানে নেই বলে অট্টহাস্য, ঝগড়া, খুনসুটির, অভিমান, বালিশ নিয়ে কাড়াকাড়ি, এর খাবার সে খেয়ে ফেলা বা এর জামা সে পরে ফেলার মতো অত্যন্ত আনস্মার্ট শব্দ সেই বাড়িগুলোতে ধুপধাপ করে ঢুকে পড়ে।
আমি খুবই সৌভাগ্যবান একজন মানুষ, আমার জন্ম তেমনই একটা আনস্মার্ট পরিবারে হয়েছিল। আমাদের পরিবারে সবসময়ই ফ্রি সাইজ শার্ট কেনা হতো কারন আমার সাত মামা, যাদের বয়স তখন ২৬ থেকে ১৪ এর ভেতর, তারা সকলে যেন প্রয়োজন মতো সময়ে একই শার্ট পরতে পারে সেই ব্যবস্থা। একই সাইজের লুঙি কেনায় সাইজে সবথেকে লম্বা মামাটা জুম্মার দিন নামাজ পড়তে যেতো না এবং কারন হিসেবে সে বলতো, ‘ফরজ ঢাকতে গেলে সুন্নত বের হয়ে যায় এই লুঙিতে”। মানে, সে নাভি ঢাকতে গেলে পা এবং পা ঢাকতে গেলে নাভি বের হয়ে যাচ্ছে।
বিবাহিতরা রাতে একটি রুমে স্ত্রীর সঙ্গে ঘুমাতো বটে তবে সেটাকে কায়দা করে ‘বেডরুম’ বলার অবস্থা ছিলো না। সে রুমে যে কেউ যখন তখন ঢুকে পরতে পারতো, সে খাটে খুব রাত না হওয়া অব্দি তাস খেলা চলতো এবং সে ঘরের সকল সামগ্রীর ওপর পরিবারের সবার সমান অধিকার ছিল। মোট কথা সারা বাড়ি ঘুরে কোন কোনায় ‘প্রাইভেসি’ নামক শব্দের খোঁজ পাওয়া যেতো না।
এ বাড়ির বড়রা এ জীবনে কেমন ছিলেন আমি জানি না। আমরা ছোটরা বড় আনন্দে ছিলাম। আমাদের ‘স্পিচ ডিলে’ নামক অসুখ ছিলো না, ‘বাচ্চাটা খুবই শাই’ বলে বাবা-মা চিন্তিত ছিল না, বিষণ্ণতা নামক অসুখ ছিলো না, জীবনে নিঃসঙ্গতা নামক ব্যপার ছিল না, খেলার সাথীর অভাব ছিল না।
আমাদের স্ট্যাম্প জমানোর অ্যালবাম ছিল, সেই স্ট্যাম্প অদল-বদল করার সাথী ছিল। আমাদের হাড় মজবুত করার জন্য হরলিক্সের বদলে উঠোনে ভিটামিন ডি ভরা রোদ ছিল, গোল্লাছুট ছিলো, ভাত ঘুমের দুপুরে মায়ের অনুপস্থিতিতে ক্যারাম খেলার জন্য একগাদা ভাই-বোন ছিল, মা যখন অফিসের কাজে যেতেন তখন বড় মা ছিল। আমাদের জীবনে প্রচুর ‘ছিল’ শব্দ ছিল।
এখন পরিবারে প্রাইভেসি এসেছে। মা খালা চাচীরা স্বস্তি পেয়েছেন। বেডরুম হয়েছে কয়েক পদের, মাস্টার বেড, গেস্ট বেড, চাইল্ড বেড। ছিমছাম ঘর-দোর। সকলের আলাদা প্লেট, তোয়ালে, কফি মগ।
বড়দের আনন্দিত হবার কথা। তারা হচ্ছে না! তারা মুখ ভার করে এ ডাক্তার থেকে ও ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন, “বাচ্চাটা শাই হয়ে যাচ্ছে’ বলছেন।
বড়দের মন বোঝা খুবই ঝামেলার কাজ, তারা কখনোই আনন্দিত হন না। বড়দের মন বোঝা আমি বাদ দিয়েছি।
আজ আমার ছোট বোনের বাচ্চা হয়েছে। সে আছে ফরিদপুরে, সেখানে প্রাইভেসি নাই, একান্নবর্তী সবাই। সকাল থেকে মেসেঞ্জার ভরে গেছে বাচ্চার ছবিতে। একেকবার আমার একেক ভাই ছবি দিচ্ছে। আমার বোনটার হাত ধরে আমার ৭ মামী বসে আছে। মামারা আজান দিচ্ছে। অন্য বোনেরা কাঁথা কাপড় কাজলদানি নিয়ে বাচ্চার কাছে বসা। যে বোনের বাচ্চা হয়েছে তাকে এখনো বেডে দেয়নি। তবে বাচ্চা ইতিমধ্যে খালারূপে ৬/৭ জন মা পেয়ে গেছে।

একান্নবর্তী পরিবারগুলো বেঁচে থাকুক। বেঁচে থাকুক অগোছালো বেডরুম, আলনা। এক প্লেটে ভাত থাকুক সবার। এরই ভেতর বেঁচে থাকে শৈশব, শিশুর সুস্থতা।

ছবি: গুগল