প্রাণের বইমেলা- তোমায় বড়ই ভালোবাসি

কনকচাঁপা শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

একুশের মাসটা আমাদের বিশেষ মাস। এত সুন্দর আবহাওয়া- না-ঠাণ্ডা না-গরম, ফুলে ফুলে ভরা চারপাশ! এর মাঝে যেন আরো আলো করে ফুটে থাকা বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে একুশের বইমেলা। বইকে কেন্দ্র করে সমগ্র বাঙালির মিলনমেলা। বই কেনা ও একটু বেড়ানোর সুন্দর একটা সুযোগ এই বইমেলা। তো ২০১২ বইমেলাটা আমার জন্য খুবই ‘স্পেশাল’। স্পেশাল না বলে বিশেষ বলাটাই বোধহয় উচিত ছিল। কিন্তু ‘স্পেশাল’ শব্দতেই এর বিশেষত্ব ফুটে উঠছে। সেবার আমার কবিতার বই প্রকাশ করেছিল ‘পাঞ্জেরী প্রকাশনী’। ৬০টি কবিতা তারা বেছে নিয়েছে। সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী গৌতম ঘোষ। প্রায় মাসব্যাপী আমি ও জীবনসঙ্গী ইসলাম সাহেব অস্থির হয়ে আছি। ৬০টি কবিতা থেকে বাছাই করে ১০টি কবিতা আবৃত্তি করলাম। বইয়ের সঙ্গে সেটা সিডি হিসেবে পাঠকের জন্য আমার উপহার। আবহসংগীত করলেন মইনুল ইসলাম খান। কবিতা আবৃত্তি করব কী, কাঁদতে কাঁদতেই অস্থির। কারণ কলম দিয়ে তুলে আনি আমি হৃদয়ের যত দুঃখ। হাঃ হাঃ হাঃ। এরপর এলো সেই শুভক্ষণ। ৪ ফেব্রুয়ারি। আমি বিশাল দল নিয়ে হাজির হলাম বইমেলায়। আমার বিশেষ বন্ধু-বান্ধব, শ্বশুরবাড়ির প্রাণপ্রিয় সব আত্মার আত্মীয়, আমার নিজের ভাইবোন, দুলাভাই-ভাগ্নে সে এক বিশাল দল বটে। মোড়ক উন্মোচনের সময় ঘনিয়ে এলো। উন্মোচন করলেন আমাদের দেশের প্রধানতম সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। লেখালেখি তো অনেক দিন ধরেই করি; কিন্তু তা পাঠকের সামনে তুলে ধরার সুবিধাটা তিনিই করে দিয়েছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে আমার প্রথম বই ‘স্থবির যাযাবর’ বের করেছিল ২০১০ সালে অনন্যা প্রকাশনী। এর প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন ধ্রুব এষ! মেলায় আরো উপস্থিত হয়েছিলেন তারকা শিল্পী তপন চৌধুরী, মনির খান, শুভ্র দেব- গতবারও তাঁরা এসেছিলেন। গতবার এন্ড্রু কিশোরদাও এসেছিলেন। আমি ধন্য। কারণ তাঁরা সবাই এত ব্যস্ততার মাঝে শুধু একটা ফোন- তাতেই সাড়া দিয়েছেন। সবাই আমাকে ভালোবাসেন- এটা ভাবতেই মনটা ভালো লাগায় ভরে ওঠে। আর একটা কথা না বলে পারছি না। তা হলো আমার জীবনসঙ্গীর কথা। আমার গানের জন্য তিনি যা করেন তা তো সবাই জানে; কিন্তু আমার এই লেখালেখিতেও তাঁর কী যে উৎসাহ-আগ্রহ আমি তা বলে বোঝাতে পারব না। আমার মনে হয়, খুব কমসংখ্যক সঙ্গী আছেন যাঁরা তাঁদের আরেকজনকে এমন উৎসাহ, সহযোগিতা ও ভালোবাসা দেখিয়ে থাকেন। আমার সব শিল্পকলায় তিনি প্রধান উৎসাহদাতা। আমি তাঁর কাছে সমগ্র জীবনে ঋণী। যাক, মেলায় সে পুরো সন্ধ্যাটাই আমার কাটল ভক্ত, পাঠক, ক্রেতা ও বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে, অটোগ্রাফ-সাক্ষাৎকার দিয়ে। আমি কখনো কোনো কিছুতে নিজেকে নিজের বাইরে নিয়ে যাই না। কিন্তু ওই দিন অদ্ভুত এক ভালো লাগায় আমি উড়ছিলাম আমার সব সত্তা নিয়ে। তারপর মোটামুটি পুরো মেলাটা একটা চক্কর দিলাম। এত বই, এত ভালো বই, সব যদি আমি কিনতে পারতাম! তার মধ্যে কিছু বই অবশ্য আছে যেগুলোর মান নিয়ে আমার একটু সংশয়। আমি জানি না, মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কর্তৃপক্ষ কতটুকু ভাবতে পারে। কিছু শিশুতোষ বই আছে, অনুবাদ করা। এগুলোতে অনুবাদক কারা, তা লেখা নেই। সেই বইগুলোর মানও তেমন নয়। প্রবন্ধ, গবেষণালব্ধ বই তো পড়বেন প্রাজ্ঞজনেরা- সেগুলো তাঁরা ভালো-মন্দ বুঝে পড়বেন। কিন্তু কিশোর সমগ্র, শিশুতোষ বই এগুলোর মান বোধহয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। আমি একজন সাধারণ পাঠক হিসেবেই তা বলছি- এটাকে সাধারণ অভিমত হিসেবে নেওয়াই ভালো। তবে আমি বিশ্বাস করি, মেলাটা যত বড় দেখায় তার চেয়ে তার ব্যাপ্তি, অন্তর্গত সীমানা আরো অনেক বড়। মেলার বইগুলো সারা বছর ধরেই পাঠক-ক্রেতাদের জ্ঞানের, মনের ও প্রাণের আলো ও খোরাক জুগিয়ে যাবে। আমার বিশ্বাস, আমাদের তরুণরা তাদের অনেক যত্নে গোছানো, জমানো টাকাগুলো এ বইমেলায় ভালোবেসে খরচ করবে। আমার আশা, মেলা শেষে ভাঙা হাটের মতো শুধু বইয়ের স্টলগুলো খালি হয়ে যাবে। এতে প্রকাশকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার যত আনন্দ, তার চেয়ে ‘ক্রেতারা বই পড়বে’- এটাই বেশি আনন্দদায়ক ও আশা জাগানিয়া। কারণ ইবুক-ইনেটে বই পড়া এক রকম সাশ্রয়ী ও যুগোপযোগী। কিন্তু বইয়ের গন্ধ, সাদা আবহে কালো অক্ষরের বলা কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি মৌলিক ও সৌন্দর্যময়। বইয়ের মতো সুন্দর জিনিস পৃথিবীতে আর আছে কি? চিরসুন্দর, চিরযুবা বিশ্বস্ত বন্ধু? অকৃত্রিম, আন্তরিক বইগুলো কখনো দুই রকম কথা বলে না এবং খোলা মাত্রই নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়। মেলায় একটু ধুলো-কাদা তো থাকবেই, তবে ফুল আরো একটু, আরো একটু না, অনেক বেশি থাকলে খুবই খুশি হতাম- ধন্য হতাম। কারণ শিশু, তরুণ, ফুল ও বই একত্রে দেখতে খুবই ভালো লাগে। এ সব কিছুর সমন্বয়ে বইমেলা হয়ে উঠতে পারে জ্ঞানের পুণ্যভূমি। মারামারি, কলহে নিমগ্ন সাম্প্রতিক এই বাংলাদেশে এমন প্রজ্ঞাময় একটা স্থান এক মাস ধরে পাওয়ার আশাটা আমায় বড়ই লোভী করে তোলে। প্রাণের একুশ, প্রাণের বইমেলা, প্রাণের উৎসবমুখর এই দিনগুলো বড়ই ভালোবাসি।

ছবি: গুগল