মনে পড়লো তোমাকে বইমেলা…

আমাদের অমর একুশে‘র বইমেলার সংসার। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার সঙ্গে।একান্তই ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়তো। আবার হয়তো একেবারে ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়।যে সময় আর মানুষগুলো জড়িয়ে থাকলো সেই সময়ের সঙ্গে তাদের মনের মধ্যেও হয়তো বইমেলার স্মৃতি রয়ে গেছে এমনি করেই। ফেব্রুয়ারীর বইমেলা প্রতি বছর একবার করে ফিরে আসে।
আকারে অনেক বড় হয়েছে বইমেলা। মেলার আয়তন সম্প্রসারিত হয়ে ঠেকেছে গিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আন্তর্জাতিক অবয়বের তখমা লেগেছে মেলার মুকুটে। প্রচুর সংখ্যায় বই প্রকাশিত হচ্ছে, বিক্রি ছাড়াচ্ছে কোটি টাকার সীমা। ঝকঝকে বইয়ের প্যাভেলিয়ন, মুদ্রন শিল্পের বিকাশে আরো ঝকমকে বই-সব মিলে বইমেলা ভীষণ টগবগে প্রাণ এখন।
নতুন, প্রাণবান এই বইমেলার আয়োজন থেকে খানিকটা পিছু হটে গিয়ে সেই পুরনো বইমেলার স্মৃতির বাক্স খুলে দেখে নেয়া সেই পুরনো সময়ের বইমেলার ছবি। স্মৃতির সেইসব পৃষ্ঠা নিয়েই এই সংখ্যা প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন।

কবি শামসুর রাহমান

মেলায় ঘুরতে এসে হঠাৎই একা হয়ে যাই। শীতকাল বিদায় নিচ্ছে। তবু বাতাস তখনও সামান্য শীতের আশ্রয়।চোখের সামনে এক ছায়াছবির রাশপ্রিন্টের মতো বয়ে চলে গল্প, পুরনো সময়ের গল্প। ফাল্গুনের ঝরা পত্রালীর মতো বুকের ভেতরে শুরু হলো স্মৃতির পাতাদের পতন। কত কথা থাকে সেই স্মৃতিদের, কত মানুষ থাকে স্মৃতির মধ্যে। সেই আশি‘র দশকে বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গনের বইমেলা। দলবেঁধে আড্ডা দেয়া মেলা প্রাঙ্গনে, মেলার শেষ সপ্তাহে বই কেনা, বর্ধমান হাউজের চওড়া সিঁড়িতে গল্পের সন্ধ্যা। দেখতে পাচ্ছি কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ বসে আছেন একটা স্টলে, অক্লান্ত স্বাক্ষর করছেন বইতে। সামনে ভক্ত পাঠকদের লম্বা লাইন। তাদের চাপে এক সময় প্রায় ভেঙ্গে পড়ে যাবার অবস্থা স্টলের। লাইন পার হয়ে মেলা প্রাঙ্গনে হেঁটে যেতে দেখা কবি শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, ব্যাগ কাঁধে কবি আসাদ চৌধুরী, হেলাল হাফিজের সঙ্গে।এই এখনো স্পষ্ট দৃশ্য থেকে তারা বের হয়ে এসে হেঁটে চলে যান চোখের সামনে দিয়ে।

হুমায়ূন আহমেদ

ওই তো, চায়ের স্টলে গভীর আড্ডায় লিপ্ত আহমদ ছফা। মেলার মাঠের মাঝামাঝি গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছেন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহন রায়হান জাহিদ হায়দার, কথাশিল্পী মঈনুল আহসান সাবের, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক আলী রীয়াজ, কথাশিল্পী ইসহাক খান, প্রয়াত সাংবাদিক, গল্পকার মিনার মাহমুদ। সে আড্ডায় নিজেকে গুজেঁ দিচ্ছেন কোনো তরুণ সাংবাদিক।আগামীকালের মেলার রিপোর্টের মালমশলা সংগ্রহ চলে তার। একটা স্টলে নিমগ্ন হয়ে পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন।সেখানেও বেশ ভীড়। এক ফাঁকে ভেতরে ঢুকতেই মিলন স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে হাসলেন। বললেন-কেমন আছো, চা খাবে? আচ্ছা, মানুষের এইসব শব্দ, সংলাপ শুনি ইথারে ভেসে থাকে? সত্যি থাকে হয়তো। না হলে এই মেলার একলা মাঠে দাঁড়িয়ে শুনতে পাচ্ছি কিভাবে!
বইয়ের প্যাকেট হাতে বাংলা একাডেমী চত্বরে হেঁটে যাচ্ছেন অসংখ্য পাঠক। স্টলের সামনে অখন্ড মনযোগে কেউ বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছেন। তখনকার তরুণ কবি, লেখক আর রাজনৈতিক কর্মীদের দেখা যাচ্ছে মেলা প্রাঙ্গনের পেছন দিকে চায়ের দোকানের সামনে আড্ডা দিতে।তারা এসেছে মেলার নিরাপত্তা দেখভাল করতে। ভালোবাসায় থরোথরো হয়ে শাড়ি পরিহিতা কোনো নারীকে দেখা যাচ্ছে তার প্রেমিককে খুঁজতে।

রফিক আজাদ

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল পরিসরে বইমেলার আয়োজন ঘুরে দেখতে দেখতে স্মৃতির অনেক পৃষ্ঠা উল্টে গেলো ফাল্গুন আসি আসি সময়ের হাওয়ায়।হাতে সিগারেট নিয়েই চোরাগোপ্তা ভঙ্গীতে ঢুকে পড়ছি মেলার গেট দিয়ে। হঠাৎ মুখোমুখি কথা সাহিত্যিক রশীদ হায়দারের। একাডেমীর কর্তাব্যক্তি। সিগারেট দেখেই লাফিয়ে উঠলেন রশীদ ভাই-ফেলো, সিগারেট ফেলো। একাডেমীর ভেতরে মেলার সময় এসব চলবে না।

হেলাল হাফিজ

বারবার বলেও তোমাদের কোনো কথা শোনানো যায় না।অতঃপর সলজ্জ ভঙ্গীতে অসহায় সিগারেট জলাঞ্জলি দিয়ে মেলায় প্রবেশের অধিকার লাভ। এগুতেই দূর থেকে ক্রমশ দৃশ্যমান প্রতীক পালিকেশন্সের বিশাল বপু আলমগীর রহমান আর অনন্যা প্রকাশনীর মনিরুল হক। কাছে আসতেই গম্ভীর কন্ঠে, নিরাসক্ত ভঙ্গীতে আলমগীর রহমানের বাণী ভেসে আসে। খাস পুরান ঢাকার ভাষায়-স্টলে পিঠা আছে, চা আছে। গেলে যাইতে পারেন। আপনাদের তো আবার সমাদর না করলে আইবেন না।
দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম তখন? নিশ্চয়ই। দাঁড়ানোর কথাই।সাংবাদিক, গল্পকার আর প্রকাশক-এই তিনের সমন্বয় আলমগীর রহমানের মধ্যে। তারপর কথা যখন বলেন ধারণ করেন মারমুখী ভঙ্গী। কেউ বুঝবেই না এই মানুষটির মধ্যে স্নেহের অন্তঃশীলা বয়ে চলেছে। মনিরুল হককে প্রায় বগলদাবা করে চলে গেলেন আলমগীর রহমান। তার ছায়া পড়ে থাকলো মেলার মাঠে। হয়তো তখনো আমার মনেও। ঘুরতেই কাঁধে হাত রাখে লেখক, সাংবাদিক সৈয়দ শহীদ। কাঁধে তার সেই কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ। পাশেই দেখি বিদ্রুপ মাখা একটা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে হাজির প্রয়াত কবি-লেখক, সাংবাদিক আহমদ ফারুক হাসান।আমরা হাঁটতে থাকি। কোথায় যাবো? হাঁটতে হাঁটতে হয়তো পুরানা পল্টনের কোনো চায়ের দোকানে। যেমন যেতাম অনেক অনেক বছর আগে। সবাই ছায়ার মতো, দেখা দিয়েই হারিয়ে যায়। চরিত্র সব যেন দালির আঁকা ছবির সেই গলিত ঘড়ি। কালের হাত গলে ফুরিয়ে যাওয়া দৃশ্যের অংশ।এমনি সব দৃশ্যের অন্তর্গত হয়ে গিয়ে দেখতে পাই ছড়াকার আমীরুল ইসলাম আর লুৎফর রহমান রিটনকে। উজ্জ্বল বর্ণের পোশাক পরিহিত দুই মূর্তি হাসি দিয়ে যেন সম্ভাষন জানালো। কানে বাজলো আমীরুল ইসলামের কন্ঠস্বর-কী মিয়া, খবর কি তোমার?

মঈনুল আহসান সাবের, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মিনার মাহমুদ

হঠাৎ করেই দেখা হয়ে যায় এক বই চোরের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলো সেই সময়ে। চুরি করা একগাদা বই তার হাতে। হেঁটে আসছে আমার দিকেই। অবাক হয়ে তাকাই। কোত্থেকে ফিরে এলো এই চরিত্র। এখন তো আর মেলায় বই চোরদের গল্প শোনা যায় না। তখন ছিলো। মুখোমুখি হতেই প্রাণখোলা হাসি হেসে সদ্য তস্করবৃত্তির সঞ্চয় দেখায় আমাকে। নেড়েচেড়ে দেখি বইগুলো।সময়ের পুরু ধূলো জমে আছে সেই বইয়ের উপর। চরিত্রটি হেসে জানিয়ে গেলো সেই পুরনো খবর, এবারও মেলার শেষের দিনে তারা বের হবে ‘বই ভিক্ষুক’ হয়ে। চেয়ে চেয়ে সংগ্রহ করবে বই বিভিন্ন স্টল থেকে। আচ্ছা, কতকাল আগে এসব দৃশ্য অভিনীত হয়েছিলো! একা হাঁটতে হাঁটতে ভাবি…।
মেলার গেটের ভীড় কাটিয়ে বের হই। সময়টা সেই আশির দশক।কোনো স্টল থেকে ভেসে আসছে আবৃত্তিকারের উদাত্ত কন্ঠ, কোথাও বাজছে গান। পাতা ঝরে যাচ্ছে, পাতা ঝরে যাচ্ছে…হঠাৎ মনে হলো ভীড়ের মধ্যে প্রয়াত বন্ধু গায়ক, সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরীকে দেখলাম! উদভ্রান্ত গতিতে হেঁটে গেলো পাশ দিয়ে। উড়ছে মাথার চুল। গুনগুন করে কোনো গান গাইছিলো সঞ্জীব। যেমন তিরিশ বছর আগে গাইতো। গান ছড়িয়ে দিয়ে সঞ্জীব উধাও। হাঁটি বন্ধু আর সহযোদ্ধা লেখকদের সঙ্গেই। আমাদের সবার্ তো তখন কেবলই রাত হয়ে যায় নিজস্ব ঠিকানায় ফিরতে।

সঞ্জীব চৌধুরী

কব্জিতে বাঁধা ঘড়িতে সময় যেন স্বাধীন পাখি, ছটফট করছে ওড়ার আয়োজনে। হঠাৎ দেখা বন্ধু, সাংবাদিক ইমরানের সঙ্গে। ফিরছে কাজ শেষ করে দৈনিক বাংলা থেকে। স্মৃতি প্রতারণা করে না। তাই এতোকাল পরেও যেনো স্পষ্ট শুনতে পাই তার কন্ঠস্বর। বন্ধু শামীমকে দেখলাম মনে হলো এক ঝলক। সাপ্তাহিক বিচিত্রার মেলা জরিপ শেষ করে বের হচ্ছে মেলা থেকে। সঙ্গে লেখক, সাংবাদিক জসিম মল্লিক। তারা দুজন কি আমাকে উদ্দেশ্য করে হাত নাড়লো? নাহ বিভ্রম। এরকম তো আর হয় না। চলে যাওয়া সময়ের ভেতর থেকে চরিত্রগুলো নিজস্ব ভূমিকায় আবার উঠে আসতে পারে না।
আমাদের রাতের আয়ু তখনও বাড়ছে শুধু। টিএসসি‘র মোড়ে পৌঁছানোর আগেই দেখা হয় তৎকালীন দৈনিক বাংলার সাংবাদিক খায়রুল আনোয়ার মুকুলের সঙ্গে। তার সঙ্গে হয়তো আছে আরো কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু। রাতের আয়ু বাড়াতে শুরু হয় নতুন আড্ড। সেখানে নতুন কবিতার বই, উপন্যাস, কোন বইয়ের কাটতি বেশী এসব আলোচনাই মূখ্য হয়ে ওঠে। পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে হেঁটে যাচ্ছে কবি শ্যামল জাকারিয়া, তারিক সুজাত, ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক কবি ইস্তেকবাল হোসেন। হঠাৎ কবি নবারুণের সেই অবিস্মরণীয় লাইন ছুঁড়ে দেয় ইস্তেকবাল আমাদের জটলায়-জল্লাদের উৎসব মঞ্চ আমার দেশ না। চমকে উঠি সবাই। ফাল্গুনের হাওয়ায় কোনো পোস্টারের দোকানে দুলে ওঠে চে গুয়েভেরার জ্বলজ্বলে পোস্টার।
এই খন্ড খন্ড আড্ডায় রাত বাড়তে থাকে। আড্ডার প্রাণ বইপত্রের পোটলা হাতে মানুষের ভীড়ে গা ভাসিয়ে চলতে থাকে শাহবাগের দিকে। সেখানে মৌলি, সেখানে সিনোরিতা রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান কোহিনূর জুড়ে নতুন আড্ডা, বই নিয়ে তর্ক বিতর্ক।

আহমদ ছফা

বাতাসে কি টিয়ার গ্যাসের ঝাঁঝ? অন্ধকার ভেদ করে বিশ্ববিদ্যালয়মুখী রাস্তার ওপর ব্যারিকেড দেখা যাচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নৈঃশব্দ ভেদ করে গুলির শব্দ শোনা গেলো! সচকিত হয়ে ওঠে সাংবাদিকরা। সেই বছর তিরিশ আগে এমনি সন্ধ্যাগুলো অনিরাপদ হয়ে উঠতো। মিছিলের মিলিত কন্ঠস্বর শোনা যেতো, শোনা যেতো ধাবমান পুলিশের বুটের আওয়াজ, বাতাসে ভেসে থাকতো টিয়ার শেলের ধোঁয়া। উন্মাতাল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জীবন বাজি ধরেছিলো তখনকার তরুণরা।টিয়ার গ্যাসের গন্ধ ভেসে এলা নাকে? অলৌকিক কোনো সিনেমার দৃশ্যের মতোই সামনে দিয়ে চলে মোটর বাইকে কঠিন চোয়ালের রাজনৈতিক কর্মীরা! নাহ, এতো বছর পরে টিয়ারগ্যাস আসবে কোত্থেকে!কান পাতলে কেন শোনা যাবে তাড়া করে ফেরা পুলিশের বুটের শব্দ!কেনো দেখতে পাবো সেই কর্মীদের?এখন তো সময়ের স্থিতিকাল চলছে। ভীষণ শান্ত হয়ে আছে চারদিক। তখন তো বইমেলা উপদ্রুত হয়ে থাকতো রাজনীতির সংঘাতময় পরিবেশে। এখন তো হুট করে মেলা বন্ধ হয়ে যাবে না তেমন কোনো কারণে। বারুদ-ভর্তি রাজনীতির থলে ফেটে যাবে না আচমকা আগুনে।
একাডেমীর মূল প্রাঙ্গন ছাড়িয়ে আবার ফিরি মূল রাস্তায়। সন্ধ্যা ছড়িয়ে পড়ে গাঢ় হয়েছে সেখানে আরো অনেকটা। নাক টেনে গন্ধ নেই বাতাসে। চারপাশে আকাশে মাথা তোলা বহু গাছের পাতা ছুঁয়ে আসা হাওয়া আজো তেমনই সুগন্ধী। তবু অত আলো, অত হৈচৈয়ের মাঝে কোথায় যেন ভাঙ্গা বেহালার সুর বাজলো কানে। সে সুর শুধু তুলে আনে পুরনো সময়, হারানো বেদনা। লেখক, বন্ধু, পরিচিত মানুষ সবমিলে কেমন এক স্বজনদের মিলনমেলা ছিলো সেইসব দিন। হয়তো এখনো আছে তেমনই। শুধু বদলে গেছে মানুষ, বদলে গেছে পাঠক নতুন সময়ের ভীড়ে।
ঘাড় ফিরিয়ে দেখি নতুন পাঠক বই কিনে ঘরে ফিরছে। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আজো কী মিষ্টি! বইমেলা এমনি করেই এসেছিলো, আসে, আসবে।কত কথা মনে পড়িয়ে দিয়ে চলেও যাবে।ভাবতে ভাবতে হাঁটতে শুরু করি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল