টাকা হয়তো আমার থাকবেনা কিন্তু কাজটা থাকবে-ঋত্বিক ঘটক

অমিতাভ চক্রবর্তী

– দাঁড়াও হে, দাঁড়াও! সবটা শুনে যাও। দু পেগ এক সঙ্গে নিয়ে আসবে। দু পেগ …
– সোডা!
– না হে না। আমি সোডা দিয়ে কখনো মদ খাইনা। যাও। জলদি নিয়ে এসো…জলদি…

ঠোঁটে বিড়ি। হাতে মদের গেলাস…অধিকাংশ সময়ে বাংলা মদের বোতল।। উস্কোখুস্কো মাথার চুল, উদ্ভ্রান্তের মতো এলোমেলো, গালে কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি। পড়নে ধূলোমলিন পাজামা পাঞ্জাবির সঙ্গে কাঁধে ঝোলা, ঐ শান্তিনিকেতনি…। কালো ফ্রেমের পিছনে কৌতুক মেশানো ক্ষুরধার দৃষ্টি, অন্তর্ভেদি।
তিনি কে ? মানে ঋত্বিক নামের ঐ মানুষটির পরিচয় কি? জবাব আসে সরাসরি, স্পষ্ট, তরবারির মতো তীক্ষ্ম। হেঁয়ালি নেই সামান্যতম। যেন লেন্সের ভিতর দিয়েই নিজেকে দেখা, – ‘ আমি মাতাল। ভাঙা বুদ্ধিজীবি, ব্রোকেন ইনটেলেকচুয়াল…’

দুপেগ মদ এলো। গলায় ঢেলে উঠে পড়লেন গাড়ীতে। গাড়ী ছুটলো শিয়ালদহ। রাতের ট্রেন ধরতে। গন্তব্য বহরমপুর। যাত্রা সঙ্গী পূর্নেন্দু পত্রীর স্মৃতি রোমন্থন’ ‘ ট্রেনে উঠেই ঋত্বিক তার ময়লা পাঞ্জাবিটা খুলে মেঝেতেই দুপা ছড়িয়ে বসে পড়লেন। ঢোলা পাজামা হাঁটু অবদি গুটিয়ে ফের শুরু হলো মদ্যপান।
– কে আমাকে টাকা দেবে শুনি…?
– হাতে টাকা পেলেই তো আপনার অন্য চেহারা। এত মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা…জীবনে তো কম কিছু পাননি। কত লোকে আপনার পিছনে টাকা ঢালতে রাজি, যদি সুস্থ্য থাকেন…সে তো থাকবেন না…
গলা জ্বলতে জ্বলতে কারণ বারি নামে। বোতল থেকে গরল গড়িয়ে পড়ে গেলাসের গা বেয়ে। সঙ্গে ঝাঁঝালো গলায় বলে ওঠেন – ‘আমাকে দেবে টাকা? কে? ঐ বেঙ্গলি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি? মরে গেছে…’
আবার ঢক করে গিলে নিলেন বাংলা। সেই সঙ্গে বাকি কথাও।
– কেন মাধবি মুখার্জি ডিস্ট্রিবিউটারদের দোরে দোরে ঘুরে বেরাননি আপনার জন্য? বিশ্বজিৎ প্রডিউসার নিয়ে আপনাকে দিয়ে ছবি করতে একেবারে তৈরী, আপনি স্ক্রিপ্ট শোনালেন না। বোম্বেতে শক্তি সামন্তের অনুরোধ ফেরালেন। কেন? না শ্যুটিং-এ মদ খাওয়া যাবেনা…হিন্দিতে মেঘে ঢাকা তারা হলোনা…রাজেশ খান্নার অফারও ফিরিয়ে দিলেন। ছিঁড়ে উড়িয়ে দিলেন চিত্রনাট্য। বলুন মিথ্যে বলছি! জবাব দিন…’
এই কথায় তাঁর উজ্জ্বল হাসি একটু একটু করে ভেঙে মিশে যাচ্ছে রাতের রেলগাড়ির চলার ধাতব শব্দে। কামরার পেট এফোঁড় অফোঁড় করে দিচ্ছে হাওয়া। ঋত্বিকের মৌতাত ট্রেনের দুলুনিতে বেশ জমে উঠেছে। একটা ফিচেল হাসিতে থামিয়ে দিলেন সব অভিযোগ –‘ হারামজাদা সব জেনে ফেলেছে…’
এরপর প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে বিচরন করে কথোপকথন। ঠিকড়ে ওঠে ক্রোধের আগুন কথার মাঝে।

কিন্তু গোল বাঁধলো যখন হঠাৎ কামরায় উঠে এলো বন্দুকধারী দুজন রেল পুলিশ।
– একি! এখানে কি? ফার্স্ট ক্লাস কামরায় উঠেছো কেন? শালা…জানোনা চোর ডাকাত কোথায় থাকে? জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করতে এসেছো? শালা…নামো…নামো এখুনি, না হলে লাথি মেরে নামাবো…। আবার বন্দুক…। ঋত্বিক ঘটকের নাম শুনেছো? শোনোনি? তোদের বাবা কে আছে বল যে আমি ঋত্বিক ঘটক আছি এ গাড়িতে। বুঝলি…!
আচমকা এই প্রতিরোধে স্তম্ভিত হতভম্ব পুলিশ দুজন। পূর্নেন্দু পত্রী লিখছেন –‘ …এরপর হ্যাঁচকা টানে বন্দুক দুটো ছিনিয়ে নিলেন তাদের কাছে থেকে… যে কোন মুহুর্তে রক্তপাত ঘটবে আমরা যেন তার অপেক্ষায় স্তব্ধ। সম্বিত ফিরতেই আমরা অনুনয় করি – চুপ করুন। নেমে যাবে পরের স্টেশনে। পুলিশ গুলো থেকে নিজের অভিব্যক্তি আড়াল করে আমাদের দিকে তাকালেন। চোখে ঠোঁটে দুষ্টুমি হাসি মাখানো…। হাতে গেলাস, টলমল সাদা জল। টলমঅলে তিনিও। হাসিতেও যেন জলের মৃদু ঢেউ…’।

না কোন রক্তপাত ঘটেনি সেদিন। রেল পুলিশের রক্ষী দুজন নূন গোলা জোঁকের মতো চুপটি করে নেমে গিয়েছিলো পরের স্টেশনেই। আর তাদের নামার সময় বন্দুক দুটো, যেন খেলনা ছড়ি এমন ভঙ্গিতে ছুঁড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে আবার ডুবলেন মদ্যপানে। তিনি ঋত্বিক, তাঁর চাহনি তখন বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে। হাওয়ায় হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে চুল। ইথারে যেন খেলে বেড়াচ্ছে তাঁর সেই অসম্ভব দম্ভ আর আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত ঘোষনা – ‘ আমি প্রতি মুহুর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবো যে ইট ইজ নট অ্যান ইমেজিনারি স্টোরি বা আমি আপনাকে শস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহুর্তে আপনাকে হাতুড়ি মেরে বোঝাবো যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা। কিন্তু এর মধ্যে যেটা বঝাতে চাইছি, আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি আপনাকে এলিয়েন্ট করবো প্রতিমুহুর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন। আমার প্রটেস্টটাকে যদি আপনার মধ্যে চাপিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা’। স্ত্রী সরমা ঘটককে তিনি বলতেন, ‘ লক্ষ্মী টাকা হয়তো আমার থাকবেনা কিন্তু কাজটা থাকবে। তুমি দেখে নিও মারা যাবার পর সব্বাই আমাকে বুঝবে…’।

জানিনা সত্যিই আমরা ক’জন অনুধাবন করতে পেরেছি তাঁকে, যেমনটি তিনি চেয়েছিলেন।