একলা বেলার রেডিও

শ্যামলী আচার্য

ঠিক বারোটা দশ। হোমিওপ্যাথ ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ হয়ে যায় এই সময়। পাশেই দুলালকাকুর দোকান। অলঙ্কার জুয়েলার্স। দোকানের কালো গ্রিলের ফাঁকে দেখা যায় একটা বড় ঘড়ি। সেটাতেই সময় দেখে নেয় তাংকু। বারোটা দশ। স্কুল বাসের হেল্পার অমূল্যদা বাস থেকে নামিয়ে দেয়। বড় রাস্তা পার হতে হবে। অমূল্যদা হেঁকে বলে, ‘সাবধানে-এ-এ’। সাদা বাস ছেড়ে দেয়। তাংকু দু’পাশ দেখে রাস্তা পেরোয়।

বড় রাস্তার উল্টোদিকেই রথতলা গভর্নমেন্ট কোয়ার্টার্স। সরকারি কেরানিদের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই। দু’কামরার ফ্ল্যাট। খাবার জায়গা। রান্নাঘর আর বাথরুম। আরও আছে। একটি চমৎকার বারান্দা। তাংকুদের ‘কে’ ব্লকের তিন নম্বর ফ্ল্যাটটি দোতলায়। আর তার বারান্দাটি ঝুঁকে পড়েছে বড় রাস্তার দিকে কোয়ার্টার্স-এর সীমানা ঘেরা পাঁচিলের ওপরে। সারাদিন সেই বারান্দা দিয়ে শুষে নেওয়া যায় চলমান ব্যস্ততা।

দুপুর বারোটা দশ থেকে তাংকুর অবাধ স্বাধীনতা। বাবার অফিস, মায়ের ইশকুল। অতএব, একা এবং একা। পাশের ফ্ল্যাটে মান্তুদের কাছ থেকে ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে দরজা খোলা। ব্যস। আর পায় কে! সাদা কেডস জুতো ছিটকে চলে গেল খাটের তলায়। মোজা দুটো আড়ি করে মুখ ঘুরিয়ে দু’জন দুই দিকে।  স্কুলড্রেসের ভারি দায় পড়েছে হ্যাঙ্গারে উঠে ঝুলতে। সে দিব্যি গুটিসুটি পাকিয়ে শুয়ে পড়ল পড়ার টেবিলের কোণায়।

হুড়মুড় করে জল পড়তে শুরু করল বাথরুমের শাওয়ার থেকে। উতল ধারা। লাল মগে ভরে ভরে সেই জল ছিটিয়ে দেওয়া তিনদিকের দেওয়ালে। সমস্ত বাথরুম জুড়ে দাপাদাপি। কাচের শার্সি বেয়ে, সিমেন্টের দেওয়াল বেয়ে জলের ফোঁটারা লাইন করে নামতে থাকে। তখন জম্পেশ ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক– ‘এ বৃষ্টিতে কে ভিজবে সে এসো না– বৃষ্টি আমি আজ কিছুতেই থামতে দেব না’…

তাংকু নিজেই গায়। টনসিলে ফোলা গলা। বন্ধ নাক। ‘ম’ কিংবা ‘ন’ বলতে গেলে শোনায় ‘ব’। উঁচু স্কেলে চড়ায় গলা পৌঁছয় না। সেখানে গুনগুন, হুঁ হুঁ। কিছুদিন আগেই শোনা গান। আরতি মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর রিনরিনে গলায় এই সেদিন শোনা গেল আন্তর্দেশীয় প্রচারতরঙ্গে।

খাবার টেবিলের পাশে মিটসেফের ওপর ঠাকুর্দার বড় রেডিও। ভালভ সেট। ইলেকট্রিক সুইচ টিপলে তার মধ্যে ধীরে ধীরে একটা মায়াবী হলুদ আলো জ্বলে ওঠে। সাদা চৌকো সুইচে অন-অফ। দুপাশে দুটো গোল মোটকা নব। একটা ঘোরালে শব্দ বাড়ে-কমে। আর অন্যটাতে কাঁটা ঘুরে ঘুরে চলে যায় এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশন। ওই কাঁটা ঘোরানো রেডিও থাকে মায়ের জিম্মায়। সকালে মায়ের হাতের ছোঁয়ায় বেজে ওঠে বাংলা সংবাদ আর রবীন্দ্রসঙ্গীত। তখন ঘড়ির কাটা মিলিয়ে নেওয়া। সাতটা চল্লিশ। যদিও রোজ সকালের এই রুটিন তাংকুর সামনে ঘটে না। ও তো তখন মর্নিং ইশকুলে। বরং শনি-রবি আর অন্যান্য ছুটির দিনে পড়ার টেবিলে দুধের গেলাস পৌঁছলেই তাংকু বুঝতে পারে এইবার সাড়ে সাতটা বাজবে। কিছুক্ষণের মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুরু হতেই অর্ধেক তরকারি কাটা অবস্থায় বঁটি পেতে রেখেই মা ছুটে গেছে গীতবিতানের কাছে। সেই আশ্চর্য বইয়ের পাতার মধ্যে থেকে উঠে আসছে ‘আরও কত দূরে আছে সে আনন্দধাম’ কিংবা ‘দুয়ারে দাও মোরে রাখিয়া নিত্য কল্যাণ কাজে হে’।

পরের প্রজন্মের জন্য একটি ছোট্ট ট্রানজিস্টার। ফিলিপ্স। তার গায়ে একটি নস্যি রঙের জ্যাকেট। জ্যাকেটের বোতাম খুলে জামা ছাড়িয়ে ফেললে দিব্যি ফর্সা ধবধবে চেহারা তার। রোজ একলা দুপুরবেলায় এটাই তাংকুর একমাত্র কথা-বলা সঙ্গী। বিবিধভারতীর ‘মন চাহে গীত’ শুনতে শুনতে সুর্যের কাঁটা এগোয়।  লতা-আশার গানের পাশে জেগে থাকেন রফি-কিশোর। হেমন্তকুমার তাঁর রোম্যান্টিক আবেদন পাঠান। ‘তুম পুকার লো, তুমহারা ইন্তেজার হ্যায়…’। স্কুলের হোম-ওয়ার্কের খাতার পেছনে আনমনে লেখা হতে থাকে ‘তুম যো মিল গয়ে হো, তো ইয়ে লাগতা হ্যায়… কে জাঁহা মিল গয়া’। ছবির নামটা বাড়তি যত্ন নিয়ে মনে করে রাখে তাংকু। ‘হঁসতে জখম’। Hall & Knight- এর Algebra থেকে বেশি জরুরি হয়ে পড়ে ‘তীর বেঁধা পাখি আর গাইবে না গান’। শব্দগুলো লিখে রাখা থাকে ভূগোল বইয়ের পিছনের সাদা পাতায়।

মঙ্গলবারের দুপুর একটা চল্লিশে ‘শ্যামা’ চিত্রাঙ্গদা’ শাপমোচন’-এর গান তো আউড়ে যাওয়াই যায়। শুনে শুনে ঠোঁটস্থ। উত্তীয়র জন্য গলার কাছে চিনচিনে ব্যথা। ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’র ডাকাতের গান– আহা! সবচেয়ে পছন্দের। বাড়তি উত্তেজনা ‘বুদ্ধু-ভুতুম’ আর ‘লালকমল-নীলকমল’এর দিন। সেদিন খাটের নীচে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা মুশকিল। যদি কেউ বসে থাকে খাটের তলায়! রাক্ষস-খোক্কসের সমবেত খোনা গলায় গায়ে কাঁটা দেয়। রাস্তার ধারের জানালাটা পুরো খুলে দেয় তাংকু। পর্দা সরিয়ে চেয়ে দেখে বাইরের রাস্তায়। নাহ। কেউ কোত্থাও নেই। নিশ্চিন্ত। আর যেদিন ‘হিংসুটে দৈত্য’ তার বাগানের পাঁচিল ভেঙ্গে ঢুকতে দেয় সব ছোট্ট বন্ধুদের, সেদিন ওদের সংগে তাংকুও ঢুকে পড়ে সেই বাগানে।

শুক্রবার রাত আটটা। শনিবার বিকেল তিনটে। আর রবিবার দুপুরে বিবিধভারতীর অসংখ্য নাটক। সব চরিত্র কাল্পনিক। অথচ কি ভীষণ জীবন্ত। ‘বোরোলীনের সংসার’ থেকে ‘অমর কাহিনী আরব্যরজনী’। মায়ের বকুনি। বাবার রাগী চোখ। এগুলো সংগে ফ্রি। এড়ানোর জন্য রেডিও ঢুকে পড়ে বাথরুমে। স্নানের ভান করে শুনে নেওয়া– তীব্র নেশার টান যেমন হয়।

শনিবার দুপুরে তাংকুর ছুটি আর মায়ের হাফ-ইশকুল থাকত বলেই তো ঠিক দুপুর একটায় ‘মনের মত গান আর মনে রাখা কথা’র পাশে গিয়ে চুপটি করে বসা যেত। ছোট্ট ফিলিপস রেডিওর মধ্যে থেকে কী আশ্চর্য স্বপ্ন আর নেশা-জড়ানো গলা ভেসে আসত। প্রশ্ন পড়া হয়। আর তার সমস্ত শিরশিরে অনুভূতি জাগানো উত্তর। তক্ষুনি অমন সব উত্তর মাথাতেও আসে বাবা! চিঠি আর গান। ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে, ও সে তো মুখ খোলেনি’। কখনো শ্রাবন্তীর সুরেলা প্রশ্নে ভূপিন্দরের উত্তর– ‘যার নাম তার মুখে ভাল লাগে না’। তাংকু ভাবত, বড় হয়ে একদিন নিশ্চই ও নিজে নিজে চলে যেতে পারবে ওই ঘরটাতে। যেখানে মাইক্রোফোনের সামনে বসে কথার মায়ায় বুঁদ করে রাখেন শ্রাবন্তী মজুমদার।

রেডিওর নব ঘুরিয়ে কখনো ‘মন চাহে গীত’ কখনো ‘ভুলে বিসরে গীত’। কখনো আবার যাত্রার বিজ্ঞাপন। কখনো নাটকের। কোনদিন বীণা দাশগুপ্তার ‘নটী বিনোদিনী’ কোনদিন শান্তিগোপালের ‘চেঙ্গিস খাঁ’। রাতের দিকে শোনা যায় ‘নহবত’ নাটকের বিজ্ঞাপন। সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, রত্না ঘোষালের সব ডায়ালগ ঝরঝরে মুখস্থ। শুনতে শুনতে একদিন বাবা বলে ফেলেন, চলো দেখেই আসি। যাত্রা দেখার সুযোগ নেই দক্ষিণ কলকাতায়। কিন্তু থিয়েটার দেখা হয়। রেডিওর বিজ্ঞাপন শুনে শুনেই আগ্রহ বাড়ে।

সন্ধের পরে ঝুপ করে লোডশেডিং হয়ে গেলেই শুরু হয় ‘ছায়াগীত’। সঙ্গে হারিকেনের আলোয় অঙ্ক কষা চলতে থাকে পুরোদমে। যেন এই সংগত হবারই ছিল। রান্নাঘরে কড়াই থেকে আলুভাজার গন্ধ। রাঁধুনি ফোড়নের সঙ্গে ভাজা শুকনোলংকায় এবার ঝাঁপ দেবে মুসুর ডাল। ঘড়ির কাঁটায় দৌড়ে চলে আকাশবাণী। ‘হাওয়ামহল’এ হিন্দি নাটক না শুনে কলকাতা ‘ক’-এ চলে আসে শ্রোতার মনোযোগ। খবর পড়েন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। তাংকু যাকে ছেলেবেলা থেকে ‘বিদ্যুলাল’ বলে জানে।

রেডিওর বিজ্ঞাপন শুনে শুনে সব মুখস্থ। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে কোথায় আছে সেই গজকুমার ব্রাদার্স। খুঁজে খুঁজে চলে যাওয়া একদিন। সেখান থেকে কেনা কোট আজও কাঠের আলমারির কোনায়। হ্যাঙ্গারে ঝোলানো। ন্যাপথালিনের গন্ধে ভরপুর।

একটু রাত বাড়লে কারেন্ট আসে। রেডিও বন্ধ হয় না। সে তার মত বলে যায়। তাংকুর পড়ার বইয়ে মিসিসিপি নদীতে ডুব দেন আর্কিমিডিস; রোমান সাম্রাজ্যের পতনের জন্য কেশব চন্দ্র নাগকেই একমাত্র দায়ী বলে মনে হতে থাকে। হঠাৎ মনে পড়ে গত সপ্তাহে সুবোধ ঘোষের ছোটগল্প শুনিয়েছিল একটা নাটকে। সেই গল্পটা কোথাও থেকে খুঁজে নিয়ে পড়তে হবে। নাটক শুনে গল্পের শেষটা তো নাগালে এল না কিছুতেই! ‘আপ কে ফরমায়েশ’ গুনগুন করে শুনিয়ে যায়, ‘কঁহি বিতে না ইয়ে রাতে, কঁহি বিতে না ইয়ে দিন’। দু’চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসে। তাংকু আবছা ঘুমে গিয়ে বসে পড়ে একটা মাইক্রোফোনের সামনে। আজ ‘গানে আর আড্ডায়’। ও বলছে, ওর ছেলেবেলার রেডিও-দিনের কথা।

ছবি গুগল