এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে…

ঘুম ভেঙ্গে উঠেই দেখি ফেসবুকে বন্ধুর পাঠানো শুভ বসন্তের বার্তা। জীবন আমাদের নানা গোঁজামিল আর সংকটের বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে কেটে যাচ্ছে। তার ফাঁক গলে বাইরে তাকানোর সময় কোথায় আমাদের? কিন্তু বার্তাটা পেয়ে বাইরে তাকাতে ইচ্ছে হলো। পৃথিবীতে পাতা ঝরার কাল শুরু হয়ে গেছে। ভোরবেলাকার হাওয়া তাই জানান দিলো। উজ্জ্বল রোদে ভরে গেছে পৃথিবী। শীতের খোলস ছেড়ে প্রকৃতি আবার জেগে উঠছে নতুন অবয়বে।জানালার বাইরে সেগুন গাছটা আপন নিয়মে পাতা ঝরাতে শুরু করেছে। দূরে টিনের চালের ওপর গৃহস্থের বিড়াল অলস হাই তুলে তাকিয়ে আছে অনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে। এই শহরে কি সত্যিই বসন্ত এসেছে? পঞ্জিকার হিসাবে মাঘ মাস শেষ হলে পহেলা ফাল্গুন শুরু হয়। কিন্তু প্রকৃতির ওপর খুব গভীর করে লক্ষ্য না করলে এই ঋতু পরিবর্তনের কোনো আভাস কি দেখতে পাওয়া যায়? এই শহরে ক্ষুধা আছে, কষ্ট আছে, সংকট আছে, মিথ্যা কথার পাহাড় আছে, প্রেম-অপ্রেমের দোলা আছে, স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা আছে, ক্লান্তি আছে, অবসাদ আছে।কিন্তু এতো কিছুর জটিলতার মাঝে বসন্তও আছে। বার্তা জানান দিয়ে যায় আজ পহেলা ফাল্গুন, বসন্তকালের প্রথম দিবস।

সময় আসলে কি? সময়কে ধরা যায় না। স্পর্শ করা যায় না। আইনস্টাইন সাহেব অঙ্ক করে দেখিয়ে গেছেন বস্তুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বেধ ছাড়াও সময় নামের একটি মাত্রা সংযোজিত আছে। আইনস্টাইনের এই চতুর্থ মাত্রার ধারণা অনুধাবন করা বেশ একটু কঠিন। আমরা নিউটনের জগতে বাস করি। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর বেধ মেপে জীবন যাপন করি। সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে অনন্তের দিকে ছুটে যেতে পারলে এই নগর জীবনে বসন্ত আসতো কি না তা সব সময় ভাবনার জগতেও এঁকে দেখানো সম্ভব নয়। কিন্তু ওই যে বললাম এতো কিছু ভাবনার জাল ছিন্ন করেও বসন্ত আসে। ফাল্গুনের হাওয়া দোলা দিয়ে যায় আমাদের প্রাণে। পলাশ ফুল প্রষ্ফুটিত হয়, রমণীরা বাসন্তী রঙ শাড়ি পড়ে হেঁটে যায়, গান গায়, কবিতা পাঠ করে, ভালোবাসার মানুষের হাতে তুলে দেয় উপহার। নগরীর ক্লান্ত জীবনের পর্দা তুলে উঁকি দেয় নতুন হাওয়া।পাতা ঝরার সময়ের মধ্যে দিয়ে সূচনা হয় নতুন পাতা আসার কালের।

আজ সারাদিন এই নগরীর এখানে সেখানে উৎসবের আলো ছড়িয়ে পড়বে।বইমেলা চলছে। সেখানে গড়িয়ে পড়বে উৎসবের রঙ। চারুকলায় গান দিয়ে বসন্তের প্রথম দিবসকে আবাহন জানানো হবে। হয়তো তারপরেও এই নগরীতে কান্না থেকে যাবে, স্বপ্ন ভঙ্গ থাকবে, অন্নের অভাব থাকবে, সম্পদের সুষম বন্টন হবে না। কিন্তু সেই ক্লিন্ন জীবনের নাগপাশ থেকে মুক্তি পেতে উজ্জ্বল রৌদ্রের আলোর ভেতরে মানুষ অন্যরকম করে একটা দিন কাটাবে। হয়তো এটুকুই তাদের বড় প্রাপ্তি।

সবাইকে জানাই পহেলা ফাল্গুনের শুভেচ্ছা।

ইরাজ আহমেদ