আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়…

আজ সেই ১৪ ফেব্রুয়ারী। সময় যে তারিখটিকে তার রঙীন মোড়কে ঢুকিয়ে নাম দিয়েছে ভ্যালেন্টাইন ডে, ভালোবাসা দিবস।আজ সারাদিন ভালোবাসার রঙে নিজেদের রাঙিয়ে নেবে প্রেমিক-প্রেমিকারা। লাল আর হলুদ রঙের পোশাকের ছটাকে ধার করে রৌদ্র হয়তো আরো একটু বেশী উজ্জ্বল হবে, গান ফিরবে হাজার কন্ঠে, বিনিময় হবে ভালোবাসার কবিতা।কিন্তু ইতিহাসের সেই বিদ্রোহে উজ্জ্বল আর রক্তে লাঞ্ছিত সময়ের পৃষ্ঠাগুলো কি ফাল্গুনের হাওয়ায় সত্যিই উড়ে গিয়ে হারিয়ে যাবে ভালোবাসা দিবসের কোলাহলে? ১৯৮৩ সালের ফাল্গুনের সেই দিন কোকিল হয়তো ডেকেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষ শাখায়। ফুল ফুটেছিলো, হাওয়া দিয়েছিলো এলোমেলো। কিন্তু সেদিন প্রাণ ঝরেছিলো গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতার মতোন। স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উন্মাতাল ছাত্রদের রক্তে ভেসে গিয়েছিলো রাজপথ।তাদের প্রতিবাদে কেঁপে উঠেছিলো গোটা দেশ। সেই গনগনে চৈত্রদিনের কথা আজ মৃত স্মৃতি হয়ে ম্লান মুখে এসে দাঁড়াবে কারো কারো দরজায়।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী, স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে পালিত হয় স্বৈারাচার প্রতিরোধ দিবস। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ, সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন স্বৈরাচার এরশাদ সরকার। সামরিক আইন জারি করে মৌলিক অধিকারের ভূ-লুণ্ঠন এবং বিরোধী দলীয় কর্মী ধরপাকড়, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এরশাদ আমল। সেই নিষ্পেষিত সময়ে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে এ দেশের ছাত্ররাই। তারা সামরিক শাসন আর গণ বিরোধী শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা করে।  ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী। মধুর ক্যান্টিনে সকল ছাত্র সংগঠনের সম্মিলিত রূপ, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ -এর উত্থান ঘটে। একই ধারার অবৈতনিক বৈষম্যহীন সেক্যুলার শিক্ষানীতির দাবিতে ‘৮৩ এর ১৪ ফেব্রুয়ারী বিশাল মিছিলে শামিল হয় শত শত ছাত্র। মিছিলের অগ্রভাগে ছিল ছাত্রীবৃন্দ। হাইকোর্টের গেইট এবং কার্জন হল সংলগ্ন এলাকায় কাঁটাতারের সামনে এসে ছাত্রীরা বসে পড়ে; নেতৃবৃন্দ কাঁটাতারের উপর দাঁড়িয়ে জানাতে থাকে বিক্ষোভ। অতর্কিত পুলিশী হামলার শিকার হয় ছাত্র জনতা। শিক্ষার্থীদের উপর গরম পানি ছিটিয়ে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। নিহত হয় জয়নাল, দিপালীসহ অনেকে। শিশু একাডেমীর অনুষ্ঠানে যোগদান দিতে গিয়ে নিহত হয় শিশু দিপালী, তাঁর লাশ গুম করে ফেলে পুলিশ। সেদিন স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ শিশু একাডেমীর ভেতরে ঢুকের নিপীড়ন চালায়। জয়নালের লাশ পড়ে থাকে কার্জন হলের ভেতরে। বিদ্রোহের সেই আগ্নি পথ যাদের ডেকেছিল তাদের অনেকেই নিখোঁজ হন। তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও আক্রান্ত হয়েছিলো। গোটা এলাকা ঘেরাও করে আইনশৃংখলারক্ষাকারী বাহিনী আক্রমণ চালিয়েছিলো প্রতিবাদী ছাত্রদের ওপর। রেহাই পাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। গ্রেফতার করা হয়েছিলো হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে।

একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভূখণ্ডের জন্য এ জনপদের মানুষ বারবার অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। যুগে যুগে সামরিক-বেসামরিক ছদ্মবেশে স্বৈরাচারীরা ক্ষমতা দখল করেছে। জনগণ প্রতিবাদ করলে জুটেছে বেয়নেট, বুট, গুলি, টিয়ারশেল। স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্রদের প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রথম শহীদের নাম জয়নাল, দিপালী, কাঞ্চন। ভালোবাসা দিবসের জোয়ারে রক্তের অক্ষরে লেখা সেইসব নাম আজ প্রায় বিস্মৃত।

তবু মনের মধ্যে ফিরে আসে সেই বিদ্রোহে উজ্জ্বল দিনের স্মৃতি, ফেরে ভয়াল মৃত্যুর ছবি, ফেরে অকুতোভয় মানুষদের লড়াইয়ের গল্প। আজ সারাদিন সেই বিদ্রোহী সময়ের ছবি থাকবে কারো কারো বুকের ভেতর।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল