ভালোবাসার দিনে…

মৃত্তিকা মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জী

এক.
২০১১ সালের ১৫ই জুলাই আমি মা হই….যদিও কনসিভ করার পর যেদিন প্রথম বুঝতে পারি আমি আর এক নেই,এক শরীরে দুই মানুষ হয়েছি,সেদিন থেকেই মনে মনে মাদারহুডের লম্বা যাত্রাপথে হাঁটি হাঁটি পা পা শুরু হয়….

সেই বৃষ্টির দিনে অপারেশন থিয়েটারে শুয়ে শুয়ে, আচ্ছন্ন অবস্থায়,মাথায় অ্যানেস্থেটিস্ট ভদ্রলোকের হাতের স্নেহস্পর্শ পেতে পেতে একটা ছোট্ট ছানাকে দেখি,বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে জানতে পারি এই ছোট্ট মানুষশিশুর মা আমি….তারপর আমার আত্মজ NICU তে চলে যায় আর আমি কেবিনে….এরপর দুদিন,আটচল্লিশ ঘন্টা আমি তাকে দেখিনি…মাঝে মাঝে নার্সদিদি এসে ব্রেস্টমিল্ক পাম্প করে নিয়ে গিয়েছে….

এর মাঝেই,পাশের কেবিন থেকে আরেক ছানা এসেছে আমার কাছে….তার মা অসুস্থ,ব্রেস্টফিড করাতে পারছেনা….আর সেই ছোট্ট শিশু পাখির ছানার মতন হাঁ করছে, তীক্ষ্ণ,সুতীব্র কান্নায় জানান দিচ্ছে সে ক্ষুধার্ত….সেই রাজকন্যাকেই আমি প্রথম ব্রেস্টফিড করাই …. মাতৃত্বের অ্যাবস্ট্রাক্ট থেকে কংক্রিট হয়ে ওঠার যে মধুর অনুভূতি,তা টের পাই অনাত্মীয় সেই শিশুকে বুকের ওম দিয়ে….টানা দুদিন,প্রতি তিন ঘন্টা অন্তর,তার মা সুস্থ না হওয়া অবধি তাকে আমি স্তন্যপান করাই….

আজকাল মাঝে মাঝে আমার সেই মেয়ের কথা মনে হয়,আমার ছেলের বয়সী সে….সেই মেয়ে তার এই স্তন্যদায়িনী মাকে না জেনেই বড় হচ্ছে…বড় বড় কাজল কালো চোখ, মাথাভর্তি কালো চুলের সেই মেয়ে ভালো থাক,সুস্থ থাক….ভালোবাসার দিনের প্রাক্কালে, নতুন করে ভালোবাসতে শেখানো সেই পুতুল পুতুল স্তনন্ধয়ীকে অফুরান ভালোবাসা….

দুই.
এবার বছর সাতাশ আগের ঘটনা….মফস্বলের বেসরকারী প্রাইমারী স্কুলে পড়াশোনা করেছি….সেখানে এক বন্ধু হয়েছিল,নাম – অনিন্দিতা দাশ….অভিন্ন হৃদয় বন্ধু,পাশাপাশি বসার,টিফিন ভাগ করে খাওয়ার বন্ধু, ক্লাস চলাকালীন ফিসফিসিয়ে গল্প করার বন্ধু, একদিনের অদর্শনে পৃথিবী থমকে যাওয়ার মতন বন্ধু……কালের স্রোতে বিচ্ছেদ ঘটেছে তার সাথে,ক্লাস ফোরের পরেই….আমরা সেই সময়ে পাকাপোক্ত ছিলাম না….তাই বন্ধুর ঠিকানা জানতাম আমার মনে…. বন্ধুর সত্যিকারের ইঁট বালি সিমেন্টের বাড়ির ঠিকানা কখনও জানা হয়নি…..

সেই মেয়ে,ক্লাস ফোরের রেজাল্ট আনতে যাওয়ার শেষ দিনে আমাকে তার প্রিয় ফাউন্টেন পেনটি,যা দিয়ে সে পাতার পর পাতা লিখত ছোট্টবেলা থেকে, উপহার দিয়ে গিয়েছিল….সেই বন্ধুকে আর খুঁজে পাইনি….এই ফেসবুকের যুগেও না….কারণ, আমার স্মৃতিতে অনিন্দিতা বলতে বব কাট চুলের,ফর্সা ,গালে টোল পড়া আবছা একটা মুখাবয়ব….আর কিচ্ছুটি না….ভালোবাসার দিনের প্রাক্কালে মন জুড়ে ছেলেবেলার সেই হারানো বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার অভিলাষ….সে ভালো থাক…

***
ভালোবাসার স্বচ্ছসলিলা টলটলে নদী ধুয়ে মুছে দিক যত অবিশ্বাস,ঘৃণা,ক্ষত,অপ্রাপ্তি…..শুকিয়ে আসা বিশ্বাস আর মানবিকতার মরা খাতে প্রেমের জোয়ার আসুক…সবকিছুর শেষে অখন্ড প্রদীপের শিখার মতন জ্বলজ্বল করুক নিখাদ একাগ্র ভালোবাসা,স্বমহিমায়….চোখজুড়ানো তার দ্যুতিতে আলোয় আলোময় হোক চারপাশ…

মানুষ ভালোবাসতে শিখুক…এই সীমাহীন শোষণ, শাসনের নৈরাজ্যে ভালোবাসা এখনও সশরীরে উপস্থিত–একথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য বছরের একটিমাত্র বরাদ্দ দিনে মেতে উঠুক আসমুদ্র হিমাচল….একফোঁটা ভালোবাসা মৃতসঞ্জীবনীসুধার মতন চারিয়ে যাক হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীর কোষে কোষে,জন্মদিক ছোট ছোট ভালোবাসাময় পৃথিবীর,চারদেওয়ালের মাঝে আমার ছোট্ট এককুচি পৃথিবীর….ভালো থাক,ভালোবাসায় থাক বৃদ্ধ পিতামাতা সন্তানের কাছে, কন্যাভ্রূণ মাতৃগর্ভে এবং কন্যাসন্তান পরিবারে আর সবশেষে শিশুরা পৃথিবীতে…..ভালোবাসার জয় হোক…

❤ ❤

ছবি:গুগল