খেলা ভাঙার খেলা…

রাজা ভট্টাচার্য্য,শিক্ষক, লেখক

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

তারপর একসময় বইমেলা ফুরিয়ে যায় ; যেমন ঝট করে ফুরিয়ে যেত গুঁড়োদুধ, ঝালমটর,বাদামতক্তি আর খেলতে-যাওয়ার বিকেল। আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ে সুসময়– গলে-যাওয়া আইসকিরিমের মতো। হঠাৎ পাত্তা পেয়ে ইকটুখানি দুলে-ওঠা মাস্টার ফের ফিরে যায় ইশকুলে। মন দেয় পড়া আর পড়ানোয়… আর…
আর তার মন খারাপ করে।

তার মন খারাপ করে, কেননা কাল আর তাকে দেখে একগাল হেসে কোনো স্টল থেকে বেরিয়ে আসবে না কেউ–“রাজাদা, কখন এলেন? চলেন, আগে এককাপ চা খেয়ে আসি!” আর কাল থেকে কোনো গালফুলো লম্বাচওড়া ছেলে ঝাঁঝিয়ে উঠবে না–“আপনার বই নিয়ে ছুটতে ছুটতেই রোগা হয়ে গেলাম স্যার। ইমিডিয়েটলি– অন্তত আমার তনুদেহটির খাতিরে– লেখালিখি ছেড়ে দিন!” কাল থেকে আর পাঁচ নম্বর গেটের সামনে জমে উঠবে না তুমুল আড্ডা; আর তার মধ্যে সাহস করে মাথা গলিয়ে কেউ বলবে না–“স্যার, ইয়ে…একটা সই…!” আর কাল থেকে এভাবে কেউ আমাকে থতমত খাইয়ে দেবে না। কেবলই ফোন করে চলবে না প্রকৃত বৈষ্ণব ছেলেটি–“দাদা, কোথায়?” আর হাত নেড়ে আমাকে ডেকে কেউ বলবে না–“মা লুচি-মাংস পাঠিয়ে দিয়েছে, খেয়ে নিন।” আর অমনি সব্বাই বলে উঠবে না–“খাইয়ে দাও দেখি– হাত লাগাবো না!” আর সেই ছোট্ট ভোজসভায় ঢুকে পড়বেন না বাংলা সাহিত্য কাঁপিয়ে-তোলা কোনো বিখ্যাত অথচ নিরভিমান সাহিত্যিক। কক্ষনো না-দেখা কোনো পাঠিকা কাল আর হাতে তুলে দেবে না কোনো অপ্রত্যাশিত উপহার। জোর করে পকেটে কলম গুঁজে দেবে না কেউ। কাল আর আমাকে ছেলে টেনে নিয়ে যাবে না কোনো ভীড়ে-ঠাসা স্টলে; শুধোবে না–“এই বইটার কথাই তুমি বলছিলে, বাবা?” আর ‘মানুষের মতো মানুষ’ বইটা দেখে বাবার কথা মনে পড়ে আমার চোখে জল এসে যাবে না। কাল আর পিছন ফিরলেই দেখতে পাব না.. অনেক বই কিনে-ফেলা ছেলে আর সহেলিকে নিয়ে হেঁটে আসছেন গিন্নি– তিনজনের চোখ তিনটে স্টলের দিকে…আর তাই…
তাই আমার মন খারাপ হয় খুব।

তারই মধ্যে থেকে যায় বইকি কিছু মন ভাল করার মতো খবর! ‘তুই’ আর ‘ইশতেহার’ … দুটোই আমার বড্ড প্রিয় বই। কবিতা লিখতে যতটা ভালবাসি – এমন আর কিছুই নয়। সেই দু’টো বইয়ের প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গেল এই মেলায়। খুব ভয়ে ভয়ে, অল্প কিছু কপি ছেপেছিলেন যথাক্রমে ‘দ্য কাফে টেবিল’ এবং ‘ঋতবাক’-এর কর্ণধারেরা। তা হোক…এই আকালেও কবিতার বই ‘কিনে নিলেন’ এত মানুষ! আভূমি স্যালুট!! আর হ্যাঁ, ‘প্রিন্স দ্বারকানাথ’ আমার প্রথম এমন বই, যার একটি লাইনও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়নি। অথচ, সবচেয়ে জোরালো প্রতিক্রিয়া পেলাম এই বইটিরই। আমার বিনীত নমস্কার জানবেন সকলে। আপনারা আমায় নতুন করে গড়লেন।

সব্বাই ভাল থাকুন। পড়ুন, লিখুন। ধন্যবাদ দেওয়ার অর্থ বন্ধুত্ব অস্বীকার করা… কাজেই পাঠক, প্রকাশক বা সহযোদ্ধা লেখকদের ধন্যবাদ দেব না। দেব শুধু তাঁদের… কেবল আমাকে গালি দেওয়ার জন্যই যাঁরা ফেক অ্যাকাউন্ট খোলার পরিশ্রম স্বীকার করেছেন; গ্রুপে গ্রুপে নিন্দে করে বেরিয়েছেন। আপনাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আপনারাই আমাকে রাত জেগে পরিশ্রম করা শিখিয়েছেন। অসংখ্য ধন্যবাদ তাঁদের… যাঁরা দু’লাইন পড়েই বুঝে গেছেন… এ লোকের লেখা অপাঠ্য। প্রতিক্রিয়াহীন এই পৃথিবীতে এই নিন্দার মূল্য যে কতখানি… আপনারা জানেন না।

বাকিদের বলি… দেখা হবে আবার। হবেই। অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। শুধু চাইব … সেদিনও এমনই নির্দ্বিধায় এগিয়ে এসে বলুন…”রাজা– চিনতে পারছ?” নিশ্চিত থাকুন… আপনাকে আমি চিনে নেব ঠিক। কেননা, আমরা সবাই অক্ষরের দুনিয়ার পর্যটক।

চলুন, বেরিয়ে পড়ি। চলুন, বেরিয়ে আসি নিজের নিজের মন-খারাপের গর্ত থেকে।

চলুন, বেড়িয়ে আসি।

ছবি:গুগল