হাওয়াই মিঠাই রঙের সময়

শেখ রানা (নিউবুরি পার্ক, লন্ডন)

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

অপার্থিব গোলাপী রঙ। একটা কাঁচের বাক্সে থরে থরে সাজানো। দেখলেই বোঝা যায় যত্ন করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সেই কাঁচের বাক্স কাঁধে নিয়ে ফেরিওয়ালা ফেরি করছে। আমাদের চোখ চকচক করা অতি মহার্ঘ এক জিনিষ। তার নাম- হাওয়াই মিঠাই।

ছুটির দিনে পড়ন্ত সকালে দেখা মিলতো। চার আনা করে। এক টাকায় চারটা। আমার চারটায় ঠিক পোষাতো না। আম্মার কাছে ফিরে এসে ঘ্যান ঘ্যান করতাম। অনেকগুলো কিনে দলা পাকাতাম। তারপর একটু একটু করে খেতাম। অবশ্যই সবার চোখ এড়িয়ে। ব্যাপারটা সহজ ছিল না।

নব্বই এর সময়টা আমার কাছে প্রায় হাওয়াই মিঠাই এর মতই। অপার্থিব, গোলাপী রঙ। যে রঙ আমি দেখিনি কোথাও… সে রঙ চোখে, আকাশ দেখে যাও।

আর ছিল কটকটি। ছুটোছুটি পড়ে যেত। ঘরের ভাঙ্গাচোরা জিনিষপত্র দিয়ে কটকটি খাওয়া। সে এক দৃশ্য বটে! একবার ছোট বাবু ওদের মোটামুটি দাঁড়িয়ে থাকা চেয়ার এর হাতল খুলে এনেছিল। খালাম্মার রক্তচক্ষুতে প্রায় ভস্ম হয়ে যায় যায় অবস্থা পরের দৃশ্যেই।

নব্বই এর সময়টায় এইসব টুকরো দৃশ্য চোখে ভাসে। ছোট আপার কাছ থেকে নিয়ে পড়া তিন গোয়েন্দা। প্রথম বই কোনটা ছিল? কঙ্কাল দ্বীপ? কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ড মনোজগতে আলোড়ন তুলে দিল। গোগ্রাসে গিলতাম। অপেক্ষায় থাকতাম কবে রকিব হাসান এর কলমে নতুন অভিযান পাবো ত্রি রত্নের।

কমিকস এর কথা না বললে নব্বই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে ষোলো আনা। কমিকস এর জগত উন্মোচন হয়েছিল স্কুলের বন্ধুদের কাছ থেকে। কার কাছ থেকে রঙ ঝলমল ইন্দ্রজাল কমিকস হাতে পেয়েছিলাম এখন আর মনে নেই। সম্মোহনী যাদুকর ম্যানড্রেক, পেশীবহুল লোথার, জঙ্গলের রাজা বেতাল এ তাল হারাতাম অহরহ। পাঠ্যবই এর ফাঁকে পড়তে যেয়ে আম্মার কাছে মার খাওয়ার মর্মান্তিক ইতিহাস অনেকবার। আমার সবচেয়ে বেশী ভালো লাগতো নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোদা আর বাটুল দ্যা গ্রেট। ওহ! বাটুল এর দুই স্যাঙ্গাৎ এর চেহারা আজো চোখে ভাসে!

নব্বই সময়টা আমি বাংলাদেশ তো বটেই বহির্বিশ্বের মোটামুটি যাবতীয় খেলাধূলোর খবর রাখতাম। পোল ভোল্টের সের্গেই বুবকা, ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডের কার্ল লুইস, আর একটু আগে জিমন্যাস্ট নাদিয়া কোমেনিচি বা ৮৬ এর সিউল অলিম্পিকে নিথর মুখের বেন জনসন। সেই প্রথম ড্রাগ কেলেঙ্কারীর কথা শোনা! ক্রীড়াজগত তো পড়তামই, কোলকাতা থেকে আসা আজকাল প্রকাশনের খেলা ও পড়তাম খুব আগ্রহ নিয়ে। আর পড়তাম আনন্দমেলা। একটু বড় হয়ে দেশ এর কবিতা পড়া শুরু করেছিলাম। সেই সময় যে আগ্রহ নিয়ে দেশ এর কবিতা পড়েছি, সেই আগ্রহটা কী এখনও আছে আমার? মনে হয় না। সেই নির্ভার সময় এর সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই অচিনপুরে হারিয়ে গেছে। সে জন্য একটা দীর্ঘশ্বাস আর দাড়ি।

একবার আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। বড় মাঠে গিয়ে দেখি একজন আর্টিস্ট মন দিয়ে ছবি আকছেন আমাদের কলোনির ছবি আঁকছেন। আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে একটু একটু করে তাকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। স্মিত হেসে ছবিতেই মনোযোগ ধরে রাখে সে। পরদিন-তার পরদিনও দেখা। আমাদের অবাক করে দিয়ে সেই পেন্সিল স্কেচ শেষ হয়। যাবার দিন আমাদের সবাইকে চকলেট উপহার দিয়ে যায়। সেই উপহার পেয়ে আমরা সবাই খুব খুশী হয়েছিলাম।

সে সময়টা একটুতেই খুশী হবার সময়।

সে সময়টা হাওয়াই মিঠাই রঙের সময়।

ছবি:গুগল