আমরা সব দ্রুত ভুলে যাই…

এম আর এফ সোহান

উপরের ছবিতে যে লাশটি পরে আছে সেটি জয়নালের লাশ। আমার ধারনা দেশের ৯০ ভাগ মানুষ এই জয়নালকে চিনেনা। লাশ হওয়ার পেছনের কারনও জানেনা। লাশ হওয়ার দিনটা কবে তা নিয়েও ধারনা নেই। জয়নলকে চিনিয়ে দিচ্ছি। তার আগে কিছু অন্য বিষয় আলোচনা করা যাক। বাঙ্গালীর নিজস্ব সংস্কৃতি ঠিক কি কি তা খুজে বের করা কঠিন। বেশীরভাগইই অপরের সংস্কৃতি। এর প্রধান কারন হলো আমরা সব সময়ই আমাদের সংস্কৃতির থেকে বাইরের সংস্কৃতিকে বেশী প্রাধান্য দিয়ে এসেছি। বাংলা নববর্ষ এমন জাঁকজমকভাবে পালিত হয় এমন দিন খুব বেশী আগের নয়। আগেও পালিত হতো, তবে তার প্রাধন্য ছিল ইংরেজী নববর্ষের অনেক নিচে। এখনও খুব একটা উপরে উঠে যায়নি। অনেকে আছেন যারা বাংলা নববর্ষের বিরোধিতা করে কিন্তু ইংরেজি নববর্ষ নিয়ে খুব লাফান। ইংরেজি নববর্ষ আর বাংলা নববর্ষ দিয়ে একটা উদাহরণ দিলাম মাত্র এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে অপরের সংস্কৃতি চর্চার। ঠিক এভাবেই অপরের সংস্কৃতিকে নিজেদের সংস্কৃতি করে আমরা পরিণত হয়েছি একটা মিশ্র সংস্কৃতির জাতে। এবার আসল কথায় আসি। জয়নাল কে? কেনো তাকে লাশ হতে হয়েছিল? এর পেছনে কাহিনীই বা কি? কবেইবা এই ঘটনা ঘটেছিল। কে ঘটিয়েছিল? জয়নাল একজন শহীদের নাম। সময়টা ১৯৮২ সাল। এরশাদ সরকারের আমলে মজিদ খান নামে একজন অযোগ্য মন্ত্রী বসেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। যে এসেই বিভিন্ন বিতর্কিত শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। সব চেয়ে বিতর্কিত ছিল উচ্চশিক্ষানীতি। যেখানে “মেধার নির্দিষ্ট মাপকাঠি ও উচ্চশিক্ষার ব্যয় ভাড় বহনের ক্ষমতা থাকলেই শুধু মাত্র উচ্চশিক্ষা নিতে পারবে”। তখনকার ছাত্ররা তার এ নীতি প্রত্যাখ্যান করেছে। আন্দোলনে নেমেছে তার বিরুদ্ধে। যে আন্দোলন পরবর্তিতে গন আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ডাক দেয় ছাত্র জমায়েতের। সেদিন মিছিল নিয়ে হাইকোর্ট এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। একসময় ব্যারিকেড ভাঙে শিক্ষার্থীরা, কাঁটাতারের ওপরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করেন ছাত্রনেতারা। আকস্মিকভাবে রায়ট কার ঢুকিয়ে রঙিন গরম পানি ছিটানো শুরু করে পুলিশ। যাতে করে ছত্রভঙ্গ করা যায় এবং রঙ দেখে পরবর্তিতে তাদের গ্রেফতার করা যায়। এরপর লাঠিচার্জ এবং নির্বিচারে গুলি। মিছিলে প্রথম গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল। আহত জয়নালকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুন করে পুলিশ। এরপর একে একে জাফর, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ ১০ জন শহীদ হন। যা “স্বৈরাচারী প্রতিরোধ দিবস” হিসেবে নাম করন হয়েছে। যদিও সে সময়কার অনেকের দাবী, সে সময়ে অন্তত আরও পঞ্চাশ জনকে খুন করা হয়েছিল। যাদের লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে। আসুন এবার আসল কথায় আসি। আমি কেনো এই আন্দোলন আর সংস্কৃতিকে গুলিয়ে কথা বলছি। আমি আসলে সংস্কৃতিকে পৃথক করতে চাচ্ছি। দ্যাখেন একটু আগে একটা উদাহরণ দিয়েছি, কিভাবে আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে নিচে ঠেলে দিয়ে অপরের সংস্কৃতি নিয়ে দাপাই। কিভাবে আমরা আমাদের ইতিহাসকে হারিয়ে ফেলি। এর আরেকটা বিরাট উদাহরণ হলো এই ১৪ ফেব্রুয়ারি। একই দিনে দুইটা দিবস। একটা বিশ্ব ভালবাসা দিবস। যার ইতিহাসের দেশ ইতালী। আরেকটা “স্বৈরাচারী প্রতিরোধ দিবস” যেটার ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল আমাদের দেশ। অথচ আমাদের দেশের বেশীর ভাগ লোকই এই দিনটি সম্পর্কে জানেনা। অথচ এই দিনটিই ছিল ১৯৫২ সালের পর সবচেয়ে বড় এবং ট্র‍্যাজেডিক ছাত্র আন্দোলন। ২১ ফেব্রুয়ারির সমান গুরুত্ব না পেলেও ১৪ ফেব্রুয়ারির এই দিনটি ২১ ফেব্রুয়ারি এর কাছাকাছি গুরুত্ব পাওয়া উচিৎ ছিল। আমরা একই দিনে পালিত হওয়া বিশ্ব ভালবাসা দিবসকে এর থেকে বেশী প্রাধান্য দিয়ে আসছি। হারিয়ে ফেলছি নিজেদের ঐতিহ্য। ইতিহাস। আমি ভালবাসা দিবসের বিরোধী নই। আপনার ইচ্ছে হলে আপনি ভালবাসা দিবসে কাছের মানুষদের নিয়ে একটু উদযাপন করতেই পারেন। কিন্তু সে উৎযাপনের মধ্যে আমাদের ইতিহাসের এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ দিনকে হারিয়ে ফেলা কি সে সময়ের শহীদদের সঙ্গে বেঈমানি করা নয়?

ছবি:গুগল