দেয়াল পত্রিকার সময়ে…

ইরাজ আহমেদ

এই শহরের যে পাড়ায় বেড়ে উঠেছি সে জায়গাটাকে আমার সব পেয়েছির দেশ বলে মনে হয়।জীবন কত যে উৎসব হয়ে থমকে ছিলো ওই পাড়ায়, ওই সময়ে। নগর ক্রমশ নিজের বিস্তারের মধ্যে দিয়েই হয়তো পুরনোকে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করে। নতুন মানুষের ভীড়ে একটা শহরের সংস্কৃতি, স্বভাব, আচরণ হারিয়ে যায়। আসলে নগর তো আর কিছু হারাতে পারে না, হারায় মানুষ। লিখতে বসে হঠাৎ দেয়াল পত্রিকার স্মৃতি সামনে এসে দাঁড়াতেই এতোগুলো কথা মনে হলো। একটা বড় শক্ত কাগজে গল্প, কবিতা আর ছড়া লিখে, রঙ দিয়ে নানা নকশা করে গলির মোড়ের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়া দেয়াল পত্রিকা।

আমাদের সিদ্বেশ্বরীতে অনেক বাড়ির সঙ্গেই তখন লম্বা লম্বা সীমানা দেয়াল ছিলো। আর ওই দেয়ালের গায়ের সেই শৈশবে আমরা ঝুলিয়ে দিতাম দেয়াল পত্রিকা। বিশেষ কোনো দিবসেই প্রকাশিত হতো দেয়াল পত্রিকা। এখন এই শহরে দেয়ালও হারিয়ে গেছে, হারিয়েছে বোধ করি দেয়াল পত্রিকা করার ইচ্ছাটাও। যতদূর মনে পড়ে, কোনো এক একুশে ফ্রেব্রুয়ারীর আগে হঠাৎ করেই বন্ধু প্রিন্সের মাথায় দেয়াল পত্রিকা করার ইচ্ছেটা জেগেছিলো। মাথায় ইচ্ছে জাগতেই পরামর্শ করে আমরা কর্ম সাধনে নেমে পড়লাম। কিন্তু দেয়াল পত্রিকা করতে তো অর্থের আনুকূল্য থাকতে হবে। শুরু হলো বাড়ি থেকে চাঁদা আদায়। তারপর সেই চাঁদা টাকায় কেনা হলো কাট্রিজ পেপার, ক্রেয়ন। বন্ধু প্রিন্সের হাতের লেখা ছিলো তাকিয়ে থাকার মতো। ঠিক হলো পুরো পত্রিকা লিখবে প্রিন্স। লিখবে তো একজন কিন্তু বাকীদের সেখানে কাজ কী? ঠিক হলো, তাদের লিখতে হবে। আর সেসব লেখাই প্রিন্স আবার হাতে লিখবে দেয়াল পত্রিকায়। আমার প্রথম লেখার উদ্যোগ সেই দেয়াল পত্রিকা। গল্প লিখেছিলাম না কবিতা আজ আর মনেও করতে পারবো না। তবে সারা রাত ধরে প্রিন্স আমাদের সব বন্ধুদের লেখা বাছাই করে পত্রিকায় তুলেছিলো। আঁকার হাত ভালো থাকায় দেয়াল পত্রিকার মূল থিমের ওপর অসাধারণ সুন্দর এক ছবি এঁকেছিলো প্রিন্স।

মনে আছে গোটা রাতের সেই অমানুষিক পরিশ্রম শেষে ভোরবেলা যখন পত্রিকাটা তৈরী হয়ে গেলো অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ।আমরা সবাই মিলে এরকম একটা কাজ করে ফেলেছি!তারপর অনেক ভোরে প্রভাতফেরী শুরু হবার আগে পাড়ার এক বাড়ির দেয়ালে পেরেক গেঁথে বোর্ডের উপর ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম পত্রিকাটি। পাড়ায় বেশ হৈচৈ পড়ে গিয়েছিলো মনে আছে। আমরাও সেদিন আর ঘুমাইনি।

তখন হাতে লেখা এই পত্রিকার চলন ছিলো স্কুলেও। বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারীতে বিভিন্ন ক্লাস থেকে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করা হতো। শিক্ষকদের বিচারে সবচাইতে সুন্দর উদ্যোগটিকে আবার পুরস্কৃত করা হতো।

দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করার জন্য আমরা বন্ধুরা পাড়ার বিভিন্ন বাড়ি থেকে বছরে একটা চাঁদা তুলতাম। খুব সামান্যই ছিলো টাকার পরিমাণ। সে টাকায় কেনা হতো পত্রিকার কাগজ আর রঙ। কেনা হতো কলম আর কালিও। এখন থেকে চল্লিশ বছর আগে এই শহরের বিভিন্ন পাড়ায় এরকম দেয়াল পত্রিকা বের করার প্রচলন ছিলো।কোনো কোনো পাড়ায় বিভিন্ন ক্লাবের মধ্যে এই পত্রিকা নিয়ে প্রতিযোগিতাও হতো।কত সময় ধরে আমরা ওসই পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ বহাল রেখেছিলাম এখন আর মনে নেই। তবে সেই পত্রিকা প্রকাশের উত্তেজনা আর আনন্দময় সময়টাকে মনে পড়ে। জানি, সেরকম সময় শুধু ফেরারীই হয়ে যাচ্ছে এই শহরে।

ছবিঃ গুগল