নিউইয়র্ক বিজয়ের আরেকটি গল্প

স্মৃতি সাহা, নিউইয়র্ক

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। শীতের ধূসরতায় রঙতুলির আঁচড় বুলিয়ে প্রকৃতি এখনো হেসে ওঠেনি আমার শহরে। মনজুড়ে এখনো ধূসর স্থবিরতা খুব করে বিদ্যমান। চারপাশের বৃক্ষরাজি এখনো আভরণহীন। সব হারিয়ে ফেলা গাছগুলো দিনভর মন খারাপের গল্প বলে যায়। পাতাহীন গাছ, বিবর্ণ ঘাস আর নিঃসঙ্গ প্রকৃতি খুব একঘেয়ে। আর এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেন অবিরত বেহাগ গেয়ে যায় আকাশ। তবে এই দীর্ণ প্রকৃতি সবুজে ভরে যাবে, বিবর্ণতা ঠিক ঠিক রঙ চুরি করে হরেক রঙের কাব্য লিখবে, শীর্ণ প্রকৃতিতে প্রাণের বাড়বাড়ন্ত আসবে নিয়ম মেনেই, তা প্রায় আরোও দেড়মাস পর। তাই আমার শহরে বসন্ত এখনো দূরাগত।

এখন দিন যতই ধুসর হোক, তবুও তা কিন্তু কর্মহীন নয়। কর্মব্যস্ত আর সদা সচলতা হচ্ছে নিউইয়র্কের বৈশিষ্ট্য। খুব বড় কোন দুর্যোগ না হলে এই সচলতা থমকে যায় না, অচল হয় না। ফেব্রুয়ারি মাসটা আমাদের বাঙালীদের কাছে সব সময় অন্যরকম। ভাষার মাস, ভালবাসার মাস এই ফেব্রুয়ারি। ভাষা নিয়ে আমাদের আবেগ সব সময় অন্যরকম। অনেক প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাভাষা আমাদের। তাই প্রতিটি বাঙালীর কাছে এই মাসটা অন্যভাবে ধরা দেয়। আর এ থেকে নিউইয়র্ক প্রবাসী বাঙলীদের অনুভূতিও কিন্তু ব্যতিক্রম নয়।

এ মাস আর সেই বিশেষ দিন ২১শে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে এখানকার প্রবাসীরাও আবেগে আপ্লুত হয়, ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে যথাযোগ্য ভাবে। নিউইয়র্কে অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরী করে প্রবাসী বাঙালীরা অমর একুশে’ উৎযাপন করে থাকে। আর সেই উৎযাপনে যেমন থাকে শ্রদ্ধা আর নিজের ভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা তেমনি থাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ভাষার সেই গৌরবান্বিত ইতহাসকে তুলে ধরা। আর এ কারণেই ফেব্রুয়ারির হিম হয়ে যাওয়া ঠান্ডার রাতেও শিশু, বৃদ্ধ সবাই মিলেই ছুটে যায় সেই অস্থায়ী শহীদ মিনারে। নিউইয়র্কে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে অন্যমাত্রায় উপস্থাপনের নজির আছেই। গত বছর মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জাতিসংঘের সহায়তায় জাতিসংঘের সদর দফতরের সামনে অস্থায়ীভাবে স্থাপিত হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ভাস্কর্য। শিল্পী মৃণাল হোক তৈরী করেন এই ভাস্কর্যটি। বেশ কিছুদিন আগে প্রথমবারের মতো ভাষার মাসে, নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে অমর একুশের ভাষা শহীদদের প্রতি আনুষ্ঠানিক ভাবে শ্রদ্ধা জানায় সাউন্ডভিউ মিলনায়তনের অস্থায়ী শহীদ মিনারে। এই ব্যাপারগুলো নিউইয়র্ক প্রবাসী সকল বাঙলীর জন্য গর্বের আর সম্মানের।

এবার সেই গর্বের জায়গাটা আরোও পোক্ত হতে চলেছে। নিউইয়র্ক জ্যামাইকার হাইল্যান্ড এভিনিউতে ১৬৫ আর ১৬৭ স্ট্রীটের মধ্যবর্তী রয়েছে একটি সুবিশাল পার্ক। আর সেই পার্কটিতে তৈরী হতে চলেছে ভাষা শহীদদের প্রতি সন্মান জানিয়ে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার। নিউইয়র্কে বাঙালী অধ্যুষিত জ্যামাইকাতে এই স্থায়ী শহীদ মিনার তৈরীর ঘোষণা প্রবাসী বাঙালীর নিউইয়র্ক বিজয়ের আরেকটি গল্প বলে যায়। মহান একুশের ইতিহাস বাঙালী মননে কড়াঘাত করে সবসময়, সব জায়গাতেই। আর এ জন্যই মায়ের ভাষাকে যথাযথ সম্মান, তার নিয়মিত চর্চাকে নিউইয়র্ক প্রবাসী প্রায় সকল বাঙালী ব্রত হিসেবে নিয়ে থাকে। প্রবাসে থেকেও নিজের ভাষা আর সংস্কৃতির প্রতি অদম্য এই টান খুব সহজেই বাঙালীকে পৃথক করে অন্য যে কোন জাতি থেকে।

ছবিঃ লেখক