পরকীয়া

মৃত্তিকা মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জী

এক.

শিউচরণ ঝাড়ুদার…কন্ট্রাক্টে ভ্যাট থেকে ময়লা তোলে মিউনিসিপ্যালিটির গাড়িতে,ড্রেন পরিষ্কার করে…বছরে যে সময়টায় কাজ থাকেনা দেশে চলে যায়…মালিকের খেতে জন খাটে…মালিকের কিরপায় কলাটা মুলোটা জুটে যায়,কপাল ভালো হলে দু চার রুপিয়ার মুখও দেখে…লছমী সে সময় শহরের বস্তিতে থাকে,লড়কীদের দেখাশোনা করে…লছমী তার ঘরওয়ালী…বড় লক্ষীমন্ত…ব্লাউজ সেলাই করে,বিড়ির প্যাকেট কেটে দু চার পয়সা আনে সংসারে…টানাটানির সংসারে চারজনের ভাত ডালের জোগাড় হয়ে যায়…

শিউচরণ ইচ্ছা পোষণ করে সীতা গীতা পড়হাই করে নোকরি করবে…দু পয়সা আয় করবে,মর্জি মাফিক দিন গুজরান করবে,শাড়ি ঝুমকা খরিদ করবে ইচ্ছামতন…লছমীর মতন এক কাপড়ে দিন চালাতে হবেনা…

গত বছর ইসকুলের রুমি দিদিমণি চুমকি বসানো পুরানো শাড়িটা দিয়েছিল লছমীকে,সিলাই করে লছমী যত্ন করে বাক্সে রেখে দিয়েছে….এবার বনোয়ারীর মেয়ের শাদিতে পরবে ওইটা…গরীবের শখ।শিউয়ের গরীব সংসারে,সুখের সংসারে আগ লাগাতে চায় ময়না,তার মালিকের মেয়ে।

দুই.
পার্কিং লট থেকে গাড়িটা বের করতে করতে বরুণকে ফোন লাগায় দ্যুতি….পাঁচটা বেজে গেছে..বরুণ কি অফিসে এখন??….
“হ্যালো বরুণ??”…
“বলো”…
“সরি ফর বিয়িং লেট ….আই কান্ট মেক ইট টুডে”….
“সে কী!!!আগে বললে না কেন?? আশায় আশায় বসে রয়েছি”…
বরুণের গলার স্বরে হতাশা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে দ্যুতি….
“সরি…লেট আস মেক ইট সাম আদার ডে,প্লিজ”…
“ওক্কে,বেটার লেট দ্যান নেভার”…ফোন কেটে দিল দ্যুতি,ঠোঁট চেপে হাসলো…হাসলে দ্যুতির ডান গালে টোল পড়ে…লুকিং গ্লাস দিয়ে নিজেকে দেখল দ্যুতি..মাখনের মতন মসৃণ ত্বক,জোড়া ভ্রূ,ছোট কপাল,কাঁধ অবধি স্টেপ করা ঘন চুলের ঢাল..অনন্যা সে…স্নানঘরের আয়নায় নিজেকে দেখা শখ তার ,প্রতিদিন….পাঁচফুট তিন ইঞ্চির দ্যুতি সেনের নির্মেদ, নিয়মিত ব্যায়াম করা আওয়ার গ্লাস ফিগার,উদ্ধত বক্ষযুগল,ক্ষীণকটি এখনও,এই মধ্যত্রিশেও বহু পুরুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়..”সবুর কর মিঃ বরূণ চ্যাটার্জী,সবুরে মেওয়া ফলে” দাঁতে দাঁত চেপে বললো দ্যুতি….

তিন.
এই হপ্তা থেকে হেডদিদি শিউচরণের তনখা দুশো রুপিয়া বাড়িয়ে দিয়েছেন….দিদিমণিদের পিসাবখানা সাফসুতরো করার লোকের তবিয়ত খারাপ,শিউকেই করতে হবে….সপ্তাহে দুশো রুপিয়া অনেক…লছমীর আপত্তি শুনল না সে…শিউয়ের বাবা বলতেন,”ছোটা কাম করনেসে আদমি কভিভি ছোটা নেহি হোতা শিউ”…শিউএর লড়কিরা বড় হয়ে গেলে,লায়েক হয়ে গেলে থোরাই এই কাম করবে শিউ!!…

তাছাড়া গেল মাসে ময়না একখানা ঝুটা মুক্তোর মালা,একখানা জরির শাড়ি চেয়েছে তার কাছে…না নিলে ইজ্জত থাকবে বাচ্চা মেয়ের সামনে??….ময়না,যৌবনবতী ময়না শিউকে কামনা করে….শরীরে,মনে….আসতে যেতে আগুন ঝরায় চোখ দিয়ে…সহজ সরল মানুষ শিউ,কথার মারপ্যাঁচ বোঝেনা,কিন্তু মেয়ে মানুষের চোখের আগুন না বোঝার বান্দা সে নয়….শিউ এর মনের চোরাকুঠরিতে ময়নার যাতায়াত শুরু হয়েছে….শিউয়ের ধমনীতে রক্তস্রোত গরম হয় ময়নার কথা ভেবে …..

চার.
বরুণকে আজ ফাইভ স্টার মলে আসতে বলেছে দ্যুতি…..রেবেকাজ বার এ বসে একসঙ্গে মদ্যপান আর তারপরে সোজা পার্ল হোটেল…বরুণ সব ব্যবস্থা করে রেখেছে…

প্রাইমারটা মুখে গলায় লাগিয়ে শুকোবার অপেক্ষায় রইলো দ্যুতি….শোওয়ার ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়াল…আর কয়েকঘন্টা পরেই পর্দাঘেরা অন্ধকার ঘরে বরুণের অঙ্কশায়িনী হবে সে,হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে নেবে পৌরুষ…খাপখোলা তরবারির মতন শরীরের ক্রমাগত আঘাতে আহত করবে বরুণকে ….নিজের দুপায়ের মাঝে বিবশ বরুণের থেকে ছিনিয়ে নেবে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি….আয়ানের সঙ্গে একঘেঁয়ে,ঝিম ধরা,অভ্যস্ত ,মধ্যবিত্ত দাম্পত্যের ফাঁকে এইটুকুই তার কাছে রিলিফ…..বরুণের টাকায় চারচাকা যখন হয়েছে….নাহ্ ,উত্তেজনায় আর বেশি কিছু ভাবতে পারেনা সে…বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখা কল্যাণ জুয়েলারির সোনার নেকলেসের ওপর খেলে বেড়ায় দ্যুতির চাঁপার কলি আঙ্গুল…গতমাসে বরুণের উপহার….আরও চাই,প্রচুর চাই দ্যুতির…চাবুকের মতন শরীর কাজে লাগিয়ে দ্যুতি সেন হাসিল করে নেবে যাবতীয় ইহজাগতিক না পাওয়া….

পাঁচ.
নিচে বাজারে গুলাটিয়াদের কাপড়ের দোকান থেকে লাল চুমকি বসানো শাড়ি কিনেছে শিউ,সঙ্গে ঝুটা মুক্তার দুই ছড়া মালা….কাল দেশে যাবে ,ময়নাকে দেবে সে..

দিশি মদের ঠেকে যায় শিউ,পায়ে পায়ে…গলায় ঢালে গরল,চোখে ঘোর লাগে….রেন্ডী শালী ময়না!!!কোমরের ভাঁজ,পালিশ করা পিঠ,চোখের চোরা ইশারায় জিনা হারাম করে দিয়েছে শিউএর…রাত এবং নেশা দুইই গাঢ় হয়…টলতে টলতে বস্তিতে ফেরে শিউ…দরজায় ধাক্কা দেয়,টিনের দরজার বিকট আওয়াজে খান খান হয় রাতের নিস্তব্ধতা…শিউয়ের খেয়াল হয় লছমী মেয়েদের নিয়ে বাপের ঘর গেছে,রাতে ফিরবে না…তালা খুলে ঘরে ঢোকে শিউ…

বিছানায় আছড়ে পড়ে নেশার ঘোরে কল্পনায় চরম আদর শুরু করে লাল শাড়ি পরা ময়নাকে…ময়নার নরম উষ্ণ শরীর নিজের শরীর দিয়ে পিষে ফেলতে ফেলতে কল্পনাতেই ঘুঙ্ঘট সরিয়ে দেয় শিউ….অবাক হয়ে দেখে মায়া মায়া,সুর্মা পরা চোখজোড়া…চোখা নাক,চিবুকের ভাঁজ বেয়ে চোখ স্থির হয় “লছমীর” গলার তিলে…..এ তো লছমী!!! শিউ এর ঘরওয়ালী,তার দুই সন্তানের মা ,আত্মার আত্মীয় তার…নেশার ঘোরেই শিউ এর চোখ থেকে ঝরে পড়ে চাঁদের আলোর মতন নরম ভালোবাসারা…সে জড়ানো গলায় গাইতে থাকে,”সজনী তু মত কর অভিমান”

ছবি: গুগল