মনের রঙ…

মনের কি নিজস্ব কোনো রঙ আছে? উত্তর হচ্ছে নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো বলে গেছেন ‘‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ’’। সেটা সম্ভব কীভাবে! মানুষের মন তো আর শিল্পীর প্যালেট নয় যে সেখানে রঙের সমাহার থাকবে। মন মানুষের বুদ্ধি আর বিবেকের সমন্বিত একটি রূপ। মন প্রকাশিত হয় একজন মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ আর কল্পনার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু ওই যে শুরু করলাম মনের রঙের প্রসঙ্গ দিয়ে। বিজ্ঞান বলে মানুষের মনের কোনো রঙ না থাকলেও রঙের সঙ্গে মানুষের মনের একটা সম্পর্ক আছে। রঙ মনকে প্রভাবিত করে। হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে ইঙ্গিত-ই দিয়েছেন চেতনার রঙের কথা লিখে।
আমাদের দৃষ্টিসীমার মাঝে যে রঙের পৃথিবী বিরাজমান সেই পৃথিবী মানুষের মনকে নানা অনুভূতির মধ্যে নিয়ে যায়। প্রকাশ করে তার চিন্তাকে। শুধু রঙ, তুলি হাতে শিল্পী নয়, রঙ নিজেই যে কোনো মানুষের মনের গভীরে তৈরী করে দিতে পারে আলাদা অনুভূতি।
প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজন সেই রঙ আর মনের সম্পর্ক নিয়েই।

ঘরের দেয়াল থেকে শুরু করে খাবারের দোকান, জেলখানা-সব জায়গাতেই দেয়ালের রঙ নিয়ে চলে গবেষণা। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে হাসপাতাল কিংবা অপারেশন থিয়েটারের দেয়ালের রঙ বেশীরভাগ সময়ই সাদা হয়। ধরে নেয়া যায়, শুভ্র রঙ আমাদের পরিচ্ছন্নতার একটা ধারণা দেয়। খাবারের দোকানের দেয়ালে থাকে লাল আর হলুদের আধিক্য। কোনো কোনো দেশের জেলখানার দেয়ালে থাকে গোলাপী রঙ। গবেষকরা বলছেন গোলাপী রঙ মানুষের মনের হিংসা এবং আক্রমণাত্নক অনুভূতিকে প্রশমিত করতে সাহায্য করে।
পৃথিবীতে সবচাইতে বেশী গবেষণা হয়েছে লাল রঙ নিয়ে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে- নীল কিংবা সবুজের থেকে লালের কাছাকাছি থাকলে মানুষ যে কোনো চিন্তাশীল অথবা মস্তিষ্কচালিত কাজে বেশি সক্রিয় হয়।আবার মজার ব্যাপার হচ্ছে দুনিয়াজুড়ে নীল হচ্ছে সবচাইতে জনপ্রিয় রঙ। প্রিয় রঙ নিয়ে প্রশ্ন করলে বেশীরভাগ মানুষই ভোট দেয় নীল রঙকে। এর মাঝে নীল রঙ আবার পুরুষের বেশী পছন্দ। তবে আসল ধারণাটা হলো- কোনো নির্দিষ্ট রঙের আশপাশে মানুষ অনেক বেশী সময় কাটায় অথবা স্মৃতির সঙ্গে যে রঙটা সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে সেই রঙটাই মানুষের অনুভূতি অথবা আচরণের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
রঙ এবং মানুষের মনের ওপর প্রভাব নিয়ে এখন পর্য্ন্ত অনেক গবেষণা হয়েছে। সেসব গবেষণায় অবশ্য নিদিষ্ট কোন ফলাফল বের হয়ে আসেনি। একটু আগে বলছিলাম পৃথিবীর বেশীরভাগ পুরুষ নীল রঙ পছন্দ করে। জরিপে দেখা গেছে নারীদের প্রিয় রঙের তালিকায় বেশী ভোট পেয়ে এগিয়ে আছে কালো। অথচ সাধারণ বিবেচনায় কালোকে বলা হয় অশুভ প্রতীক।আবার সম্প্রতি আমেরিকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে বয়ষ্ক মানুষরা কমলা রঙ পছন্দ করে। গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বিকল হয়ে আসা মনকে উদ্দীপ্ত করতেই এমন উজ্জ্বল রঙকে নির্বাচন করছে তারা।   
লাল রঙ নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। লাল রঙের মন বুঝতে গিয়ে গবেষকদের সামনে এসেছে বিচিত্র সব প্রশ্ন আর ভাবনা। আসলে মানুষের মনের বিচিত্র প্রতিক্রিয়াই রঙের সঙ্গে তাদের ভাবনাকে জড়িয়ে ফেলে। যেমন পরীক্ষার খাতায় গোল্লা দিতে শিক্ষকরা সবসময় লাল রঙ ব্যবহার করেন। আবার খাতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে যখন প্রশংসা করেন তখনও ‘ভালো’, ‘খুব ভালো’ এই বিশেষণগুলোও লেখা হয় লাল কালিতে। কিন্তু গবেষণা বলছে মানুষের মনের মধ্যে লাল এক ধরণের সতর্ক সংকেত হিসেবেই কাজ করে। পাশাপাশি যারা লাল রঙ পছন্দ করেন তাদের মন কে দৃঢ় এবং আবেদনময় বলেও আখ্যা দিচ্ছেন গবেষকরা। ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়ার গবেষকরা সব ধরণের রঙের জন্য ভালোলাগার একটি মাত্রা খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সেই গবেষণায় অংশগ্রহণকারী স্বেচ্ছাসেবকদের ‘লাল’, ‘নীল’, অথবা ‘রঙহীন কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে কয়েকটা পরীক্ষা করেন তারা। যে অংশগ্রহণকারীরা লাল রঙের স্ক্রিনে বসে কাজ করলেন তারা স্মৃতিপরীক্ষা, প্রুফ-রিডিং অর্থাৎ যেসব ক্ষেত্রে গভীর মনোযোগ প্রয়োজন সেই কাজগুলোতে বেশ ভালো করলেন। অন্যদিকে যেসব স্ক্রিনে নীল রঙ ছিল তারা সৃজনশীল কাজগুলো বেশ ভালো ভাবে করেছিলেন। গবেষণায় দেখা গেল, লাল বলতেই অবচেতন মনে ‘পরিহার কিংবা সতর্কতা’-এই ধরনের শব্দ এসে যায়। এর ফলে মানুষ আরো সতর্ক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে নীল রঙের প্রভাবে তাদের মন সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করে। এ থেকে গবেষকরা গবেষণার খাতায় মন্তব্য করেন, নীল রঙ স্বাধীন চিন্তায় অনুপ্রাণিত করে, যার ফলে সৃজনশীলতা আরো বৃদ্ধি পায়।নীল আসলে মানুষের মনের ভালোবাসাকে প্রকাশ করতেও সাহায্য করে।
রঙের মাঝে লিঙ্গভেদ আছে?কোনো রঙ পুরুষ আবার কোনো রঙ নারী? বোকার মতো প্রশ্ন অনেকেই বলতে পারেন। কিন্তু রঙ পছন্দ করার ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদ না থাকলেও এমন তফাৎ চোখে পড়েছে গবেষকদের। তারা বলছেন, নীল রঙ পছন্দ করেন শতকরা ৫৭ জন পুরুষ। পাশাপাশি নীল পছন্দ ৩৫ শতাংশ নারীর। এক সময় বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করেছিলেন যে মানুষের রঙ পছন্দের বিষয়টা আসলে আমাদের দেহের ডিএনএ‘র ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দুই মনোবিজ্ঞানী স্টিফেন. ই. প্লামার আর কারেন স্কোলস জানাচ্ছেন, ডিএনএ নয়, মানুষের মনের মধ্যে বিশেষ রঙের প্রতি দূর্বলতা গড়ে ওঠে সেই রঙের সঙ্গে বাস্তব পৃথিবীর ইতিবাচক কতগুলো বস্তুর সঙ্গে সে সম্পর্কিত তার ওপর। ২০১০ সালে তাদের এক গবেষণায় বের হয়ে এসেছে, নীল রঙের সঙ্গে ইতিবাচক বস্তু বা ধারণার সবচাইতে বেশী সম্পর্ক। যেমন উজ্জ্বল নীল আকাশ, টলটলে নীল পানি। এ ধরণের বস্তুগুলো মানুষের মনে সবসময়ই ভালো অনুভূতির জন্ম দেয়। তাই বোধ হয় পরিধেয়র ক্ষেত্রে নীল জিন্স গোটা পৃথিবী জুড়ে মানুষের কাছে প্রিয়।
প্রখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসোর কাছে বহুবার জানতে চাওয়া হয়েছিল তার প্রিয় রঙ কোনটি? পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন তিনি, কেউ কি জানে ক্যানভাসে একটি রঙের পরে আরেকটি রঙ এসে কেন দাঁড়িয়ে যায়? আসলে এর কোনো ব্যাখ্যা হয় না। পিকাসোর আঁকা ছবিকে নানা যুগে ভাগ করেছেন। সেই বিভাজন গড়ে উঠেছে রঙের ওপর ভিত্তি করে। ১৯০১ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে আঁকা তার চিত্রকর্মকে বলা হয় ‘ব্লু পিরিয়ড’। আবার পরের দু বছরের চিত্রকর্মকে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘রোজ পিরিয়ড’। এই দুই সময়েই রঙের ব্যবহারে শিল্পীর প্রকাশ ছিলো একেবারেই ভিন্ন। আবার ১৯৩৭ সালে শিল্পী যখন তাঁর বিখ্যাত ‘গুয়েরনিকা’ আঁকলেন তার রঙ ছিলো প্রায় সবটাই কালো।
আবার আরেক পৃথিবী কাঁপানো শিল্পী ভ্যানগখ হলুদ রঙের প্রতি তার অনুরাগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘‘হলুদ আমার প্রিয় রঙ কারণ সে সে সূর্য্র আলোর প্রতীক’’।
আচ্ছা, একদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে যদি দেখা যায় গোলাপের রঙ কালো হয়ে গেছে, গাছের পাতা হয়েছে সাদা তখন আমাদের মনের অবস্থা কী হবে? গোলাপ হারাবে তার গভীর আবেদন। সবুজ পত্রালী আমাদের মনকে আর মুগ্ধ করবে না। কিন্তু তেমনটা তো আর ঘটে না। কারণ আমাদের চোখ আর মস্তিস্কই ঠিক করে নেয় সঠিক বস্তুর সঠিক রঙ। আসলে, বস্তুর পৃষ্ঠ বা তলের উপরে আলো পড়লে যদি বস্তুটি আলোর সবটুকু শোষণ করে কোন একটা নির্দিষ্ট রঙকে শোষণ করতে ব্যর্থ হয় তখন সে ওই রঙটিকে প্রতিফলিত করে দেয়। আর তখনই আমরা বস্তুটিকে সেই নির্দিষ্ট রঙের দেখি। বিজ্ঞান আমাদের দেখার পৃথিবী আর রঙ সম্পর্কে এমন কথাই বলে। আর ওই রঙই আমাদের মনের মধ্যে তৈরী করে নির্দিষ্ট চেতনা। প্রভাবিত করে আবেগকে।
মানুষের মনের ওপর রঙের প্রভাব এবং বিশেষ রঙের ওপর দূর্বলতাকে ব্যাখ্যা করে মানুষের চরিত্র সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছে বিজ্ঞান। মানুষের মনে নীল আর লাল রঙের প্রভাব গভীর। নীলকে বলা হচ্ছে ভালোবাসার রঙ। এই রঙ একজন মানুষকে স্পষ্ট চিন্তা করার শক্তি যোগায়। লাল রঙের সঙ্গে রয়েছে দৃঢ়তা আর মৌলিকত্বের যোগাযোগ। পাশাপাশি লালকে ভালোবাসার রঙও বলা হয়। কারণ এই রঙের গোলাপ হাজার বছর ধরে মানুষের মন জয় করে আছে।
বেগুনি রঙের সঙ্গে মনের চিন্তাশক্তির সম্পর্ক আছে। গবেষণা বলছে, এই রঙের প্রভাব মানুষের মনের চিন্তা করার ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে। তৈরী করে আধ্যাত্নিকতার বোধ। হলুদকে চিহ্নিত করা হয়েছে স্নায়ু উত্তেজক রঙ হিসেবে। এটি মনের আবেগ-অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। বাড়িয়ে দেয় আত্নবিশ্বাস। কালো রঙ আবার আত্নবিশ্বাসীর সঙ্গী। এই রঙ যারা পছন্দ করেন তাদের মধ্যে শৃংখলার বোধ খুব শক্তিশালী হয়।
সাদা রঙ যারা পছন্দ করেন তারা খোলা মনের মানুষ হয়ে থাকে। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে তারা পরিচ্ছন্নতাকে ভালোবাসে। নিজেদের কাজটুকু করেন নিখুঁতভাবে।
কেউ বলেন, জন্মের রঙ শ্বেতশুভ্র, মৃত্যুর রঙ কালো। কিন্তু কারাগারে মৃত্যুদন্ডের অপেক্ষায় থাকা আসামীর শেষ আশ্রয় কনডেম সেলের দেয়ালের রঙও থাকে সাদা। কালো মৃত্যু নেমে আসার আগে সাদার স্বস্তি তা? এ প্রশ্নের উত্তর সঠিক ভাবে দেয়া সম্ভব নয়। তবে হয়তো রঙ এভাবেই মানুষের জীবনের সূচনা থেকে শুরু করে অন্তে জড়িয়ে থাকে। নানা পরিবেশে, নানা মুহূর্তে তার মনের গঠনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় লিখেছেন ‘যত দিন বেঁচে আছি আলেয়ার মতো আলো নিয়ে’। সেই আলোই তো এক অস্পষ্ট রঙ, মানুষের জীবনে রঙ কখনো আলেয়ার মতো আবার কখনো ব্রাশের চড়া টানে জড়িয়ে থাকে। মানব জীবনকে অর্থপূর্ণ করে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ ইন্টারনেট