সবাই নয়, কেউ কেউ পারে

মাহমুদা আক্তার

ওর বাসায় গেলে আমি অন্য রকম ভালোলাগায় আপ্লুত হই। ওর সাজানো গুছানো সংসার দেখি। চারপাশে কেমন শান্ত আর মনোরম পরিবেশ। ওর ফ্রিজ, টিভি, ডাইনিং টেবিল, খাট সব দেখি আর ভাবি। এই নতুন কেনা সুন্দর জিনিসগুলো ওর ঘরের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি তো জানি এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওর কষ্ট আর হাড় ভাঙা খাটুনির ঘাম। কিন্তু ও তো হার মানেনি। মাথা উঁচু করেই বেঁচে আছে। আর দশটা পাঁচটা মেয়ের সঙ্গে এখানেই ওর পার্থক্য। ও তো ইচ্ছা করলেই পরম আরামের একটা জীবন যাপন করতে পারতো, যেটা এখনও আমাদের দেশের অনেক শিক্ষিত স্বাবলম্বী মেয়েরা করছে। কিন্তু ও তো আপোষ করেনি নিজের আত্মসম্মানের সঙ্গে। তাই ছেড়ে এসেছে ওই মিথ্যা, অসুখী আর চরম অপমানের সুখী জীবনটা! কী অবলীলায় ও ঝেড়ে ফেলেছিলো ওর ১৫ বছরের পুরনো জীবনের খোলসটা। এ নিয়ে ও তো কোনো কাহিনী করেনি, কোনো সাংবাদিক বা এনজিও কর্মীর কাছে যায়নি। নাকি কান্নায় কারো সহানুভূতি আদায় করার চেষ্টাও করেনি। এক রাতে কেবল এক কাপড়ে ছেড়ে এসেছিলো পুরনো সংসারটা।
অথচ ওই সংসারে ওর কত কি-ই না ছিলো! বিলাসবহুল আসবাবপত্র, কত শখের ড্রেস, দামি শাড়ি, কিন্তু কিছুই কেয়ার করেনি সে। ওই সংসার থেকে কেবল একটা জিনিসই সে এনেছিল, তার ১২ বছরের মেয়েটাকে। তখন তো কত মানুষ ওকে নানাভাবে নিবৃত করার চেষ্টা করেছে। এমনকি এই আমিও ওকে বলেছিলাম, ‘দেখ না কোনো কম্প্রোমাইজ করা যায় কি না। তোর একটা মেয়ে আছে, ওর গোটা ভবিষ্যত সামনে পড়ে আছে।’
উত্তরে ও বলেছিল, ‘না, অসম্ভব। এরপর যদি কম্প্রেমাইজ করি তাহলে তো আর বেঁচে থাকার দরকার নেই। মরে যাওয়াই ভালো।’ ওর ভিতরের উত্তাপ সেদিন আমাকেও পুড়িয়েছিলো। তাই তো সবসময় ওর পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।
এরপর ওর ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রামটা আমি দেখেছি খুব কাছ থেকে। নিজের ছোট্ট ফ্লাটটায় যেদিন ও উঠেছিল, সঙ্গে ছিল কেবল একটা তোষক আর দুটো বালিশ। কতদিন এভাবেই থেকেছে দুই মা-মেয়ে। এক একটা জিনিস কিনিছে আর আনন্দের সঙ্গে বলেছে,‘জানিস আজ কিস্তিতে একটা ফ্রিজ কিনলাম।’ আর একদিন বলেছে,‘ কালার টিভি কিনেছি একটা, ছবি খুব সুন্দর। ’ এভাবেই একটু একটু করে সাজিয়েছে নিজের সংসার। এর আগেও তো একটা সংসার সাজিয়েছিলো ও। নিজের পছন্দের ছেলেকে বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করার পর পরিবার তো ওকে কোনো সাহায্য করেনি। বিয়ের দিন কয়েকের মধ্যেই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। দাঁতে দাঁত চেপে সব কষ্ট একাই সহ্য করেছে। না, বাবা-মায়ের কাছে বলেনি নিজের হেরে যাওয়ার গল্প। কিন্তু একদিন ঠিক ঘুরে দাঁড়িয়েছে একা একাই।
এমন কোনো আহামরি চাকরি করে না। পায়নি তেমন কোনো সাহায্য সহযোগিতাও। তখন একটাই সম্পদ ছিলো, আত্মমর্যাদাবোধ। এ নিয়েই লড়াই করেছে ও। এখনও লড়াই করেই চলেছে। টিকে থাকার লড়াই, মেয়েকে মানুষ করার লড়াই। আমি ওকে দেখি আর অবাক হই। এতটা সাহস কোথায় পায় ও! আর ওর মেয়েটা, সেও তো মায়ের সংগ্রামে সঙ্গী হয়েছে কী অবলীলায়। হ্যা, বাবার সঙ্গে ওর যোগাযোগ আছে। ফোনে কথা হয়, মাঝে মধ্যে বেড়াতে যায়, কিন্তু কোনোদিন মাকে এ নিয়ে কিছু বলেনি। বরং সাহস দিয়েছে। শুধু তাই না, বলেছে,‘আম্মু, তোমার তো গোটা জীবনই পরে আছে সামনে। আমি চাই তোমার জীবনে একজন সঙ্গী আসুক। তোমার তো একটা সুন্দর জীবন প্রাপ্য।’ ঠিক জোসেলিনের মেয়ে নাদিনের মত।
কিন্তু আমি জানি, লিপি কখনই আর কোনো বাঁধনে জড়াবে না। কারণ সে জেনে গেছে স্বাধীনতার স্বাদ, পুরুষদের আসল চরিত্র!
ও তো দেখতে সুন্দরী, খুবই সুন্দরী, কত মানুষই তো (মানে পুরুষমানুষ আর কি) ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করে। কত গিফট পাঠায়, বন্ধুত্ব করতে চায়। এত প্রলোভনের মধ্যেও কী অবলীলায় নিজেকে আড়াল করে রাখে। হ্যা, দু একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব আছে, কিন্তু সেটারও একটা লিমিটেশন আছে, সীমার বাইরে গিয়ে নয়। এটাই ওর বিশেষত্ব, এখানেই ও আর দশটা পাঁচটা মেয়ের থেকে আলাদা। অনেক শিক্ষিত, অনেক স্বাবলম্বী, এমনকি নারীবাদীদের চেয়েও সাহসী আমাদের লিপি। এজন্যই ওকে আমার এত পছন্দ এত অহঙ্কার করি ওকে নিয়ে। জোসেলিনকে পড়ার আগে থেকেই আমি ওকে চিনি। তাই বুঝি জোসেলিনের কষ্টটা আমাকে এতটা আপ্লুত করেছিল।
আমার ‘মাই উইস লিস্ট’ গল্পের নায়িকা জোসেলিন একজন শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী নারী। থাকে ফ্রান্সে, ইউরোপের অন্যতম উদারতম দেশে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, ওর জন্য নিজের ঘর আর শহর ছেড়ে আসাটা বুঝি খুব সহজ ছিলো। আসলে কোনোটাই খুব সহজ নয়, আবার কোনোটাই খুব কঠিনও নয়। যে পারে সে পারে, যে পারে না কখনোই পারে না।
একজন আত্মমর্যাদাশীল নারীর জন্য সব দেশেই লড়াই করার ধরনটা অনেকাংশেই তো এক। তাদের কষ্ট, বেদনা আর আশাভঙ্গের হতাশার মধ্যে সত্যিকার কোনো পার্থক্য নেই! পার্থক্য শুধু দৃষ্টিভঙ্গীর। । আমি চাই, সব নারী তাদের সম্মান নিয়ে বাঁচুক, অন্তত নিজেকে নিজে সম্মান করতে শিখুক। মিথ্যে ভেঙে বেড়িয়ে আসুক সত্যের কাছে। যেমনটা পেরেছে বাংলাদেশের লিপি আর ফ্রান্সের জোসেলিন। তাই যারা অসম্মানের জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাদের জন্য দুঃখ করবেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলবারও কোনো প্রয়োজন নেই। কেবল একটু সমর্থন দিন, একটু পাশে থাকুন। নারীদের জন্য আমরা যারা ভাবি, তাদের ভালো চাই, তাদের সক্রিয়ভাবে লিপি আর জোসেলিনদের সমর্থন করতে হবে। এটাই এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।

ছবি: গুগল