ইউরোপে তালাবদ্ধ ভালোবাসা…

নিজামুল হক বিপুল

ভালোবাসার রং একেক দেশে একেক রকম। ধর্ম-বর্ণ, কৃষ্টি-কালচার বেধে ভালোবাসা নানান ভাবে ফুটিয়ে তুলেন প্রেমিক-প্রেমিকরা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দূরের ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে তেমনটাই মনে হয়েছে। আমাদের দেশে এই সময়ের ভালোবাসা যেমন এই আছে এই নাই, নিজের ভালোবাসাকে ধরে রাখতে প্রেমিক-প্রেমিকারা যেমন নানা ফন্দিফিকির করেন, কসম করান একে অন্যেকে, ফেভিকলের আঁঠার মত ধরে রাখতে চান নানান কৌশলে। ঠিক তেমনিভাবে ইউরোপেও প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে তালাবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করেন কিংবা তালা মেরে রাখেন।
তিন দফা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে সেসব দেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি,ভালোবাসার রং দেখার সুযোগ মেলেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শহরে শহরে বিভিন্ন সেতুতে ভালোবাসা হয়ে পড়েছে তালাবদ্ধ।
জার্মানীর বন শহর। সেখান থেকে প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট দূরত্বের শহর কোলন। বন হাফবোনাফ থেকে যেতে হয় ট্রেন করে। দ্রুত গতির ইলেকট্রিক ট্রেন যেমন আছে, তেমনি আছে লোকাল ট্রেনও। মেট্রো নামে বেশি পরিচিত এই ট্রেনও চলে ইলেকট্রিসিটিতে। বন থেকে কোলন যাত্রায় লোকাল ট্রেনে চড়লে একটা সুবিধা হচ্ছে কমপক্ষে ২২ থেকে ২৫টি রেলস্টেশন পাওয়া যায়। পরিচিত হওয়া যায় সেসব স্টেশনের সঙ্গে। এই লোকাল ট্রেন চলে ছোট ছোট শহরের ভিতর দিয়ে আবার কখনও রাইন নদীর পাশ দিয়ে।
২০১৭ সালের নভেম্বর মাস। বেশ ঠান্ডা আবহাওয়া। এরই মধ্যে এক বিকেলে আমি আর মাসউদ উল হক রওয়ানা হলাম কোলন এর উদ্দেশ্যে। বন শহরের হাফবনাফ, হাফবনাফ মানে শহরের প্রধান রেল স্টেশন বা জংশনও বলা যায়। এখান থেকে জার্মানির বিভিন্ন শহরে যেমন দ্রুতগতির ট্রেন যাতায়াত করে, তেমনি বনের অভ্যন্তরীন যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মেট্রোও চলাচল করে।
প্রথম দিন কোলন শহরে যাবার জন্য আমরা একটি দ্রুতগতির ট্রেনে চড়লাম। আমাদের স্থানীয় গাইড স¤্রাট জামান আগে থেকেই ট্রেনের সময়সূচী, কত নম্বর ট্রেন এবং কোন প্লাটফরম থেকে ছাড়বে সবই মেসেঞ্জারে খুদে বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে। স¤্রাট হচ্ছেন আমার অত্যন্ত ¯েœহভাজন ছোট ভাই। এক সময় দেশে একটি প্রতিষ্ঠানে আইটি সেক্টরে কাজ করতো। এখন থাকে জার্মানির ডসেলডর্প শহরে। স্কলারশিপ নিয়ে সেখানে গিয়েছে স¤্রাট। জার্মান যাত্রার আগে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার জন্য সময় বের করে রাখতে বলেছিলাম। যনে তাকে সঙ্গে নিয়ে একটু ঘুরে দেখতে পারি হিটলারের দেশ।
যাক স¤্রাটের দেয়া তথ্য নিয়েই আমরা বন থেকে যাত্রা করলাম কোলন এর উদ্দেশ্যে। প্রায় ৪৫ মিনিট পর কোলন হাফবনাফ বা প্রধান রেল স্টেশনে পৌঁছে অপেক্ষা করতে লাগলাম স¤্রাটের। সে ডসেলডর্প থেকে এখানে ছুটে আসে আমাকে সময় দিতে। ফোন করতেই সে জানাল ভাই আপনারা বসেন। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব। ট্রেন লেট করায় একটু বেশি সময় লেগে গেছে।
আমরা প্ল্যাটফরমে বসেই অপেক্ষা করছি স¤্রাটের জন্য। চমৎকার এক পরিবেশ। কোথাও কোন ময়লা আবর্জনা নেই। কোনরকম ডিস্টার্বও নেই। একটার পর একটা ট্রেন আসা-যাওয়া করছে। স্টেশনের সঙ্গেই লাগানো রাইন নদীর লোহার ব্রীজ। এই ব্রীজের উপর দিয়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায় অসংখ্য ট্রেন আসা যাওয়া করে। স্টেশন থেকে সেতুটির সৌন্দর্য উপভোগ করার চেষ্টা করলাম আমরা। এরই মধ্যে স¤্রাটের ট্রেনও চলে এসছে। দূর থেকে ডাক দিতেই তাকে অনুসরণ করলাম। নেমে গেলাম স্টেশনের নিচের প্ল্যাটফর্মে। শত শত মানুষ বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে ভিড় করেছেন স্টেশনে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। একটু ক্ষুধার্ত। স¤্রাট বলল, ভাই কিছু খেয়ে নেই। ঢুকলাম রেলস্টেশনে ম্যাকডোনাল্ডস্ এ। ছোট ছোট ছয়টা বার্গার নিলাম। দ্রুত খেয়ে বের হয়ে পড়লাম কোলন শহর ঘুরে দেখতে। ঠিক শহর না, শহরের দৃষ্টি নন্দন স্থাপনা। কোলন শহরে পর্যটকদের দেখার জন্য যেসব স্থাপনা রয়েছে তার অন্যতম হচ্ছে রাইন নদীর উপর লোহার তৈরি রেল সেতুটি। পর্যটক মনে প্রশ্ন জাগতে পার-ে এরকম সেতু তো অনেক দেশেই আছে। এমনকি বাংলাদেশেও আছে। যেমন সিলেটের ‘কীন ব্রীজ’ বা ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন লাগোয়া পদ্মা নদীর উপর থাকা হার্ডিঞ্জ ব্রীজ। জার্মানির কোলন শহরে গিয়ে সেই সেতু দেখার মাজেজা কী? হ্যাঁ, মাজেজা তো একটা আছে। তা না হলে কী আর প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় করতেন ওই সেতুতে?
আমরা স্টেশন থেকে বের হয়ে শহরের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেই সেতুতে গেলাম। সেতুর মুখে গিয়েই চোখ যেন একেবারেই ছানাবড়া। কোটি কোটি তালা ঝুলছে সেতুর লোহার রেলিং এ। সেই গল্পে পরে আসছি। চার লেনের রেল সেতু। সেতুর দুই পাশ দিয়ে মানুষের হাঁটা চলার জন্য প্রায় ছয় ফুট চওড়া পাকা সড়ক। এই সড়ক দিয়েই পর্যটকরা ঘুরে দেখেন রাইন নদীর এপার-ওপাড়। কেউ বা বাইসাইকেল চালিয়ে চলে যান দিব্যি।
স¤্রাট জানালেন, এই সেতুর বিশেষত্ব হচ্ছে এই সেতুতে রংবেরং এর তালা ঝুলছে। এগুলো হচ্ছে ‘ভালোবাসার তালা’। হ্যাঁ, প্রেমিক-প্রেমিকারা অন্ধ বিশ্বাস থেকে এই সেতুতে তালাবদ্ধ করে যান নিজেদের ভালোবাসা। ভালোবাসার দুই জন মানুষ মনে করেন, এই কোলন রেল সেতুর রেলিং এ তালা ঝুলিয়ে দিলে তাদের ভালোবাসা চিরস্থায়ী হয়ে যাবে! আর কখনও বিচ্ছেদ হবে না! তাই কোলনের বাইরে আশপাশের ছোট ছোট শহর থেকেও প্রেমিক-প্রেমিকারা ছুটে আসেন এই সেতুতে। কিছু সময় কাটিয়ে তারপর তালা মেরে চলে যান।
আমরা পায়ে হেঁটে সেতুর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে গেলাম। দেখলাম, লাল, নীল, ফিরোজা, সোনালী, রূপালী, মেরুন,কফি, বেগুনিসহ নানান রং এর কোটি কোটি তালা ঝুলছে। কেউ কেউ তো আবার অর্ন্তবাস পর্যন্ত তালাবদ্ধ করে রেখেছেন! মনে হল, ভালোবাসার এই তালার ওজন সহ্য করতে না পেরে একদিন হয়তো এই সেতুটিই ধ্বসে পড়তে পারে।
এই সেতুতে দাঁড়িয়ে থাকাবস্থায়ই চোখে পড়ল প্রেমিক-প্রেমিকা তালা ঝুলাচ্ছেন। নতুন তালা মারার জায়গা নেই। তবুও থেমে নেই নিজের ভালোবাসাকে তালা মেরে রাখার প্রতিযোগিতা। একটার পিছনে আরেকটা ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে।
কোলনের এই তালা সেতু দেখার কয়েকদিন পর চেক রিপাবলিক এর রাজধানী প্রাগ এ গিয়ে চোখে পড়ল একই। সেখানেও কয়েকশ বছরের পুরনো চার্লস ব্রীজের পাশে নদীর ধারে লোহার যে রেলিং রয়েছে সেখানেও ভালোবাসার তালা জায়গা করে নিয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে, ফ্রাংকফুর্টেও। জার্মনির এই শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘মাইন’ নদীর উপর থাকা পুরনো একটি সেতুর দুই পাশের রেলিংও তালাবদ্ধ হয়ে আছে ভালোবাসা।
প্যারিস ভ্রমণের সময় শুনেছিলাম, আইফেল টাওয়ার সংলগ্ন সেন নদীর উপর থাকা ব্রীজের রেলিং এর মধ্যেও এক সময় প্রেমিক-প্রেমিকারা তালা ঝুলিয়েছিলেন। কিন্তু একসময় সেতুটি হুমকির মুখে পড়লে সেখানকার সরকার সব তালা খুলে ফেলে এবং ভবিষ্যতে যেন কেউ আর কোন তালা ব্রেিজর রেলিং এ না লাগাতে পাওে সে জন্য নিষেধাজ্ঞাও জারি করে। তারপর থেকেই তালামুক্ত আছে সেতুটি।
ছবি: লেখক