নিউইয়র্কে এবার বসন্ত বিলম্বিত

স্মৃতি সাহা

জেগে থাকা নিউইয়র্ক শহর। কবি লোরকার ভাষায় স্লিপলেস সিটি। সেই শহরে স্বপ্নও যেন নির্ঘুম। এই শহরের দিনরাত্রির রোজনামচা স্মৃতি সাহার কলমে প্রাণের বাংলায় নিউইয়র্ক থেকে ধারাবাহিক ভাবে।

শেষ রাতের হালকা কুয়াশা আর নতুন পত্র,পুষ্পে সজ্জিত ঋতুরাজ বসন্তের স্বর্ণরথ এখন নিশ্চয় বাংলার ঘরে আলো ছড়াচ্ছে। শীতের রূক্ষতা আর স্থবিরতা কাটিয়ে প্রাণের উচ্ছ্বাস মনে হয় রঙধনু হয়ে উঠছে। কিন্তু উত্তর গোলার্ধের সেই শহর যেখানে আমার বাস, সেখানে কিন্তু এখনো বসন্ত আসতে ঢের দেরী। আকাশের অর্গল খুলে নিঃশব্দে নেমে আসা শুভ্র তুষার এখনো আমার শহরে রাজত্ব করে চলেছে। বসন্তের বার্তা পৌছায়নি এখানে। তবে বসন্ত ঠিক কবে আসবে তা জানার জন্য শীতের এই দেশে একটি খুব জনপ্রিয় ঐতিহ্য আছে; যার নাম “গ্রাউন্ডহগ ডে”।

২ ফেব্রুয়ারি, প্রতিবছর উৎযাপন করা হয় গ্রাউন্ডহগ ডে। এই দিন গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে ফিল নামের এক বেজী। যদি সেদিন আবহাওয়া রৌদ্রজ্জ্বল হয় তবে “ফিল” নিজের ছায়া দেখতে পায়। অন্যদিকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে “ফিল” ছায়া দেখতে পায় না।

আর এই ছায়া দেখতে পাওয়া আর না পাওয়ার মাঝেই লুকিয়ে থাকে বসন্তবার্তা। যদি “ফিল” নিজের ছায়া দেখতে পেয়ে বিব্রত হয়ে গর্তে ঢুকে যায় তবে বসন্ত আসতে ছয় সপ্তাহ বাকি আছে ধরা হয়। তার মানে শীত তার চক্র পুরোপরি শেষ করবে অনেকটা সময় নিয়ে। আর যদি “ফিল” নিজের ছায়া না দেখতে পায় সেদিন তবে শীত বিদায় নিতে চলেছে সুতরাং বসন্ত খুব কাছে চলে এসেছে, এমন বার্তা ধরা হয়। এবার “গ্রাউন্ডহগ ডে” তে ফিল তার নিজের ছায়া দেখতে পেয়েছে। তাই নিউইয়র্কে বসন্ত এবার বিলম্বিত।

তুষার ঢাকা শীতের এই শহরে বসন্ত খুব আরাধ্য হবে তা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন হয় না। বসন্তের সঙ্গে প্রাণচাঞ্চল্য যেন একসুতোয় গাঁথা। সদা চঞ্চল নিউইয়র্কেও কিন্তু বাসন্তিক সেই চাঞ্চল্য খুব আলাদা করে ধরা যায়।

অসম্ভব গতিময়তা আসে যেন সে সময় এই শহরের সকলের জীবনে। আর এই কারণেই মনে হয় সময়কে বাড়িয়ে নেবার তাগিদ দেখা যায় শীত পেরিয়ে বসন্ত আসতেই। মার্চের ২য় রবিবার, প্রতিবছর দিনের সময় ১ ঘন্টা বাড়িয়ে দেওয়া হয় অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটা ১ ঘন্টা এগিয়ে আনা হয়। ১৯১৮ সালে প্রথমবারের মতো নিউইয়র্কে শুরু হয় এই “ডে লাইট সেভিংস।” সেই থেকে আজ অবধি একইভাবে এই শহরে সময় বাড়িয়ে নেবার নিয়মটি পালন করা হয়ে আসছে। শীতের ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যা বা আয়তনে ছোট দিনগুলো বসন্তে এসে প্রলম্বিত হতে শুরু করে। সময় সর্বোচ্চ ব্যবহার সব সময়, সবার জীবনে খুব জরুরী। সময়ের গতিশীলতার মাঝেই নিহিত জীবনের চলৎশক্তি। আর এই সত্যটির প্রয়োগই যেন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত শহর নিউইয়র্কের সদা ব্যস্ত রূপের মূলমন্ত্র।

ছবিঃ গুগল