বোলিং দুদিনে নিহতের সংখ্যা ১৪র বেশী বলে উল্লেখ করেছিলেন বার্তায়

অমি রহমান পিয়াল

পৃথিবীর সচেতন মানুষ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে চমকে উঠেছিল। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এ দেশের মানুষ সেদিন প্রাণ দিয়েছিলো রাজপথে। পুলিশের বুলেট কেড়ে নিয়েছিলো সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত সহ আরো মানুষের প্রাণ। ক্ষোভে, প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলো এই দেশের মানুষ। পাকিস্তানী শাসকদের বঞ্চনা আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষিত হয়েছিলো প্রকাশ্যে।
সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়েছি আমাদের রাষ্ট্র ভাষার অধিকার।আজ সেই দিনটি গোটা বিশ্বে পরিচিত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে।
সেদিন ঢাকায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকেও নিজ নিজ দেশে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পাঠানো হয়েছিলো নানা জরুরী বার্তা।সেই সময়ে মার্কিন দূতাবাস থেকে তেমনি কিছু বার্তা প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য পুনঃমুদ্রিত হলো। লেখাটি ‘জন্মযুদ্ধ ৭১’ নামে ওয়েব পোর্টালে কয়েক বছর আগে প্রকাশিত হয়। লিখেছেন অমি রহমান পিয়াল।

২৩ ফেব্রুয়ারি মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো তারবার্তাটি বেশ চমকপ্রদ। এখানে কিছু বাড়তি খবর আছে। ঢাকা থেকে কনসাল জেনারেল বোলিং তার তারবার্তাগুলো সরাসরি পৌছাতে নাও পারে এই সম্ভাবনা থেকে ইসলামাবাদে রাষ্ট্রদূত ওয়ারেনের সাহায্য নিয়েছেন। ওয়ারেন লিখেছেন বোলিংয়ের বরাতেই। সেখানে বোলিং দুদিনে নিহতের সংখ্যা ১৪র বেশী বলে উল্লেখ করেছেন এবং আহতের সংখ্যা অগুনিত। সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে গেছে জানিয়ে এর নেপথ্যে আওয়ামী লীগ এবং কমিউনিস্টদের ইন্ধন আছে বলে সন্দেহ জানিয়েছেন বোলিং। ঢাকায় সরকারী মুখপত্র বলে পরিচিতি পাওয়া মর্নিং নিউজ জনতা জ্বালিয়ে দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে তারবার্তায়। এছাড়া প্রভাবশালী দৈনিক আজাদ এই ইস্যুতে নুরুল আমিন সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে জানিয়ে লেখা হয় যে ২২ ফেব্রুয়ারিই প্রাদেশিক সংসদ অধিবেশনে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার একটি বিল উত্থাপন করেছে নুরুল আমিনের নেতৃত্বাধীন সরকারী দল।
একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। ২৩ ফেব্রুয়ারি মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো তারবার্তাটি বেশ চমকপ্রদ। এখানে কিছু বাড়তি খবর আছে। ঢাকা থেকে কনসাল জেনারেল বোলিং তার তারবার্তাগুলো সরাসরি পৌছাতে নাও পারে এই সম্ভাবনা থেকে ইসলামাবাদে রাষ্ট্রদূত ওয়ারেনের সাহায্য নিয়েছেন। ওয়ারেন লিখেছেন বোলিংয়ের বরাতেই। সেখানে বোলিং দু’দিনে নিহতের সংখ্যা ১৪র বেশী বলে উল্লেখ করেছেন এবং আহতের সংখ্যা অগুনিত। সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে গেছে জানিয়ে এর নেপথ্যে আওয়ামী লীগ এবং কমিউনিস্টদের ইন্ধন আছে বলে সন্দেহ জানিয়েছেন বোলিং। ঢাকায় সরকারী মুখপত্র বলে পরিচিতি পাওয়া মর্নিং নিউজ জনতা জ্বালিয়ে দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে তারবার্তায়। এছাড়া প্রভাবশালী দৈনিক আজাদ এই ইস্যুতে নুরুল আমিন সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে জানিয়ে লেখা হয় যে ২২ ফেব্রুয়ারিই প্রাদেশিক সংসদ অধিবেশনে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার একটি বিল উত্থাপন করেছে নুরুল আমিনের নেতৃত্বাধীন সরকারী দল।
২৮ ফেব্রুয়ারি বোলিং যে তারবার্তাটি পাঠিয়েছেন সেটিরও ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতা আছে। এতে ঠিক আগের দিন পুলিশি হামলায় ছাত্রদের নির্মিত শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে দেওয়ার উল্লেখ আছে।এটিকে ঘিরে ছাত্রজমায়েতটিকেও ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। এরপর ছাত্রদের হল তল্লাশি করে ২৭ জন কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম ডাঃ হুদার যিনি প্রাদেশিক সংসদের স্পিকারের আত্মীয়। ছাত্ররা গ্রেফতারকৃতদের মুক্তিসহ ৯ দফা দাবি পেশ করেছে এবং তা মানা না হলে আন্দোলনে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে যাওয়ার নেপথ্যে পুলিশ গোপন ওয়ারল্যাস (রেডিও) নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব আছে বলে সন্দেহ করছে বলে বোলিং লিখেছেন তারবার্তায়।
পুলিশ রেইডে প্রচুর উস্কানিমূলক লিফলেট উদ্ধার করা হয়েছে এবং নারায়ণগঞ্জে এক সমাবেশে হাতুড়ি কাস্তে পতাকা উড়েছে বলে জানা গেছে (তারবার্তার ভাষায়)। সরকার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং আগামীতে ভাইস চ্যান্সেলর সরাসরি সরকারী নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন বলে একটি আইন পাশ করা হচ্ছে।
মাঝামাঝি ২৫ ফেব্রয়ারী পাঠানো আরেকটি তারবার্তায় গোটা পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ রয়েছে। সেখানে ২৭ জানুয়ারিতে ঢাকায় খাজা নাজিমউদ্দিনের ভাষণে উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করা হবে বলে পুনোরুক্তিই গোটা পূর্ব পাকিস্তানে বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বোলিংয়ের ১৪ জনেরও বেশী নিহত হওয়ার খবরটা আসলে উড়ো খবরের একটা কনসাইজ ফর্ম। ২৪ মার্চ পূর্ব বঙ্গের তথ্য বিভাগ (লক্ষ্যনীয় পূর্ব পাকিস্তান নয়) একটি প্রেসনোট ছাড়ে ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় নিহতদের নাম ও নিহত হওয়ার ঘটনাস্থল এবং সমাহিত হওয়ার স্থানের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিলো, মৃতদেহগুলো ধর্মীয় রীতি মেনেই সৎকার করা হয়েছে। একজন হাফিজ জানাজা পড়িয়েছেন এবং মৃতদের নিকটাত্মীয়দের কেউ না কেউ উপস্থিত ছিলেন। প্রতিটি ঘটনাই একজন প্রথম শ্রেনীর ম্যাজিস্ট্রেট পুরো অনুষ্ঠান তদারক করেছেন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
ছবিঃ গুগল