নিঃশব্দে হারালো সেই ছাদ

ইরাজ আহমেদ

ছাদ বলে আমাদের এই নাগরিক জীবনের সামান্য একটু সম্প্রসারিত জায়গা হারিয়ে গেছে। একটা সময়ে বাসার ছাদ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা ছিলো। গুরুত্বপূর্ণ ছিলো সিঁড়িঘর। গুরুত্বপূর্ণ বলছি এজন্য যে এই জায়গাগুলো একদা অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকতো। চোখ বন্ধ করলে আমি এখনো শুনতে পাই শীতের সকালে ছাদে ধুনুরীরা লেপ বা তোষকের তুলা ধুনছে। তাদের যন্ত্রে গুমগুম শব্দ উঠছে আর শীতের হাওয়ায় চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে তুলার আঁশ। দেখতে পাই, ছাদের ওপর কোনো প্রতিবেশীর টবে সামান্য ফুলের আয়োজন আলো করে আছে চারপাশ। বলছি প্রায় বছর চল্লিশেক আগের কথা। তখন শীতের দিনে লেপ-তোষক বানাতে লোক আসতো। আর তাদের কাজের জায়গা ছিলো ছাদ।ছাদে শীতকালে থাকতো দু একটা টবে গাঁদা ফুলের মাথা তুলে দাঁড়াবার আয়োজন। ছাদেই কাপড় বিছিয়ে বসে তুলা ধুনতো দুজন মানুষ। এই তুলাধুনার কাজটাও বোধ করি আমাদের এখনকার নাগরিক জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।

ছোটবেলায় ছাদের সিঁড়িঘরে প্রথম সিগারেট খেতে শুরু করেছিলাম। সেও এক মজার গল্প। পাশের বাড়ির বয়সে বড় ভাইরা দুপুরবেলা ওখানে গোপনে সিগারেট খেতো। একদিন আচমকাই তাদের এই গোপন কাণ্ডের সাক্ষী হয়ে গেলাম। আর তাতে আমাকে হাতে রাখার জন্য তারা সিগারেট খাইয়ে দিলো। শুরু হলো আমার ধূমপায়ী জীবন। অবশ্য এর আগে স্কুলের এক বন্ধু এই ধূমপান বিষয়টির সঙ্গে আমাকে পরিচিত করে দিয়েছিলো। তখন আমিও মাঝে মাঝে একা একা ছাদের সিঁড়িঘরে সিগারেট খেতে যেতাম। ছাদ আর সিঁড়িঘর সেই প্রথম জীবনে আমার কাছে গোপনীয়তার অনুসঙ্গ হয়ে এসেছিলো।

একদা মধ্যবিত্ত বাড়ির ছাদে লম্বা লম্বা তার টানানো থাকতো। তারে শুকাতো রাজ্যের কাপড়। মনে আছে বাসা বদলের সময় সঙ্গে করে মোটা তার নিয়ে যেতে হতো নতুন বাড়ির ছাদে বাঁধার জন্য। এখন আমাদের ফ্ল্যাট কালচারে ছাদে কাপড় শুকাতে দেয়ার ঘটনাটা খুব কমই চোখে পড়ে। শূণ্য ছাদে বেশীরভাগ সময়ই একা ঝুলে থাকে তার। এই কাপড় শুকানোর কথা মনে পড়তেই স্মৃতির ভেতরে এসে দাঁড়ালো সার বাঁধা আচারের বৈয়ম। ঘরে তৈরী আচার ছাদে রোদ দেয়ার রেওয়াজটাও জীবন থেকে খসে পড়েছে। তখন আম, তেতুল, লেবু, করমচা, জলপাইয়ের মৌসুমে আচারের বৈয়মগুলোকে ছাদের রেলিংয়ে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রোদে পুড়তে দেখা যেতো। সেই আচারের শিশি থেকে আচার চুরি করে খাওয়া ছিলো আমাদের কাছে ভীষণ আনন্দের একটি কাজ।

ছাদের রেংলিংয়ের দেয়ালে লাল ইটের টুকরো দিয়ে ঘষে আঁকা থাকতো ক্রিকেট খেলার উইকেট। ছাদের ওপর ওই উইকেটেই চলতো টেনিস বল দিয়ে আমাদের ক্রিকেট খেলার মহড়া।

সেই ছাদ আমাদের বৃষ্টিতে ভেজাতো, শীতের সকালে রোদ পোহানোর মধুর অবকাশ দিতো। আজকাল বহু নবীনকে প্রশ্ন করে দেখেছি তারা ছাদে বৃষ্টিতে ভেজে কি না? বেশীরভাগ সময়ই নেতিবাচক উত্তর পাই। দুপুরে অথবা বিকেলে আকাশ কালো করে বৃষ্টি এলে বন্ধুরা মিলে ছাদে ভিজতে ওঠা এক অনাবিল আনন্দের বিস্তার ঘটাতো মনে।সেই বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা লাগতো, জ্বর আসতো। কিন্তু তাতেও পিছপা হতাম না। খোলা ছাদে তুমুল বৃষ্টিতে ভেজার ব্যাপারটাই ছিলো আলাদা।

শীতকালে আমার ভীষণ একটা প্রিয় কাজ ছিলো দুপুরবেলা ছাদে রোদে গরম হতে দেয়া লেপ, বালিশের স্তুপের ওপর শুয়ে বই পড়া। স্কুলে পড়ার সময় বাড়ির লোকজনের চোখ এড়িয়ে মাসুদ রানা পড়তাম ছাদে।

ছাদ ছিলো তখন একেবারে অবসরে যাওয়া কোনো বিকেলে আমাদের আড্ডার জায়গা। পাড়ায় যে কোনো বন্ধুর বাড়ির ছাদ ছিলো আমাদের জন্য অবারিত দ্বার। কোনো বিকেলে ছাদে বসে বাদাম খাওয়া, আড্ডা দেয়া ছিলো ভীষণ প্রিয় কাজ। আর তখনই আমাদের কাছে ভালোবাসা আসতো।পাড়ার বাড়ির ছাদে আমরা গরমের দিনে ঘুড়ি উড়াতাম। আর সেই ঘুড়ি ছিলো আমাদের আকাশে উড্ডীন প্রেমপত্র। একটু দূরের বাড়ির ছাদে তখন হয়তো পছন্দের সেই বালিকাটি পায়চারি করছে। ঘুড়ির গায়ে ভালোবাসার কথা লিখে সেটাকে ফেলার চেষ্টা করতাম ঠিক ওই বাড়ির ছাদে। কখনো আকাশে অন্য ঘুড়ির সঙ্গে কাটাকাটির খেলায় অনিচ্ছায় সেই বায়ুতে ভাসমান প্রেমপত্র কেটে গিয়ে হারিয়েছে অজানায়। ছাদ থেকে ঘুড়ি ছাড়াও চলতো ইশারায় ভালোবাসা। হাত নাড়া, চীৎকার করে নানা শব্দ করা তার মনযোগ আকর্ষণের জন্য। অনেক বন্ধু এই ছাদ-প্রেমে বিজয়ীও হতো কখনো।

ছাদের গল্পগুলো আমাদের এমনই ছিলো। একটু ভাঙ্গাচোড়া, একটু নির্বিকার মেঘের মতো ভেসে চলা, খানিকটা রঙীন আর কিছুটা গোপনীয়তার বারুদ ঠাসা। সেই একান্ত ছাদও একদিন আমাদের জীবন থেকে খুব নিঃশব্দে সরে গেলো। বাড়ির ছাদ এখনো আছে। বিশাল বিশাল ফ্ল্যাট বাড়ির মাথার ওপর তারা একাকীত্ব নিয়ে ঘুমাতে যায় আর জেগে থাকে।

ছবিঃ গুগল