বিজয়ী

লাজ্বাতুল কাওনাইন

“ফারহানা গুল-ই নূর” সাংঘাতিক মগজের অধিকারী একজন নারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞান ভয়াবহ রেজাল্ট করে সরকারী বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান সুইজারল্যান্ড।  সেখান থেকে ফিরে অখ্যাত এক গ্রামে স্কুল খুলে বসেন। সেখানের প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন দীর্ঘ চল্লিশ বছর। তারপর সেখান থেকে অব্যাহতি নিয়ে এখন বান্দরবন শহরে এক পরিচিত বন্ধুর থেকে বাড়ি কিনে, বসবাস করছেন। সাথে থাকে তার নাতিন।
তার একটা পালক মেয়ে ছিলো নাম সীমানা। এই মেয়ের নামটা তিনিই দিয়েছিলেন,তাকে বড় করা, বিয়ে দেওয়া সবটাই করেছেন। তার সন্তান নিরালা যখন জন্ম নিলো, ঠিক সেই সময়টাতে সীমানা মারা গেলো। ফারহানার পালিত কন্যার স্বামী অন্যত্র সংসার বাঁধলেও নিয়মিত মেয়ে আর শ্বাশুড়ির খবর রাখেন। ফারহানা নিরালাকে কাছে রেখে দিলেন। মেয়েটা সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। সারাদিন ঘ্যানঘ্যান করে- নানুমা চলো না আমার সাথে ঢাকাতে। কিন্তু এই বয়সে ঠিক ঢাকা শহরের চাপটা তার ভাল লাগে না। ঢাকাতে তিনি খুব দরকার ছাড়া গত ছিচল্লিশ বছরে যান নি। মনে প্রাণে তিনি আসলে ঘৃণা করেন ঢাকাকে। বুঝিয়েছেন তিনি নিরালাকে,  এই মেয়ে বুঝেও বুঝে না। খালি বলে,
-হুম বুঝি তো কার না কার প্রেমে পড়ে এই চিপায় থাকবে তুমি আর আমি একা একা থাকবো। তুমি আসলে আমাকে কোনোদিনও ভালোবাসো নাই নানুমা। ফারহানাও বেশ শক্তভাবে বলে,
-সহমত।
নিরালা আরো খেপে যায়।

জীবনের অনেক চরম প্রাপ্তির মতো ফারহানার জীবনেও অনেক প্রাপ্তি আছে। যেমনঃ তার শিক্ষাজীবন, তার সীমানাকে পাওয়া আর নিরালাকে নিয়ে বেঁচে থাকা। ইদানীং প্রায়ই সে ভাবে, আর বাকিটা! সেটা নিয়ে তো সে ভাবতেই চায় না। কত ব্যস্ত রেখেছে সে নিজেকে সেই স্মৃতি ভুলে থাকবার জন্য। কিন্তু কোথাও পেরেছে। দিনরাত ব্যস্ত থেকে সামান্য সময় রেখেছিলো বিশ্রামের জন্য কিন্তু সেখানেও কখনো ভাবনা আর কখনো বা স্বপ্নগুলো আর ঘুমের সাথে প্রতিনিয়ত বেইমানি করেছে। তাই আজকাল আর পুরো হিশেব নিকেশের খাতা বন্ধ করে পুরোটা জুড়েই স্মৃতির আবর্তে ডুবে থাকে। এই অভ্যস্ত জীবনে আজকাল ভালোই তো লাগে এভাবে বাঁচতে মন্দ কি!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারহানা তখন মনোবিজ্ঞানের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, আর সায়ের মাস্টার্সের ছাত্র গণিত বিভাগের। ভালোবেসেই বিয়ে করে ফেলেছিলো। খাওয়া পড়ার ভরসা যা ছিলো সেটা সায়েরের পত্রিকা অফিসের চাকরীটা। ঢাকার কল্যাণপুরে ছোট একতলা একটা বাসার এক রুম নিয়ে তাদের সাজানো ছোট সংসার ছিলো। চারিদিকে তখন ধানের ক্ষেত। বাড়িঘর তেমন চোখেই পড়তো না তাই ভাড়াটাও নামেমাত্র ছিলো। যেনো একটা ভাড়াটিয়া থাকলেই বাড়ির মালিক বাঁচে, এমন অবস্থা!
ভালোই চলছিলো তাদের সংসার। যেই বছর সায়েরের পড়া শেষ হলো, সেই পার্টটাইম আরো একটা কাজ নিলো বাংলাবাজারে একটা প্রেসে, ফারহানা ওর লেখাপড়া চালিয়ে নিচ্ছিলো, খুব ভাল ফলাফলও করছিলো, ওদের কোল জুড়ে এলো সাফা! এই নামটা সায়ের নিজেই রেখেছিলো। মেয়ের নাম হবে তাদের দুজনের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে জড়াজড়ি করে। কাজ শেষে সারারাত জুড়ে মেয়ের সেবা করতো সায়ের। আর ফারহানা রাত জেগে পড়তো। ক্লাস করতে যাবার সময় বাড়িওয়ালা খালাম্মার কাছে সাফাকে রেখে যেতো সে। অসম্ভব ভালো এই মহিলাটা নিজে থেকে তাকে বলেছিলো, বাচ্চার জন্য যেনো সে পড়া না বন্ধ করে। বাচ্চা সে নিজে দেখবে। তাদের একটা ছেলে তখন সে বিয়ে করে প্রবাসী জীবন যাপন করতো আর বুড়োবুড়ি একাই থাকতেন বাসাতে। ফারহানার নিজের বলতে শুধু এক বড়ভাই ছিলেন, মোহাম্মদপুর বউ আর তিন সন্তান নিয়ে। বাবা মা কেউ বেঁচে ছিলেন না। বিয়ের আগ পর্যন্ত বড়ভাই এর কাছেই থাকতেন ফারহানা। আর সায়েরের বাবা মা দুই ভাই এক বোন সবাই থাকতো খুলনা। বাবা স্ট্রকের রোগী, মায়ের তাকে নিয়েই ব্যস্ততা। বড় দু’ভাই ব্যবসা করতেন আর ছোটবোনটা পড়ালেখা। এই ছিলো ফারহানা আর সায়েরের নিজস্ব পরিবার পরিচিতি!

১৯৭১ সালে সাফার বয়স ছিলো তেরো মাস। ২৫ শে মার্চ রাতে ফারহানা আর সায়ের ছিলো খুলনা তাই বেঁচে গিয়েছিলো হয়তো। কারণ যখন তারা ফিরে এলো ঢাকাতে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তখন দেখে বিকট দুর্গন্ধ, গলিত দুটো ফুলে থাকা লাশ একটা ঘরের দরজাতে, একটা বিছানাতে পড়ে আছে। তাদের বাড়িওয়ালা স্বামী স্ত্রী দুজনের লাশ। পাক হানাদার ঝাঁঝরা করে দিয়ে গিয়েছে নিরীহ মানুষ দুটোকে হাজার বাঙ্গালীদের মতো করেই।

সেই বাসাতে থাকার অবস্হা আর ছিলো ওদের। তাই যা কিছু ছিলো তাদের নিজেদের নেবার মতো নিয়ে চলে গিয়েছিলো অন্য এক বাসায় মিরপুরে। সায়ের হাজারবার বলেছিলো ফারহানাকে তুমি খুলনাতে থাকো অথবা তোমার বড়ভাই এর কাছে। এইভাবে থাকাটা নিরাপদ না। ফারহানা খুব একগুঁয়ে ছিলো। সায়েরের সাথেই থাকবে। সাফাকে নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকতো সায়ের। ফারহানাকে খুব একটা চিন্তিত লাগতো না। সে প্রায় বলবে,
-আহা সায়ের! যা হবার হবে, এতো কেনো ভাবো বলো তো। আমরা এক সাথেই থাকবো। যা হবার একসাথেই হবে। কি আর! শেষতক মরণ তো। নাহয় একসাথেই তিনজন মারা যাবো। কিন্তু চোখের আড়াল হয়ে অন্য কোনো পরিণতি আমি মেনে নিতে পারবো না। হারিয়ে, ধুঁকে ধুঁকে বাঁচার মতো কষ্টের জীবন আমি চাই না!
অদ্ভুত সব যুক্তি ফারহানার। সায়ের এমনিতেই কথা খুব বলে তাই বেশি তর্কে যায় নি,শুধু বলেছিলো,
-ফারহানা আমি যতো লুকিয়ে খবর আদানপ্রদান করি না কেনো মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তুমি ভালো করেই জানো, পাকিস্তানি রাজাকার আর সেনাদের কাছে আমি কালো তালিকাভুক্ত। আমাকে ওরা আজ হোক নয়তো কাল ধরবেই। আর তোমরা দু’জন আমার দূর্বলতা। তোমাদের ধরলে আমাকে ব্লাকমেইল করে খবর বের করা সহজ হবে। আমি দ্বিধান্বিত হতে পারি। তোমাদের নিরাপদে রাখাটা আমার জন্য না,শত শত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য জরুরি, এটা তো বুঝবে নাকি?
-হাহাহাহা! খুব অট্টহাসি দিয়েছিলো ফারহানা। আরে বাবা কি ভাবুক জামাই আমার। শোনো এটা কোনোই ব্যাপার না।
এই বলে সে একটা কালো ছোট বোতল নিয়ে এলো হাতে করে। ছোট সাফা, সায়েরের বুকে ঘুমিয়ে আছে। সায়ের মেয়েকে জড়িয়েই উঠে বসলো।
-এটা কি?
-পটাশিয়াম সায়ানাইড!  আমার বন্ধু কালামকে তো চেনোই, ওকে দিয়ে জোগাড় করেছি। ও অবশ্য যুদ্ধে চলে গিয়েছে। যাবার আগে দেখা করতে এসেছিলো, তখন ওর থেকেই নিয়ে রেখেছিলাম। জানো তো ওর কাছে আরো অনেক বোতল আছে।
-হুম! এটা দিয়ে তুমি কি করবে?
– বাহ্! তোমরা ছেলেরা কতভাবে যুদ্ধ করছো আর মেয়েরা বসে বসে শুধু কি ভয়ে অস্থির হবে আর কাঁদবে ভেবেছো? তারাও কত উপায় জানে যুদ্ধের। তোমাদের জানাই নেই।
-ওহো তাই নাকি! হেসে দিলো সায়ের। তা শুনি জনাবা আপনার কি কি উপায়?
-এই ধরো আমি যে তোমার পাশে আছি সাহস করে এটাও তো যুদ্ধ, ঠিক না?
-অবশ্যি ফারহানা। মিথ্যে বলবো না। আমার খুব শান্তি লাগে সারাটাদিন একবার হলেও যখন ভাবি, বাড়ি ফিরে আমি তোমাদের দেখবো। আর যা হচ্ছে সেটা আমার মেয়ের সুন্দর ভবিষ্যৎ এর জন্য, তখন আমার কাজের আগ্রহ আরো বাড়ে। সাহসে বুক ভরে যায়। কিন্তু এই বোতল?
-হুম! এটা আমি রেখেছি যদি তুমি ধরা পড়ে যাও তো আমি সাথে সাথে সাফাকে কোথাও লুকিয়ে, এই বিষ খেয়ে ফেলবো। কোথায় লুকাবো সেটাও ঠিক করা আছে। তাই তুমি নিশ্চিত থাকো, যুদ্ধ এ আমরা জিতবোই আর আমাদের সন্তানেরা জানবেই এর কতটা মূল্য।
প্রচন্ড আবেগে সায়ের, ফারহানাকে জড়িয়ে নিলো। আর সাথে সাথেই সাফা জেগে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে বাবা আর মা দু’জনকেই দেখছে। আর ওরা খুব হাসছে আর সেটা বিজয়ের হাসি অবশ্যি অবশ্যি!

১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১! বিকেল প্রায়, বেশ তাড়া করেই সায়ের ফিরলো বাসায়।
-ফারহানা বেশ ভাল একটা খবর আছে রে ভাই! আমরা বোধহয় পেয়েই যাচ্ছি আমাদের জয়!
-তাই! আমারও তেমনটা লাগছে। ইসস!  সেই দিনটাতে কত কি যে করবো সায়ের। আমি সারাটাদিন বাসায় বসে অস্থির। আমরা স্বাধীন দেশে, একসাথে ঘুরবো, বেড়াবো,আনন্দ করবো আর আমার পড়ালেখাটাও শুরু করে দিবো।
-অবশ্যি ফারহানা! তবে এবার একটা কথা মন দিয়ে শোনো। খুব তাড়াতাড়ি তোমার কিছু মোটা  কাপড়, আর সাফার মোটা কাপড় সাথে ওর খাবার গুছিয়ে ব্যাগে ভরে ফেলো।
-মানে? আমরা কোথাও যাচ্ছি।
-হম!  আমরা না তোমরা! মানে তুমি আর সাফা।
-না!
-ফারহানা আমি পুরোটা তোমার জিদ শুনেছিলাম কিন্তু, শুধু দু’চার দিন আমার কথা শোনো। পাক আর রাজাকারগুলো শেষ ছোবল দিবে একটা পুরো দেশ জুড়ে। ঢাকাতে তো বেশি। উড়াধুরা মারবে লোকজনকে আর তালিকাভুক্তদের আগে। তোমাদের আমি নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেও কোথাও আশ্রয় নিবো। প্রায় যুদ্ধ শেষ এখন দরকার যার যার নিরাপদ আশ্রয় বেঁচে থাকার জন্য,ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে পুরো পৃথিবীকে জানানোর জন্য,সব সত্যি ঘটনাগুলো। এটাও কিন্তু যুদ্ধের অংশ ফারহানা।
-কোথায় যাবো? আর সাফার শরীরটাও তো ভালো নেই। বেশ জ্বর আর সাথে ডায়রিয়ার মতো খানিকটা!
-কিছু করার নেই। রাত একটায় একটা ট্রাকে তুলে দিবো আমি তোমাদের সেটা মুক্তিযোদ্ধারা পাহাড়া দিয়ে সীমান্তের ওপারে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাবে। আমি নিজে গিয়ে তোমাদের সেখান থেকে নিয়ে আসবো,দেশ স্বাধীন হলে কথা দিলাম। মাত্র ক’টা দিন

খুব কষ্ট আর কান্না পাচ্ছিলো ফারহানার তবু দমে রইলো, এখন তো কান্নার সময় না, সামনে বিজয় আর তখন জড়াজড়ি করে কান্না করে সবটা উসুল করে নিলেই হবে। এটা কারো দূর্বল হওয়া মোটেও চলবে না।

রাত প্রায় চারটা, কড়া আঁধার,প্রচণ্ড কুয়াশা, হাড় কাঁপানো শীত আর খোলা আকাশের নীচে দিয়ে সাঁই সাঁই করে ট্রাক ছুটেছে। কত জন, কারা কারা যে আছে ট্রাকটিতে বুঝার উপায় নেই, তবে সবার একটাই উদ্দেশ্য বেঁচে থাকা। কে, কি পরিচয়, কোন ধর্মের, কেমন বয়স,কার কতটা ক্ষতি, লাভ কোনো কিছু করার প্রয়োজন আজ নেই। সমগ্র একটা বাংলাদেশ আজ এই ট্রাকটিকে প্রতীক হিশেবে নিলে খুব একটা ভুল হবে না। খুব চাপাচাপি করে বসে আছে সবাই। কোনো বিরক্তি নেই আছে শুধু ভয় আর আশংকা ধরা পড়ে যাবার। শুধু মাঝেমাঝে সাফা কেঁদে উঠছে আর একটা কিশোরী মেয়ে বোধহয় কোথায় ব্যথাতুর হয়ে গোঙ্গানীর মতো আওয়াজ করছে…”মা গো, মা”! সবাই তখন আরো ভয় পাচ্ছে না জানি এই শব্দ, ওৎ পেতে থাকা পাক সেনা বা রাজাকারদের কানে পৌঁছে।

ভোর পাঁচটাতে সবার দোয়া বা অভিশাপেই হোক। প্রচন্ড জ্বর উঠে সাফা মারা গেলো,চলন্ত ট্রাকে মায়ের বুকেতেই। ফারহানা কাঁদছে না,জানে তো এটাও যুদ্ধ আর তার মেয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো। এক বুড়ো মতো মানুষ তার পাশে বসা ছিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে আস্তে আস্তে বললো,
-মাগো! ওইপাড়ে গিয়ে বাচ্চাটার জানাযা আর দাফন করবো আমরা সবাই মিলে। পুরো ট্রাক ভরা মানুষ নিস্পলক চেয়ে আছে সাফার গর্বিত মায়ের দিকে কিছুটা অবাক হয়ে। খুব যত্ন করে নিজের একটা লাল টুকটুকে শাড়ি দিয়ে জড়িয়ে নিলো সাফাকে। মাথাতে ঘোমটার মতোও খানিকটা দিলো। এই শাড়িটা সায়ের প্রথম তাকে উপহার দিয়েছিলো। আস্তে উঠে দাঁড়ালো সে। চারিদিকে সবুজ মাঠ আর মাঠ। কি দারুণ সেই দৃশ্য। হঠাৎ ই ফারহানা সেই সবুজ মাঠে ছুঁড়ে দিলো লাল টুকটুকে সাফাকে। হয়ে গেলো তো  সবুজ মাঠ আর সাফা জড়াজড়ি করে একটা পরিপূর্ণ বাংলাদেশ।

ফারহানা এই দেশের মাটির সাথেই মিশিয়ে দিতে চেয়েছিলো সাফাকে। কেনো অন্য কোথাও বিলীন হবে তার যোদ্ধা কন্যাটি। তাকিয়ে থাকলো যতোটা সময় সাফা ছোট হতে হতে চোখের শেষ বিন্দুতে পরিণত না হয়, ঠিক আঁকাবাঁকা পথের মাঝে সাফা যখন আড়াল হলো তার মায়ের,এমন সমটাতে ওই কিশোরী মেয়েটা জোরে আর্তনাদ করে উঠলো,
-ওওওওও মা মা মা মা মাগোওওও….
চৌদ্দ কি পনেরো বয়সের একটা কিশোরী, পাকসেনাদের অপবিত্র বীর্য নিজ ওরসে ধারণ করে আজ এক পরিপূর্ণ পবিত্র আত্মার জন্ম দিতে চলেছে, জন্ম হতে চলেছে একটা পবিত্র যুদ্ধশিশুর। কিশোরীর মায়ের হাতে শাখা, কপাল জুড়ে সিঁদুর ল্যাপ্টানো। মেয়েকে শক্ত করে ধরে আছেন।

জন্ম নিলো সীমানা। কি তার পরিচয়, কি তার ধর্ম কারো জানার দরকার নেই। আরেক মুক্তিযোদ্ধার জন্মের লাল সূর্য আজ গর্বিত, সাফার মৃত্যু,সীমানার জন্ম আর পনেরো ডিসেম্বর এর সূর্যোদয় এক সাথেই প্রায় ঘটে গেলো অলৌকিকভাবে। সাক্ষী ফারহানা, সাথে পুরো বাংলাদেশ। হিন্দু পরিবারটা ভেবেছিলো জারজ সেই সন্তানটিকে ট্রাক থেকে ছুঁড়ে দিবে, কিন্তু ফারহানা সেটা হতে দেয়নি।

ট্রাকটা যখন খানিক বিরতি দিতে সীমান্তবর্তী গ্রাম নামাজীপাড়াতে থামে, সে আর দেশ ছেড়ে যায় নি। বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে জানিয়ে দেয় সে যাবে না ওইপাড়ের আশ্রয়কেন্দ্রে। সময় ছিলো না কারো হাতে ওকে বুঝানোর, তাই ট্রাক চলে গেলো ফারহানা আর সীমানাকে ফেলে। কোনো রকম সেই গ্রামটাতে ক’ঘন্টা কাটানোর পরই পুরো বাংলাদেশ জানতে পারলো আজ ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১! দেশ স্বাধীন আর কোনো বাঁধা নেই, মুক্তি মুক্তি মুক্তি।

শুধু মুক্তি মেলে নি ফারহানার। ঢাকাতে সীমানাকে নিয়ে ফিরে জানতে পারে ১৪ ডিসেম্বর, পত্রিকা অফিস থেকে বেশ কজনকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়, তার ভিতর সায়ের ছিলো। আর খুঁজার দরকার মনে করে নি ফারহানা। বড়ভাই এর কাছে চলে যায় সীমানাকে নিয়ে, এরপর জীবন চালিয়ে নেওয়া। শুধু প্রতিরাতে সায়ের আর সাফা আসে তার কাছে। সেই সুন্দর সায়ের আর ছোট্ট সাফা। তারা একে অপরকে জড়িয়ে মজা করে, হাসে, কাতুকুতু খেলে আর হাসতে হাসতে ফারহানার চোখে জল এসে পড়ে। স্বপ্ন ছুটে বা ভাবনা যেটাই হোক না কেনো, ফারহানা দেখে জলে ওর বালিশ আর ছড়ানো ধূরস চুল গুলো ভেজে জবজবা….কোথায় ওরা আর যুদ্ধ কি শেষ?  ঠিক কিছুই ঠাওর করতে পারে না ফারহানা খানিকক্ষণ!

ছবি: গুগল