“আই ওয়াক ইন রেইন , বিকজ নো ওয়ান ক্যান সি মি ক্রাইং।” কী অসাধারণ আহত বাক্যাবলী গেঁথে তোলে মানুষের শ্বাশ্বত বেদনার ঘরবাড়ি।চার্লি চ্যাপলিনের এই উক্তি জীবনকে ব্যাখ্যা করে দর্শনের উচ্চতায়। কান্না তো এভাবেই মানুষের মনের গোপন ঘরে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করে বসে থাকে। খুব খুব শীতের ভোরে মাকড়সার জালের গায়ে যেরকম শিশিরের ফোঁটা জমে থাকে ঠিক তেমনি মানুষের মনে, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার মধ্যে লুকিয়ে থাকে কান্নার পুকুর।
রবীন্দ্রনাথ তো বলেই গেছেন তাঁর গানে সেই অশ্রুনদীর সুদূর পারের কথা। সেই সুদূর পারে কে থাকে? কার ঘাট দেখা যায় সেই সুদূর পারে? কখনো বুক ভেঙ্গে যাওয়া শোকে, কখনো গভীর বিষাদে আবার কখনো আলোকিত আনন্দে মানুষের মনের মধ্যে সেই অশ্রু নদীতে ঢেউ ওঠে, চোখ দিয়ে উপচে পড়ে অশ্রুবিন্দু। উর্দূ শায়েরীর কয়েকটি লাইন এখানে তুলে না দিয়ে পারছি না।‘‘চুল এলিয়ে ভাঙ্গা কবরের পাশে বসে যখন কোন সুন্দরী আকুল হয়ে কাঁদে তখনই আমার মনে হয় পৃথিবীতে মৃত্যুর মতো এমন সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না।’’
কান্নার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের মানব জীবন। সব হারানোর শোক থেকে শুরু করে প্রাপ্তির আনন্দ-সবখানেই কান্না থাকে সঙ্গী হয়ে।
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই অশ্রু-কথা, কান্নার সদর-অন্দরের খোঁজ।

হাসি যেমন মানুষের মনের আবেগের শক্তিশালী প্রকাশ ঠিক তেমনি কান্নাও। যতোই চার্লি চ্যাপলিন বলেন, বৃষ্টির ভেতর দিয়ে হাঁটতে চান নিজের কান্না লুকাবেন বলে কিন্তু কান্না লুকিয়ে রাখা কঠিন। বুকের ভেতরের এই রক্তক্ষরণ রাত্রির আকাশে ফুটে ওঠা নক্ষত্রের মতো কুয়াশা ভেদ করেও ফুটে ওঠে। কান্না আসলে মানুষের মনের বিশেষ অবস্থার প্রকাশক।
মানুষ কখনো কান্নাকে লুকিয়ে রাখতে চায়। সাধারণ ধারণা হচ্ছে পুরুষরা কখনো কাঁদতে পারে না। কারণ সেটা দূর্বলতার পরিচয় বহন করে। সেজন্য পুরুষরা কান্না লুকাতে চায়। অন্যদিকে ছিচকাঁদুনে বলে মেয়েদের দুর্নাম আছে। বলা হয়ে থাকে মেয়েরা কথায় কথায় কেঁদে ফেলে। অশ্রু দিয়ে কাজ উদ্ধার করতে চায়। কিন্তু কান্না কি এমনই সরল সংজ্ঞায় পড়ে? বিজ্ঞানের ভাষায় যদি বলি, কান্নার তিনটি লেয়ার বা স্তর আছে; প্রথম স্তরের নাম লিপিড লেয়ার, কান্নার তিনটি লেয়ার বা স্তর থাকে: প্রথমটি লিপিড লেয়ার, দ্বিতীয়টি অ্যাকিউয়াস লেয়ার তৃতীয় লেয়ার হচ্ছে মিউকাস লেয়ার। মজার ব্যাপার হচ্ছে কান্নার উপাদান আর মানুষের মুখের লালার উপাদানের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।
কান্না অথবা চোখের জল পৃথিবীর যে কোনো সাহিত্যেরই গুরুতর এক অংশ। কবিতায় নারীর চোখের জল নিয়ে কবিরা রীতিমত বেদনার মিনার তৈরী করেছেন। শ্রী কৃষ্ঞের জন্য রাধার ভালোবাসার ক্রন্দন তো এখন শুধুই কবির কল্পনা বলে মনে হয় না।পশ্চিমা সাহিত্যেও আমরা চোখের জলের গভীর ভূমিকা দেখতে পাই। কাঁদে শেক্সপীয়ারের নায়িকা জুলিয়েট, হ্যামলেটের জন্য কাঁদে ওফেলিয়া। জন কিটসের কবিতার লাইনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রেমিকা ফ্যানি ব্রাউনের জন্য ব্যক্তিগত কান্নার দাগ। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কান্না আমাদের মস্তিষ্কের এন্ডোরফিনের নিঃসরণকে উদ্দীপিত করতে পারে, যা ভালো অনুভব করার হরমোন এবং ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। কান্নার ফলে শরীরে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা কমে। ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা বেশি হয়ে গেলে শরীর এবং মন ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। কান্না মানুষের মনকে বাজে অনুভূতি থেকে মুক্তি দেয় এবং কোনো সমস্যা সম্পর্কে পরিষ্কার ভাবে ভাবনার রাস্তা তৈরী করে। চিকিৎসকরা বলেন, কাঁদলে মানুষের শরীর থেকে স্ট্রেস হরমোন বের হয়ে যায়। আর সেজন্যই বোধ হয় বলা হয় কাঁদলে মন হালকা হয়।
বৃষ্টির সঙ্গে কান্নার কি কোনো যোগ আছে? যোগ আছে বিষাদের? ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষাকাল একটু বেশীই আবেগপ্রবণ করে তোলে আমাদের মনকে। কবি কালীদাস বর্ষার মেঘ দেখেই দূরে থাকা প্রেয়সীর জন্য প্রেমকাব্য রচনা করেছিলেন। বর্ষার ধারা আমাদের মনকে বিষাদাক্রান্ত করে তোলে। দিগন্ত আচ্ছন্ন করা মেঘ আর বৃষ্টির কাল হয়তো মনের মধ্যে পুঞ্জীভূত করে মৃত কোনো বেদনা মাধুরীর কণাকে। আর সেখান থেকেই অপ্রাপনীয়র জন্য মন কেমন করে চোখের কোণ ভরে ওঠে কান্নায়। এই কান্নার অবশ্য কোনো অর্থ নেই বিজ্ঞানের কাছে। মানুষের দুঃখবোধের একটা নিজস্ব রূপ আছে। আর সেই বোধের বাহ্যিক প্রকাশ হচ্ছে কান্না। মনোবিজ্ঞান বলে, একজন মানুষ যখন মানসিক ভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে, ভোগে নিরাপত্তাহীনতায় তখনই সে কাঁদে। অনেকে মনে করেন মনের এই ভঙ্গুর অবস্থা গোপন করে রাখাই ভালো। এও এক ধরণের দূর্বলতার প্রকাশ। কিন্তু মনোবিজ্ঞান জানাচ্ছে, মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষই তাদের দুঃখের আবেগকে প্রকাশ করতে ভয় পায় না। চূড়ান্ত আবেগকে মনের মধ্যে গলা টিপে হত্যা করার মাঝে বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ নেই। এই চেপে রাখা মনের মধ্যে তৈরী করে, স্ট্রেস, উদ্বেগ আর অনুশোচনা। এই অনুভূতিগুলো জন্ম দিতে পারে গভীর মানসিক রোগ।
একজন প্রপ্তবয়ষ্ক নারী তার জীবনে কাঁদে ৪,৬৮০ বার যা একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক পুরুষের কান্নার দুই গুণ। কী কারণে তারা কাঁদে? বই, সিনেমা অথবা কোনো টেলিভশন ধারাবাহিক? উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ, তাদের কান্নার পেছনে এমন সব কারণ যুক্ত আছে। পাশাপাশি আছে প্রেম ও বিচ্ছেদ। সম্প্রতি এক গবেষণায় এরকম তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় আরো জানা গেছে, একজন নারী মাসে প্রায় ৬ বার অশ্রু বিসর্জন করে। উল্টোদিকে একজন পুরুষ মাসে গড়পড়তা কাঁদে ৩ বার। তবে গবেষণায় যে দিকটি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করার মতো তা হচ্ছে প্রায় ৪০ শতাংশ নারী আনন্দেও কেঁদে থাকেন। উল্টোদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে আনন্দে অশ্র বিসর্জনের পরিসংখ্যানটি হতাশাব্যাঞ্জক। মাত্র ২৪ শতাংশ পুরুষ আনন্দে কাঁদে।
কান্না আবার লিঙ্গ ভেদে হেরফের হয়। মানুষের মনের আবেগের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রোল্যাকটিন নিঃসরণের পরিমাণ পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে বেশী। তাছাড়া নারীর তুলনায় পুরুষদের অশ্রু ধারণকারী নালী বড় হওয়ায় কান্না ওই নালী উপচে বাইরে আসতে সময় বেশী নেয়।তাই হয়তো ছেলেদের কাঁদতে কম দেখা যায়।
নারীর কান্না বড় রহস্যময়। তাদের কান্না নিয়ে লেখা হয়েছে গল্প, কবিতা আর গান। কখন, কীভাবে নারীর চোখ টলমল করে উঠবে কান্নায় আর কখন তা একবিন্দু মুক্তার মতো ঝরে পড়বে পৃথিবীর ঘাসে তা নির্ণয় করা ভীষণ কঠিন। নারীর কান্নার রহস্য ভেদ করতে মনোবিজ্ঞানীদের ক্লান্তি নেই। আর তাদের গবেষণায় অনেক সময় বের হয়ে চমকপ্রদ তথ্য। এমনি এক তথ্য হচ্ছে, প্রিয় পুরুষটির সঙ্গে যৌনক্রীয়া শেষ করে বহু নারী পরম সুখে না হেসে কেঁদে ফেলে। সেক্সুয়াল মেডিসিন জার্নালে এই কান্নার গালভরা একটা নাম আছে-পোস্ট সেক্স ব্লুজ’। চিকিৎসা বিজ্ঞান এই আবেগকে এক ধরণের অসুখ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলছে এর নাম ‘পোস্ট কইটাল ডিসফোরিয়া সংক্ষেপে পিসিডি। এরকম তৃপ্তিদায়ক সময়ে নারীরা কাঁদে কেন? এই অদ্ভূত মনের অবস্থার পুরোটা ব্যখ্যা করতে পারেনি বিজ্ঞান। তবে বলছে, এসময় নারীরা নিজেদের দুর্দশাগ্রস্ত বলে মনে করে। এরকম সময়ে কান্না বলে দেয় এই ধরণের নারীরা বিষন্নতা বোধ আর আগ্রাসী মনোভাবের শিকার। তাদের মনের মধ্যে নানা ধরণের আবেগ নানা ভাবে শক্তিশালী হয়ে প্রভাব বিস্তার করে।
এতো সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে আমাদের কাজ নেই। আমরা কেবল কান্নার কথাই বলতে এসেছি। যে কান্না তীব্র বিচ্ছেদের বেদনায় বর্ষা হয়ে নামে, যে কান্না ফিরে পাওয়ার আনন্দে ঝরে হাসির ঝর্ণা হয়ে।নানা অভিব্যাক্তির কান্না আমাদের এক জীবনে জড়িয়ে থাকে নানা ভাবে।তবে কান্না বড় একা থাকে মানুষের মনের মাঝে।প্রত্যেকটি মানুষের মনে একটি একলা কান্নার স্নানঘর থাকে। সেখানে শোকে, বেদনায়, হারানোর যন্ত্রণায় একজন মানুষ নিজেকে সমর্পণ করে কান্নার কাছে। যন্ত্রণার পাথর ফেটে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। সে অশ্রুর নাম আজো কোনো বিজ্ঞান দিতে পেরেছে কি না জানা নেই।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল