দিল্লি শহরে…

কাকলি পৈত

জীবনের অনেকগুলো বছর অতিবাহিত হল দিল্লি শহরে। বিয়ের পর নতুন জীবন শুরু হয়েছিল এই শহরের বুকে।জীবনের নানা ওঠাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শহরের ও নানা পরিবর্তন আধুনিকিকরণ হয়েছে।এ শহরে যখন এসেছিলাম তখন লোকজনের এত ভীড়ভাট্টা, যানজট, গাড়ির প্রাচুর্য, মেট্রো শহরের যাবতীয় সুবিধা ছিলনা।শহরের আকাশে বাতাসে ইতিহাসের চেনা গন্ধে  শহরটাকে খুব রোমাঞ্চকর মনে হত।ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই শহরের গুরুত্ব অপরিসীম।তাই ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা শহরটার বুকে যখন পা রাখলাম তখন মনে হল কত প্রভাবশালী প্রতাপশালী রাজা সুলতান বাদশা এই শহরের বুকে সদর্পে রাজত্ব করে গেছেন, তাদের সে অহংকারের দীপ্তি আজও কীভাবে যেন  শহরের প্রতিটি স্থাপত্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে,মানুষজনের মধ্যে, শহরের ছবির মাঝে স্বমহিমায় অক্ষুণ্ণ আছে।
যমুনার তীরে ভারতের রাজধানী দিল্লি বিভিন্ন ভাষা ও জাতির মানুষকে নিয়ে একটি বহুজাতিক শহর। ভারতের দ্বিতীয় জনবহুল রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও বানিজ্যিক কেন্দ্র।ইতিহাসে অধিকাংশ সময়ধরে দিল্লি বিভিন্ন রাজ্যের সাম্রাজ্যের রাজধানী।বৈদেশিক শত্রুরাও বারবার এই  ভারত আক্রমণ করেছে এই শহরকে অধিকার করতে চেয়েছে, লুণ্ঠন করেছে।১১৯২ সালে  মহম্মদ ঘুরী পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে উওরভারতের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করে সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবককে তার শাসনভার দেন।তার আমলেই  নির্মান কাজ শুরু হয় দিল্লির কুতুবমিনারের। মহম্মদ-বিন – তুঘলকের সময় তা শেষ হয়।এরপর তিনশ বছর দিল্লিতে তুর্কী আফগান লোদী, খিলজী, তুঘলক,সৈয়দবংশের সুলতানি সাম্রাজ্য কায়েম থাকে। ১৫২৬ সালে বাবর ভারত আক্রমণ করে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে  সর্বশেষ লোদী সুলতানকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় তিনশো বছর এরা দিল্লির বুকে রাজত্ব করেন। মুঘল শাসকদের আমলে স্থাপত্য শিল্পকলার যথেষ্ট উন্নতি হয়। সম্রাট শাহজাহানের তৈরী যমুনার তীরে সুবৃহৎ লাল কেল্লা  একটি রাজকীয় ভবন যা মুঘল স্থাপত্য ও চিত্রকলার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।  এর অন্দরে দেওয়ান-ই-খাস  ব্যক্তিগত সভাসদদের সঙ্গে আলোচনার জায়গা যেখানে সম্রাট  কোহিনুর মণিযুক্ত মণিমাণিক্য খচিত ময়ূর সিংহাসনে আরোহণ করতেন। যা পরবর্তীতে পারস্যের নাদির শাহ কতৃক লুণ্ঠিত হয়।দেওয়ান-ই-আম ও জনসাধারণের অভিযোগ স্হল যেখানে মণিমাণিক্য খচিত একটি মার্বেল পাথরের সিংহাসনে বসে  সম্রাট সকলের  অভিযোগ শুনতেন। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।UNESCO র বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্হানগুলোর একটি এটি।

দিল্লিতে দ্রষ্টব্য স্হান বা  ঘুরে ফিরে আসার জায়গা এত আছে যে সংক্ষিপ্ত পরিসরে তা লেখা সম্ভব না। রাইসিনা হিলের ওপর অবস্থিত রাষ্ট্রপতি ভবন ও অদূরেই সংসদ ভবনের স্থাপত্যকলাটি অসাধারণ।পর্যটকদের জন্য রোজই খোলা থাকে রাষ্ট্রপতি ভবন। অবশ্যই বাইরে থেকে দেখার জন্য।এই ভবনের পিছনেই আছে মুঘল গার্ডেন। ফেব্রুয়ারী মাসে পনের  দিনের  জন্য এটি খোলা থাকে সর্বসাধারণের জন্য। নানা প্রজাতির ফুল ফল, ২৫০  প্রজাতির গোলাপে সাজানো এই বাগান সারাজীবন মনে রাখার মত।এর অদূরেই ইন্ডিয়া গেট, ভারতের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের একটি।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ভারতীয় জওয়ানদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত স্মৃতিসৌধ।নিহত সেনাদের সম্মানে অমর জওয়ান জ্যোতি প্রজ্জ্বলিত আছে। ইন্ডিয়াগেটের বিস্তৃত পরিসরে গ্রীষ্মকালে সান্ধ্যভ্রমণ আর শীতকালে সারাদিন জনসমাগম থাকে।

আরেকটি ভালো লাগার জায়গা হল লোটাস টেম্পল।নবীন ধর্ম বাহাই যা সব ধর্মকে  স্বাগত জানায় তাদের উপাসনালয়। সবচেয়ে  সুন্দর ফুল পদ্মের আদলে মন্দিরটি নির্মিত যা পবিত্রতার প্রতীক।ন’টি  জলাশয় দ্বারা বেষ্টিত এই মন্দিরকে প্রাকৃতিক উপায়ে ঠান্ডা রাখা হয়।দিল্লি শহর ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধন।একদিকে  বাবর পুত্র হুমায়ূনের সমাধিক্ষেত্র যা মুঘল স্থাপত্যকলার নিদর্শন  এবং unescoর বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী  স্হান। সমাধি চত্বরের বিস্তৃত বাগিচা যা পারসিক বাগিচার আদলে তৈরী।অন্যদিকে তেমনি আছে অক্ষরধাম স্বামীনারায়ণ মন্দিরের আধুনিক স্থাপত্য।এককথায় অসাধারণ।
ভারতের বৃহত্তম মসজিদ শাহজাহান কতৃক নির্মিত জামা মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও নকশার কারুকার্য অসাধারণ।এছাড়া national science museum,  rail museum.মহারাজা জয়সিংহের তৈরী যন্তর মন্তর ,dolls museum. শহরের প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেস,দিল্লি হাট রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বিপনন কেন্দ্র।প্রতিটি জায়গাই পর্যটকদের  জন্যে আকর্ষণীয়। যমুনার তীরে বিস্তৃত সমাধিক্ষেত্র যেখানে গান্ধীজী থেকে শুরু করে  ইন্দিরা গান্ধী সকলের বাগিচা শোভিত সমাধিস্থল রয়েছে যা রাজঘাট,বিজয়ঘাট,শক্তিস্হল  শান্তিবন নামে পরিচিত।বিদেশি অতিথিরা এলে এখানে আসেন শ্রদ্ধানিবেদনের জন্য।

দিল্লিা কখনোই একঘেয়েমির শহর নয়।বিনোদনের যথেষ্ট উপকরণ ছড়িয়ে আছে শহরের  আনাচে কানাচে।নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলার আয়োজন সারাবছরই হয়ে থাকে।এছাড়াঅসংখ্য শপিং মল স্ট্রিট মার্কেট হকার দের কাছ থেকে মন ভরে কেনাকাটা করার মত জিনিসের প্রাচুর্য এখানে অবশ্যই আছে।রাজা বাদশাহর আমল থেকে আজকের দিল্লি আমূল
পরিবর্তিত ,আধুনিক। মেট্রো পরিষেবা দিল্লি ও তার পাশ্ববর্তী অঞ্চল গুলোর মধ্যে দ্রুত যাতায়াত ব্যবস্থা ও যানজট থেকে রেহাই পাওয়ার ব্যাপারে অনেকখানি সাহায্য করেছে। দিল্লির সবচেয়ে জনপ্রিয় যাতায়াত মাধ্যম মেট্রো।নারীদের নিরাপত্তা বা পর্যাবরন প্রদূষনের
মত কিছু গুরুত্বপূর্ণ  সমস্যা থাকলেও ভবিষ্যতে হয়ত সরকারী হস্তক্ষেপে কিছুটা হলেও সমাধান সম্ভব হবে।কোন রাজনৈতিক সোরগোল বা রাজনৈতিক হিংসা  কথায় কথায় বন্ধ বা ধর্মঘট  বা রাজনৈতিক মিছিল এখানকার মানুষ কোনদিন ও দেখেনি।সন্ত্রাসবাদী কিছু  ঘটনা ঘটলেও শক্ত হাতে তার মোকাবিলা করেছে দিল্লি।কথায় বলে ‘দিল্লি দিলবালো কি’ ।সত্যি এই শহরের প্রাণবন্ত মানুষের সঙ্গে পায়ে  পা মিলিয়ে চলতে  চলতে কখন এই শহরটা নিজের হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি।সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে সব উৎসবে সাড়ম্বরে সামিল হওয়া সেটা বোধ হয় আমার শহর দিল্লিতেই সম্ভব।

ছবি: গুগল