আমার দেখা শ্রীদেবী

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী সেনগুপ্ত

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

শ্রীদেবীকে আমি একটুও ভালোবাসতাম না। বাসার কথাও নয়। আমার ছোটবেলায় আমাদের রজনীকান্ত-দ্বিজেন্দ্রলাল-অতুলপ্রসাদ-রবীন্দ্রনাথ আকীর্ণ উন্নাসিক ঘরগেরস্থালিতে কোথাও উনি ছিলেন না। হিন্দী সিনেমা দেখা তো দূর কি বাত, নামোচ্চারণ করাও ছিল রীতিমতো ট্যাবুর বিষয়। আমার থেকে খুব বেশি বড় নন, নায়িকার ছোটবোনের ভূমিকায় ‘জুলি’ -তে যখন প্রথম দেখা দিলেন, সবে হামাগুড়ি দিতে শিখেছি বোধহয়।’সোলওয়া সাওয়ান’ এ ইশকুলে যেতে শুরু করেছি। আর ‘সদমা’-র সময়ে আমার কাছে একমাত্র ‘গোপন’ প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদন বলতে শুক্রবার আকাশবাণীতে রাত্তির আটটার নাটক, বড়রা যেটা শুনবে বলে ওইদিন আমার সন্ধ্যের রীতিমাফিক ‘পড়তে বসা’-র সময়টা এগিয়ে আনা হত, পৌনে আটটা মধ্যে খাইয়ে শুইয়ে দিয়ে তবে সব্বাই ঢাউস রেডিওটার সামনে, আর আমি ,কান খাড়া করে মটকা মেরে শুনতাম, তৃপ্তি মিত্র- শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায় , জগন্নাথ বসু-ঊর্মিমালা বসু, যতক্ষণ না ঘুম আসে।ওইটুকুই।চিরকেলে অকালপক্ক আমি, বড় হয়ে ওঠার প্রসেসে তখনো পর্যন্ত কোনো রূপোলি পর্দার মানুষকে ফ্যান্টাসাইজ করার কথা সুদূর কল্পনাতেও ছিল না। আরো একটু বড় হলাম যখন, নাইন-টেন নাগাদ, একজন, মাত্র একজনই, সেই দুর্গের দেওয়াল ভেঙ্গে অল্প একটু মুখ বাড়িয়েছিলেন, ঠেকাতে পারিনি, তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আর ভালোবাসা বলুন, আর ভক্তিই বলুন, আমি বরাবরই ভারি মোনোগ্যামাস 😜😜😜।

বন্ধুরা অনেকেই ছিল শ্রীদেবীর নামে অজ্ঞান। ছেলেরা বিশেষ করে।আমি তখনো পর্যন্ত কোনো সিনেমা দেখিনি ওনার।পোস্টার, খবরের কাগজের সিনেমার পাতা ইত্যাদিতে দেখতাম মুখটা। আমার আবার খুব একটা আকর্ষণীয় লাগতো না; পুতুল পুতুল, মুখমণ্ডলে বুদ্ধির আলো একটু কম, পরিশীলনের একটু অভাব বলে মনে হত। মাধ্যমিকের পর নাকতলায় কাকুর বাড়িতে ছুটি কাটাতে গেছি। খুড়তুতো বোন আবার শ্রীদেবীর ফ্যান। ওরই পীড়াপীড়িতে ভিসিআরে দেখলাম পরপর বেশ ক’টা সিনেমা… সদমা, চালবাজ, চাঁদনী, মিস্টার ইন্ডিয়া, লমহে। এক ঝটকায় বড় হয়ে গেলাম শামুকখোলের ভেতরের আমি।

পানপাতার মত মুখ, বাঙ্ময় চোখ,শুধু চোখ আর ঠোঁটের ভঙ্গিমায় এত কথা বলে ফেলা,অসাধারণ কমিক সেন্স আর সর্বোপরি যৌনতার এমন নিষ্পাপ, প্রায় সাবলাইম, অথচ উচ্ছল প্রকাশ, সব মিলিয়ে চোখ আর মন দুটোই ধাঁধিয়ে গেলো।ছেলেদের যেমন পাড়ার বা ইশকুলের উঁচু ক্লাসের একজন দাদা লাগে বড় হবার পাঠ নিতে, আমিও তেমনি ‘লাকিচিকিলাকিচিকিচিকিলাকিচিকিচু’ জাদুমন্ত্রে হুশ করে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলাম। আর ‘লমহে’ দেখে যে কত রাত ঘুম আসেনি.. আজও যদি স্বীকার না করি ভারি অন্যায় হবে।এক কথায় শ্রীদেবী হয়ে উঠলেন আমার ‘ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে’।

শ্রীদেবীর চলে যাওয়া, এমন অকালে, তাই শোকের তো বটেই, কিন্তু শুধু সেটুকুই নয়। আমার শৈশব- কৈশোরের সন্ধিক্ষণের একটা প্রিয় চ্যাপ্টার উধাও হয়ে গেল, আমার ‘হাওয়া-হাওয়াই’, আমার ‘মেঘা রে মেঘা’, আমার ‘ মেরি হাতোঁ মেঁ নও নও চুড়িয়াঁ’…. সাবধানে যাবেন, অনেক দূরের পথ।

ছবি: গুগল