আপনাকে শ্রীদেবী…

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

এত দিন অনেক অভিযোগ আর প্রশ্নের মুখে পড়েছি…।
ধর্ষণ নিয়ে লিখছি না কেন, পিরিয়ডস নিয়ে লিখছি না কেন, ব্রায়ের স্ট্র্যাপ বেরিয়ে থাকা নিয়ে লিখছি না কেন, জনৈক মানুষের অ্যাচিভমেন্ট নিয়ে লিখছি না কেন…
অনেক সময় স্মাইলি দিয়ে কাটিয়ে দিই, কখনও কখনও “সব সময় সব কিছু নিয়ে লেখার দায় সব মানুষের নেই” শীর্ষক প্রবন্ধ লিখি ইনবক্সে…। কখনও সাফাইও দিই, অমুক বিষয় নিয়ে আমার অমুক লেখাটা পড়েননি…!আজ এই প্রশ্নও এলো ইনবক্সে, শ্রীদেবীকে নিয়ে লিখিনি কেন…। অন্য সময় যা-ই উত্তর দিই, এই প্রশ্নের মুখে আমার কাঁচুমাচু হয়ে পড়া ছাড়া উপায় রইল না…। কোনও রকমে ঢোঁক গিলে বললাম, “আমি মানে, না মানে, ওঁকে ঠিক চিনি না…। ঘটনাচক্রে ওঁর একটি সিনেমাও দেখে ওঠা হয়নি…। আর খুব কিছু কোনও দিন জেনে ওঠাও হয়নি…।” এটা টাইপ করার সময় প্রতিটা লাইনের শেষেই আমি দুঃখীমুখী ইমোটিকনটা দিয়েছিলাম, মানে দুঃখিত হয়েই দিয়েছিলাম…।
কিন্তু উনি পাল্টা তেড়েফুঁড়ে এলেন কয়েকটা লালমুখো রাগী ইমো নিয়ে…। রীতিমতো ধমক এবং ঘৃণার সুরে বললেন, “বলিউডের এত বড় এক জন মানুষ চলে গেলেন, এত মহান এক ব্যক্তিত্ব প্রয়াত হলেন, আপনি এক লাইন লিখবেন না…!! শুধু নিজের কথা লিখলেই হবে…?? ওঁর অবদান নিয়ে আপনার কাছ থেকে কয়েকটা বাক্য এক্সপেক্টেড…। বাক্য না হলেও, চার লাইনের ছড়া হলেও হবে…। লেখেন তো মাঝে মাঝে…।”
এর পরেও সস্তায় সেঁকো বিষের সন্ধানে না গিয়ে আমি উত্তর দিয়েছি…। বললাম, “সিনেমা যেহেতু দেখিনি, তাই অভিনয়টা কেমন করতেন বলতে পারবো না…। কিন্তু টাকার বিনিময়ে প্রফেশনালি অভিনয় করা ছাড়া তেমন কোনও মনে রাখার মতো কাজ আলাদা করে করেছেন কি উনি…? যেটা নিয়ে লেখা যায়…? করলেও আমি মিস করে গিয়েছি…। আপনি বলতে পারবেন…? বললে আমি একটু নেড়েঘেঁটে দেখব, লিখবও…।”
সটান ব্লক করে দিয়েছেন…
এই ব্লক ফ্লক আবার আমি হেব্বি আঁতে নিয়ে নিই…। আক্রমণের মুখে পড়েও যেখানে আমি ঠান্ডা মাথায় কথা চালিয়ে যাচ্ছি, সর্বোত্তম ক্ষমতা পর্যন্ত উত্তর দিচ্ছি, সেখানে উল্টো দিকের মানুষটা এত অসহিষ্ণু হবেন কোন যুক্তিতে…!
যাক গে, মনের দুঃখে লিখতে বসলাম শ্রীদেবীর প্রয়াণে…। তথ্য না-ই বা থাকল, না-ই বা দেখা হল মানুষটার সঙ্গে…।
সাংবাদিক মানুষ বটে, সারা দেশ…সারা ফেসবুক মেতে আছে যে সিরিয়াসতম ইস্যু নিয়ে… তা নিয়ে চার লাইন লিখতে পারব না…?? তবে যাঁর জন্য লেখা, যাঁর খোঁচা খেয়ে লেখা, তিনি পড়তে পারলেন না, এটাই দুঃখ…।
যে কোনও মৃত্যুই তো ডেফিনিটলি শোকের…। তার উপরে এমন আগুন-সুন্দরী এক মহিলা, এত কম বয়স, দিব্যি আনন্দ করছিলেন বিয়েবাড়িতে, দুম করে মৃত্যু… খারাপ লাগবে না…? লেগেছে…। প্রথমেই তো জন্মসালটা দেখে ঝটকা লাগল…। ১৯৬৩…। আমার মা-ও ওই বছরই জন্মেছিল…। বুক ছ্যাঁত করে ওঠে না, বলুন..? তার পর আমি ভাবার চেষ্টা করলাম, কিছুই মনে পড়ল না…। যিনি অভিনয় করার জন্যই সুপরিচিত, আর যাঁর কোনও সিনেমাই আমার দেখা হয়নি…তাঁকে নিয়ে কী মনে পড়বে…!?
তবে সারা দিন ফেসবুক স্ক্রোল করতে গিয়ে আর দিনভর নিউজ়রুমের সব ক’টা টিভি থেকে হাওয়াহাওয়াই শুনতে শুনতে একটু অপরাধীই লাগছিল নিজেকে…। মনে হচ্ছিল আমি একাই এমন গামবাট, যার কিছুই মনে হচ্ছে না এত বড় মৃত্যুতে…। মনে হচ্ছিল, ভদ্রমহিলার জীবদ্দশায় তাঁর অন্তত একটা সিনেমা দেখা খুব উচিত ছিল…।
যাক গে, ‘উচিত ছিল’ দিয়ে তো জীবন এগোয় না, বরং থেমে থাকে…। থেমে গেলে তো আরওই লিখতে পারবো না…।
এই বাজারে খবর ছড়িয়েছে, মানে খবর তো এখন ভাইরাল পোস্টের মাধ্যমে ছড়ায়… নিজেকে ‘সুন্দর’ রাখতে গিয়ে, পঞ্চাশ পেরিয়েও নিজেকে যথেষ্ট রোগা রাখতে গিয়ে, শুধু রোগা ছাড়াও শরীরের আরও নানান বার্ধক্যজনিত পরিবর্তন রোখার জন্য একের পর এক অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে নাকি গত পাঁচ বছর ধরে রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন শ্রীদেবী…। প্রশ্ন উঠেছে, কীসের এত চাপ ছিল নিজেকে কষ্ট দিয়ে ‘সুন্দর’ রাখার, ভালবাসার এত অভাব কেন ছিল, যে কেউ বাধা দেয়নি এই শারীরিক অত্যাচার করে চলাকে…? দাবি উঠেছে #notsize0মুভমেন্টেরও…। না, মানে শুধু ফেসবুকেই…। ফেসবুকের বাইরে অবশ্য আমরা “ইসসস কী মুটিয়েছে মেয়েটা” জাতীয় কথা বলতেই পারি…।
এই যেমন আমায় দেখে এখন অনেকেই বলে থাকেন এ রকমটা…।
তাঁরা ভাগ্যিস ছোট্টবেলায় দেখেননি আমায়…। এতটাই গোল ছিলাম, আমার রোগাসোগা মা কোলে নিতে গিয়ে রীতিমতো গালি দিয়ে ফেলতো…। তার পরেও বেশ থপথপেই ছিলাম…। আর একটু বড় হতে হতে যখন ঝরতে শুরু করলাম, তখন অন্য সমস্যা…। সবই ঝরে যাচ্ছে…। ওই লালিত্য ফালিত্য ব্যাপারগুলো আর কি…। কলেজের প্রথম দিকে ‘বন্ধু’রা কম ‘মজা’ করেছে, তখনও পর্যন্ত শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় পর্যাপ্ত স্নেহ পদার্থ জমেনি বলে…!? কখনও আড়ালে, কখনও প্রকাশ্যে…। সেই সঙ্গে অ্যাডিশনাল ভ্যালু যোগ করেছিল ছোট্ট করে ছাঁটা চুল…। আমি তো তখন পাহাড়, আমি তো তখন সাঁতার, আমি তো তখন মার্শাল আর্টস, আমি তো তখন ওয়েট ট্রেনিং…। আমার সময় কোথায়, আলাদা করে ‘মেয়ে’ হয়ে ওঠার…? ‘সুন্দর’ তো অনেক পরের কথা…।
কিংশুক পর্যন্ত কত বার শুনেছে, “তোর বউটা ছেলেদের মতো”…।
কিছু কি আটকাল তাতে জীবনে, কোথাও কিছু কম পড়লো…? বরং সে দিন যারা বডি শেমিং করেছিল, তাদেরই অনেকে আজকে আমায় বলে, “কী সুন্দর লিখিস তিয়াষ…!” তারাই কিংশুককে বলে, “তোদের সেই ছোটবেলার প্রেমটাই শেষমেশ টিকে গেল এতগুলো বছর…!”
এখন ওজন বেড়ে গিয়েছে একটু…। ভুলভাল সময়ে ভুলভাল খাওয়াদাওয়া করাটা তার অন্যতম কারণ…। এই একটু আগেই যেমন অফিস থেকে ফিরে মাঝরাত পার করে এক পেট রুটি-তড়কা-ডিমভাজা খেয়ে ফেললাম…। সেই সঙ্গে, একেবারেই প্র্যাকটিসের সময় পাই না এখন আর…। তা সত্ত্বেও বিশেষ চিন্তিত এ জন্যই হই না, যে আমার জাস্ট ওজনই বেড়েছে একটু…। কঠিন অসুখ করেনি কোনও…।
হয়তো দেখতে একটু খারাপ লাগছে, মনের দিক থেকে তো খারাপ হইনি আমি…।
আপনি বলবেন, তিয়াষ তো অভিনেত্রী নয়, তার তো দেখতে সুন্দর থাকার দায় নেই…। আমি বলবো দু’টো কথা…।
এক, অভিনেত্রী হলেই যে ‘দেখতে সুন্দর’ হতে হবে, বিশ্বসিনেমার দরবারে এই ধারণা ভেঙেচুরে গিয়েছে বহু আগেই…।
আর দুই, সুন্দর থাকার দায় প্রতিটা মানুষের আছে…।
এ বার সে কী ভাবে সুন্দর থাকবে, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নিজের বাহ্যিক খোলনলচে বদলে ফেলার মাধ্যমে… চামড়ায় রাসায়নিক মেখে, লোম কেটে, বুক-পেট-কোমরের রেশিও রক্ষা করতে প্রাণপণ খেটে, প্লাস্টিকের নাক-ঠোঁট বানিয়ে… নাকি নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সবটুকু প্রতিভা, ক্ষমতা, দক্ষতা, স্বপ্নকে রোজ নতুন নতুন করে এক্সপ্লোর করার মাধ্যমে…সেটা তো তার চয়েস…!
অনেকে আবার বলছেন, “পয়সা থাকলে আমিও নিজেকে শ্রীদেবীর মতো ভেঙেচুরে সুন্দর করাতাম”…এটা নাকি আমাদের সবারই মনের কথা…। ‘পয়সা থাকলে কী করতাম’ জাতীয় ফ্যান্টাসি, আর ‘পয়সা আছে বলেই কী করছি’, নামক বাস্তব… এ দু’টোর মধ্যে আকাশ আর পাতাল তফাৎ বলেই আমার মনে হয়…। ঠিক যেমন আমরা সবাই ছোটবেলায় ভাবতাম, চাকরি পাওয়ার পরে প্রথম মাইনে পেলেই দোকানের সব ক’টা ক্যাডবেরি কিনে ফেলবো…। আর আমরা সবাই জানি, বড় হয়ে চাকরি পাওয়ার পরেও ক্যাডবেরিগুলো সব দোকানেই থেকে গিয়েছে…।
যাই হোক, বড় সমস্যা দৃষ্টিভঙ্গির…। আমরা এখনও সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারিনি… যে দৃষ্টিভঙ্গিতে অভিনেত্রী বলতেই কাটা ভুরু, চাঁছা লোম, ধারালো নাক, হরিণী চোখ, চাবুক কোমরের দেবীসুলভ শ্রী ভেসে ওঠে…। আর সেই দেবীসুলভ শ্রী-লাভ করতে গিয়েই কেউ কেউ শেষবেলার শ্রীদেবী হয়ে যান…।
এ দুর্ভাগ্য আমাদেরই…।
আমরা তো আমাদের কাছের মানুষগুলোর কাছে দাবি করি, ‘আমি যেমনটা, আমায় তেমন করেই ভালবাসো’…। তা হলে আমরা নিজেরা কেন নিজেকে ভালবাসতে পারি না, ‘আমি যেমনটা, তেমন করেই’…? কেন আমরা নিজেকে বদলাতে ব্যস্ত থাকি সারা ক্ষণ…? কেন নিজেকে নিয়ে হা-হুতাশ করি, এটা একটু কম আর ওটা একটু বেশি বলে…?
ঠিক নয়… তাই না…?
এ লেখার সঙ্গে একটা ছবি দেব বলে গুগল্ করছিলাম…। কত্ত ছবি, সেই প্রথম থেকে এই শেষ পর্যন্ত…। আগে তো কখনও ভাল করে দেখিনি, খেয়ালও করিনি…। এখন চোখে পড়ছে…।
সত্যি… আজকাল বড্ড রোগা লাগছিল আপনাকে, শ্রীদেবী…

ছবি: গুগল