বন্ধুদের সঙ্গে কুমিল্লায়…

আন্জুমান রোজী,(টরন্টো প্রতিনিধি)

আমার পূর্বপুরুষের পায়ের ছাপ শতশত বছর ধরে কুমিল্লার বুকে  যে পথে পড়েছিল সেই পথ ধরে হেঁটে এলাম। সঙ্গে ছিলেন আমার সমমনা বন্ধুরা।  যারা সবাই ছিলেন প্রাণের বাংলা পত্রিকার ধারক-বাহক এবং ঢাকাবাসী।  তাদের সঙ্গে আমার সংযোগ ঘটে সুদূর কানাডায় বসে লেখালেখির মাধ্যমে। ধীরেধীরে অনলাইন পত্রিকা প্রাণের বাংলার সঙ্গে প্রাণের টানেই জড়িয়ে যাই। এর পুরো কৃতিত্ব প্রাণের বাংলার সম্পাদক আবিদা নাসরীন কলির। লেখা আদায় করে নেওয়ার অসম্ভব যাদু আছে তার।

চা বিরতি

ভালোলাগা, ভালোবাসায় জড়িয়ে এই প্রথম কানাডা থেকে ঢাকায় এসে প্রাণের বাংলার সান্নিধ্যে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকট হয়ে ওঠে। এর পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে পেয়ে যাই কুমিল্লাবাসী এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের উদ্ভিদ বিভাগের শিক্ষক ও লেখক মেহেরুন নেসাকে। আমরা সবাই ভার্চুয়াল বন্ধু। সকলের সঙ্গে প্রথম দেখার উত্তেজনা নিয়ে ভোর সাড়ে ছয়টায় বাসা থেকে বের হয়ে পড়ি। উদ্দেশ্য কুমিল্লা সফর। মেহেরুন নেসার আমন্ত্রণ পাওয়ায় পূর্ব পরিকল্পনামাফিক সবাই একসঙ্গে ঢাকা থেকে কুমিল্লার দিকে যাত্রা করি।

ঢাকার উত্তরা থেকে প্রাণের বাংলার সম্পাদক আবিদা নাসরীন কলি, কবি লেখক ইরাজ আহমেদ সাংবাদিক লেখক রুদ্রাক্ষ রহমান, প্রাণের বাংলার ম্যানেজিং এডিটর শামীম জাহিদ, ফটোগ্রাফার সম্রাট এবং আমি সহ সবাইকে  নিয়ে  গাড়ি ভোরের কুয়াশা ভেঙ্গে  তিনশ ফুট রাস্তা ধরে কুমিল্লার দিকে ছুটতে থাকে। গাড়িতে উঠে সকলের সঙ্গে  হৃদ্যতার  আলিঙ্গন, আলাপ পরিচয়ের এক রমরমা  ভাব বিনিময় হয়। পুরো যাত্রা জুড়ে হৈচৈ আর গল্পগুজবে আমরা মাতোয়ারা হয়ে ওঠি। দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়নের নামে রাস্তার পরিমার্জন আর পরিবর্ধনের জন্য যে পরিমান নির্মমাণকাজ চলছে, তাতে  উথালপাতাল আছাড়ি পিছাড়ি খাওয়ার করুণ দুর্দশাও আমাদের আনন্দ যাত্রায় ভাটা ফেলতে পারেনি। ভাঙ্গারাস্তার মর্মবেদনা আর নাইবা বললাম।

আসলে সমমনা বন্ধু নিয়ে অভিযাত্রা এক ভিন্নমাত্রার আমেজ এনে দেয়, যেখানে ক্লান্তির কোনো বহর থাকে না।

রাণীর দীঘি

সকালের  চা বিরতির জন্য আমরা সবাই  পথিমধ্যে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ি।  টং ঘর থেকে চা চেয়ে নেই। হাইওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাকের ধূলা উড়িয়ে ছুটে চলার দৃশ্য দেখতে দেখতে আর ফটোশুটের মহড়া দিতে দিতে চা পান  সারা হলে  আবার গাড়ি কুমিল্লা অভিমুখে ছুটতে থাকে। চারপাশে ইটপাথরের রাজত্ব আর সবুজ বনানীর ওপর ধূলার আস্তর দেখতে দেখতে ভাবি,  সুজলা সুফলা আমার বাংলাদেশের ওপর এ কিসের আছড় পড়েছে! যেখানে প্রকৃতি হেসেখেলে দোল খেয়ে যেতো সেখানে আজ তার দৈন্যদশা দেখে বুকটা হু হু করে ওঠে। মেঘনাব্রীজ, গোমতীব্রীজ পার হয়ে যখন গাড়ি কুমিল্লা শহরে প্রবেশ করলো তখনই বিপত্তি ঘটলো, জ্যামে আটকা পড়লাম। মানুষ, ট্রাক, গাড়ি, সব একাকার হয়ে এলোপাথাড়ি নড়ছে তো নড়ছে না, এমন অবস্থা। মনে হলো, জ্যামের দিক থেকে কুমিল্লা ঢাকাকে হারিয়ে দিলো। এখানেও ইটপাথরের উঁচুউঁচু ইমারত।  নিঃশ্বাস বোধ হয় আর কোথাও ফেলতে পারবো না! উন্নয়নের এমন কঠিন এবং অমানবিক   রূপ পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা জানি না। তবে মানুষের দুর্দশা দেখে সত্যি ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো। আর মাঝেমাঝে এসব নিয়ে সবার সঙ্গে  কথোপকথন চলছিল। আর অনুভব করছিলাম সকলের বুকের ভেতর পাথরচাপা কষ্টের অনুভূতিগুলোকে।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ

একঘণ্টা পর জ্যাম থেকে মুক্তি পেয়ে মেহেরুন নেসাকে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা চলছিল। ইতোমধ্যে মেহেরুন নেসার হাজব্যান্ড যিনি ভিক্টোরিয়া কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ ইমাম হোসেন; ফোনে যোগাযোগ করে জানতে চাচ্ছিলেন আমাদের অবস্থানের কথা। উৎকণ্ঠা আর উদ্বিগ্নতার প্রহর যেন আর কাটে না।  কাছে এসেও খুঁজে পাচ্ছিলাম না মেহেরুন নেসার নিবাস। অবশেষে প্রতীক্ষার প্রহর কাটলো। কুমিল্লা শহরের সদর হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে চারদিক লক্ষ্য করতেই দেখি মেহেরুন নেসা আমাদের দিকে ছুটে আসছেন। মিলনমুহূর্ত আনন্দঘন পরিবেশে রূপান্তরিত হলো। মেহেরুন নেসার ছায়া সুনিবিড় বাড়িতে প্রবেশ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। তার বাসায় রসনা বিলাসের আয়োজন দেখে আমাদের চক্ষুচড়ক।দেশীয়  বিভিন্ন  পিঠার সঙ্গে ভূরিভোজনের বিশেষ আয়োজন দেখে আমাদের পেটে খিদার ঘন্টা বেজে উঠলো জোরেশোরে।  আতিথেয়তার কার্টেসির পাত্তা না দিয়ে হৈচৈ করে সোজা খাবার টেবিলে বসে যাই। ভাবা যায়, মেহেরুন নেসাকে আমরা এই প্রথম দেখেছি! যেন নিজের বাড়িতে বসে আনন্দে আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠছি। মেহেরুন নেসা আর ইমাম ভাইয়ের আন্তরিকতায় আমরা ভুলেই বসেছিলাম যে এই প্রথম আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। খাওয়ার পর্ব সারতে যতক্ষণ,  তারপরেই বের হয়ে পড়া কুমিল্লা শহরকে চেখে দেখার জন্য। তার আগে ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক ছিল মেহেরুন নেসার বাসায় আমাদের আগমনের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য।

সবাই মিলে বড় মাইক্রোবাসের ভেতর ঢুকে বসে পড়লাম। ইমাম ভাই আমাদের ঘুরেঘুরে দেখানোর জন্য গাইড হলেন। ড্রাইভারের সিটে বসে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু রাস্তাঘাটের করুণ দুর্দশা আর জ্যামের অবস্থা দেখে মাঝেমাঝে হতাশ হচ্ছিলাম বটে, তবে কবি ইরাজ আহমেদ, লেখক রুদ্রাক্ষ রহমান, শামীম,কলি আপা, সম্রাট সহ সকলের  হাসি ঠাট্টায় রমরমা  কথোপকথনের কারণে কোনো ক্লান্তি এসে আমাদের ওপর ভর করতে পারেনি। প্রথমেই ইমাম ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন শচীন দেব বর্মণের বাড়িতে। মূল ফটকে তালা দেওয়া ছিল বলে আমরা ভেতরে যেতে পারিনি। তবে বাইরে থেকে যতটুকু চোখের আর মনের স্বাদ নেওয়া যায়। সেই পুরনো দালান, যেখানে শচীন দেব বর্মণ জন্মগ্রহণ করেন।

শচীন দেববর্মণের বাড়ি

বীরচন্দ্র মাণিক্যের অর্থানুকূল্যে, কুমিল্লার চর্থায় ৬০ একর জমি নিয়ে প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন কুমার বাহাদুর নবদ্বীপচন্দ্র। এই প্রাসাদে ১৯০৬ সালের পয়লা অক্টোবর তাঁর ছোট সন্তান শচীন দেববর্মণের জন্ম। ১৯১০ থেকে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঠাকুরপাড়ার সুরলোক, কান্দিরপাড়ের সবুজ সংঘ নাট্যদল, দি গ্রেট জার্নাল থিয়েটার পার্টি, ইয়ংম্যান্স ক্লাব ইত্যাদি নিয়ে গড়ে উঠেছিল কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল। ত্রিপুরার মহারাজারা কুমিল্লায় তৈরি করেছেন টাউনহল, নাট্যশালা, লাইব্রেরি এবং নানা সংস্কৃতিক কেন্দ্র। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে শচীন দেবের বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সুরসাগর হিমাংশু দত্ত, অজয় ভট্টাচার্য, মোহিনী চৌধুরী, সমরেন্দ্র পাল, কাজী নজরুল ইসলাম, শৈলবালা দাম, ধ্রুপদীয়া সৌরেন দাশ, সুধীন দাশ প্রমুখ। সেখানে নিয়মিত আসতেন চলচ্চিত্র পরিচালক সুশীল মজুমদার, ননী মজুমদার, ব্রজেন ব্যানার্জি, জিতু দত্ত, অরুণ মহলানবিশ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। গানের ধরন ছিল ভোরকীর্তন, নগরকীর্তন, কবিগান, ঢপযাত্রা। সাহিত্যিক, সুরকার, গীতিকার, কবি ও সঙ্গীতজ্ঞগণ একত্রিত হতেন ইয়ংমেন্স ক্লাবে। আড্ডা থেকে ভেসে আসত নজরুল ও শচীন দেবের গান। নজরুল কুমিল্লা এলে থাকতেন তালপুকুরের পশ্চিমপাড়ে একটি ঘরে।কুমিল্লা থেকে শচীন দেব কলকাতা চলে আসেন ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে।

শচীন দেব বর্মনের বাড়ি ছাড়িয়ে আমরা চলে আসি রাণীদিঘীর পাড়ে। যে দীঘির পাশে বসে কাজী নজরুল ইসলাম তুমুল আড্ডা দিতেন। ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া কলেজ সংলগ্ন রাণীর দীঘির পশ্চিমপাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে তিনি  তরুণদের নিয়ে বসতেন। চলতো জমজমাট আড্ডা ও কবিতা-গানের আসর। প্রমীলার কাছে লিখতেন গান ও চিঠি। ধর্ম সাগরের পশ্চিম পাড়ে বসেও নজরুল গান ও কবিতা লিখতেন। রচনা করেছেন অনেক কালজয়ী কবিতা, গান। আড্ডার জায়গাটিতে অর্থাৎ রাণীর দীঘির পাড়ে নজরুলের নামে একটি স্মৃতিফলক রাখা হয়েছে।  রাণীর দীঘির মতো এমনই আরো দীঘি যেমন উজির দীঘি, নানুয়ার দীঘি, ধর্মসাগর, তালপুকুর, জোড়া দীঘি এসবই ত্রিপুরার মহারাজারা এতদঅঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানির অভাব পূরণের তাগিদে খনন করেন এবং একেকটা পুকুর বা দীঘির নামকরণ করেন। রাণীর দীঘি আসলে ত্রিপুরার মহারানীদের নামেই নামকরণ হয়। রাণীর দীঘির পাড় ঘেষেই কুমিল্লার সবচেয়ে পুরাতন এবং এতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ যা ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায় রাণী ভিক্টোরিয়ার নামে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ

কলেজের  ইন্টারমিডিয়েট শাখার প্রধান ফটকের প্রবেশমুখে আনন্দ চন্দ্র রায়ের ভাস্কর্যটি ইতিহাসকে আজো অম্লান করে রেখেছে।  ভাস্কর্যের আশেপাশ দেখে আমরা কুমিল্লা শহরের ভেতর চলে আসি। ইমাম ভাই আঙ্গুল নির্দেশ করে দেখাচ্ছিলেন  কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রের গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন। যা “টাউন হল” নামে পরিচিত। এ টাউন হলে পদধূলি দিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।  ৬৩ টি আলমারিতে সজ্জিত আছে ৩০ হাজার বই। ত্রিপুরা জেলার চাকলা রোশনাবাদের জমিদার নরেশ মহারাজ ‘ বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুর’ নিজস্ব অর্থায়নে টাউন হল ভবন করে দেন। সময়টা ছিলো ১৮৮৫ সালে।

তারপর আসি ধর্মসাগর নামে এক বিশাল দীঘির কাছে  যা রাণী কুঠিরের কাছে অবস্থিত। ধর্মসাগরের থৈথৈ জলের রূপ দেখে আমরা সবাই উতলা হয়ে ওঠি। এক স্নিগ্ধ, মিষ্টি সতেজ হাওয়ার আবেশ পাচ্ছিলাম। ত্রিপুরার অধিপতি মহারাজা প্রথম ধর্মমাণিক্য ১৪৫৮ সালে ধর্মসাগর খনন করেন। এই অঞ্চলের মানুষের জলের কষ্ট নিবারণ করাই ছিল রাজার মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে ধর্মসাগরের আয়তন ২৩:১৮ একর। এটির পূর্বে কুমিল্লা স্টেডিয়াম ও কুমিল্লা জিলা স্কুল, উত্তরাংশে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যান ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় অবস্থিত। কুমিল্লার শহরবাসীর নিকট এই দীঘিটি একটি বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এখানে অবকাশ উদযাপনের নিমিত্তে প্রতিদিন বিপুল জন সমাগম হয়ে থাকে। ধর্মসাগরের উত্তর কোণে রয়েছে রাণীর কুঠির, পৌরপার।  সবুজ বড় বড় গাছের সারি ধর্মসাগরকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। তাছাড়াও শীতকালে ধর্মসাগরে প্রচুর অতিথি পাখির আগমন ঘটে।(চলবে)

ছবি: সম্রাট