মরণকামড়…

নীপা লায়লা

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

বেশ কিছুদিন আগে এই মধ্যবয়সে এসে গিটার শিখার ভূত চেপেছিলো মাথায় আর সেই ভূতকে আহ্লাদ দিতে মাস্টার সাহেব সঙ্গে সঙ্গে গিটার কিনে দিয়েছিলেন।কয়েকদিন টুংটাং করেছিলাম তারপর বাকিটুকু ইতিহাস!একজন নিয়মিত টিচার নেই তার উপর আমার দেশবিদেশ ঘুরে বেড়ানোর চক্কোরে গিটার ব্যাগে আটকে রইলো মাসের পর মাস।সময় সুযোগ পেলে ব্যাগের ধুলো মুছে আর ব্যাগ খুলে গিটারের গায়ে হাত বুলিয়ে নিজের গিটারিস্ট হবার ইচ্ছেকে গলাটিপে মেরে ফেলতাম।

এরপর ভূত চাপলো ভায়োলিন শিখবো। এবারও মাস্টার সাহেব ভায়োলিন কেনার বাজেট খামে ভরে দিয়ে দিলেন।টিচার ঠিক,কবে কখন টিচারের কাছে যাবো তাও ঠিক কিন্তু ভায়োলিন আর কেনা হোলো না।খামে আটক ভায়োলিনের বাজেটকেই এবার ইতিহাস বানিয়ে ফেললাম।হবেনা। আমাকে দিয়ে কিচ্ছুই হবেনা, এই ভেবে ভায়োলিন কেনা থেকে নিজেকে বিরত করে ফেললাম।

হঠাৎ একদিন আমাদের দীপনপুরের প্রমিকে দেখলাম গিটার হাতে নেওয়া ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করেছে।ওর কাছে জানতে চাইলাম কার কাছে গিটার শিখেছে?বললো ওর ভাইয়ের কাছে শিখছে।এবার আবদার করলাম প্রমির কাছে, যেন ওর ভাই আমাকেও একটু সময় দেয়।প্রমি ভীষণ আনন্দিত হয়েই ভাইকে জানালো আর ওর ভাই ছেলেটা আমাকে অবাক করে দিয়ে একদিন দীপনপুর চলে এলো আমার গিটারিস্ট হবার স্বপ্নপূরণ করতে।বাচ্চা একটা ছেলে।উচ্চশিক্ষিত। স্মার্ট। ভীষণ কনফিডেন্ট! ওর লেসন দেয়া দেখে আমি মুগ্ধ।মনেমনে বলি,শিক্ষাগুরু তো এমনই ধীরস্থির ধৈর্যশীল হওয়া চাই।গুরুমশাইয়ের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হলে কি হবে আমিতো গিটার ধরতেই পারিনা।কিন্তু গুরুমশাই বেশ আশাবাদী। আমি যতোই বলি হবেনা আমাকে দিয়ে তিনি ততোই বলেন, আমি আপনার চেহারায় জেদ দেখতে পাচ্ছি,হবে আপনাকে দিয়ে।আমি ওকে আমার গুরু হিসেবে মেনে নিলাম।গুরুমশাই ভীষণ কড়া। যা টাস্ক দিয়ে যাবেন তা কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নেবেন অথচ আমার প্র‍্যাক্টিস করার সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই নেই।আমি নিরুপায় আর গুরুমশাই কনফিডেন্ট।ফলাফল, আমার গিটারিস্ট হবার ভূত এবার মাথায় চেপে বসেছে।

আজ দীপনপুরেই আমার গিটার ক্লাশ ছিলো।আমি আর প্রমি সমানে ভুলভাল টুংটাং করছি আর গুরুমশাই আমাদের বারবার দেখিয়ে দিচ্ছেন।আমাদের চিয়ার আপ করার জন্য একবার নিজেই গিটার বাজিয়ে একটা চমৎকার গান গাইলেন।আমাকে বলছেন,আপনার হবে খুব তাড়াতাড়ি আর প্রমিকে বলছেন, তোর চেয়ে আপুর বাজানো বেশী ভালো হচ্ছে।গুরুর কথায় প্রমিও হাসে, আমিও হাসি।হঠাৎ করেই বললেন,দেখি আপনার হাত!দেখালাম।উনি বললেন নেইল কাটার আছে?বললাম,কেন? আপনার নখ কাটা দরকার নইলে গিটার বাজাতে ঝামেলা হবে।বললাম,আজই আমার নখ কাটার ডেইট।উনি বললেন, তাহলে কেটে ফেলুন এক্ষুণি।নেইল কাটার সঙ্গে নেই,তবে জরুরী হলে কিনে আনতে পারি, বলার সঙ্গে সঙ্গেই বেশ জোড় দিয়েই বললেন,আনুন কিনে তারপর নখ কেটে ফেলুন।প্রমি গিয়ে নিচে বিয়েশাদির দোকান থেকে নেইলকাটার কিনে আনলো তারপর এক এক করে আমি আর প্রমি দুজনেই বাথরুমে গিয়ে দুই হাতের নখ কাটলাম।এরপরে শুরু করলাম টুংটাং টুংটাং টুংটাং।ডায়াবেটিক পেশেন্টদের এমনিতেই স্কিন সেন্সেটিভ হয়ে যায় তার উপর স্ট্রিং এর উপর ক্রমাগত আঙুলের প্রেশার দেয়ায় বাম হাতের সবগুলো আঙুলের সাড়ে বারো বেজে গেলো।লেসন বুঝিয়ে দিয়ে যাবার আগে গুরুমশাই বললেন,আপনাকে দিয়ে হবে আপু খুব তাড়াতাড়িই হবে।ব্যথায় অবশ অবশ আঙুলের অবস্থা দেখে অসহায় চেহারা করে বললাম আমি,আসলেই হবে?আমি কনফিডেন্ট, এখন আপনার ইচ্ছা আর প্র‍্যাক্টিসের উপর ডিপেন্ড করে কতো তাড়াতাড়ি হবে, তবে হবে শিওর-বলে গুরুমশাই আজকের মতো চলে গেলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে আমি একজন নৈরাজ্যবাদী মানুষ যাকে ভদ্র ভাষায় এলেবেলে আর রুটিনলেস বলা যায় তাই আমার জীবনে কিছুই কখনো পুরাপুরি ভাবে হয় না।যেটুকু না হলেই নয় এমন একটা অবস্থা নিয়েই জীবন প্রায় শেষ করে ফেলেছি।কিন্তু আজ আঙুলের আগায় আগায় বিষের মতো ব্যথা নিয়েও মরে যাবার আগে একজন গিটারিস্ট হবার বড় শখ হয়েছে আমার।এরপরে আয়ুরেখায় যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তবে একজন বেহালাবাদক। আজীবন একজন নৈরাজ্যবাদী মানুষ আমি এইবেলা কচ্ছপের মতো নিজের ইচ্ছের মাথায় মরণকামড় দিয়ে রইলাম।দেখি কি হয় শেষপর্যন্ত!

ছবি: লেখক, গুগল