বাংলাদেশের ক্রিকেটে অশনি সংকেত

আহসান শামীম

ভরাডুবি কাকে বলে? উত্তর হলো, অনেক সম্পদ আর সম্ভাবনার সঞ্চয় নিয়ে একটি জলযান যখন ডুবে যায় তাকেই বলে ভরাডুবি। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ক্ষেত্রেও এখন এই ভরাডুবি কথাটা ভালোভাবেই প্রযোজ্য। সম্প্রতি ঘরের মাটিতে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট ও টি-টুয়েন্টি সিরিজেও নিদারুণ হার তেমন বার্তাই দিচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নের বদলে দেখছে দুঃস্বপ্ন। আর এই দুঃস্বপ্নের ধাক্কায় বিপর্যস্ত টাইগার বাহিনী। আর তাদের এই বেহাল দশার কারণ অনুসন্ধান করতে শুরু করেছে বিসিবি।

এই সংখ্যা প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন বাংলাদেশের ক্রিকেটের অশনি সংকেত নিয়ে।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন হানিমুন পিরিয়ড পার করছিলো। কঠিন সব প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ি করে দিয়ে সাফল্যের দিগন্তের দিকেই ছিলো তাদের পথচলা। তবে এরই মাঝে বাঁশি কখনো সখনো বেসুরোও বাজছিলো। ঝামেলার সূচনা হয়েছিলো হেড কোচকে নিয়ে। বাতাসে তখন সংকট তৈরী হওয়ার নানা গল্প ভেসে বেড়াচ্ছিলো।পাওয়া যাচ্ছিলো মনমালিন্যের উৎকট গন্ধ। তারপর নানা কান্ড ঘটিয়ে হাথুরো সিংহের প্রস্থান। আলোচিত-সমালোচিত এই কোচ বাংলাদেশের ঘর ছেড়ে ফিরে গেলেন নিজ দেশের দলের কাছে হেড কোচের দায়িত্ব নিয়ে। শুরু হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন বাঁকে পথ হাঁটা। টাইগার বাহিনীর দায়িত্ব পেলেন খালেদ মাহমুদ সুজন। বেশ কয়েকজন পেশাদার ভিনদেশী কোচ নিয়োগের উদ্যোগ কিছুদিন বাতাসে ভেসে রইলো গ্যাস বেলুনের মতো। তারপর শোনা গেলো, সুজন আর দলের তারকা খেলোয়াড়রাই দলের দায়িত্ব নিচ্ছেন। এবার নতুন করে আকাশে উড়লো জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের বেলুন। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে সেই বেলুন গ্যাস ফুরিয়ে মাটিতে নামতে শুরু করে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট ও টি-টুয়েন্টি ম্যাচে। ধারাবাহিক পরাজয় হৃদয় ভেঙ্গে দিলো লাল সবুজের ক্রিকেট প্রেমীদের হৃদয়। হঠাৎ করেই দেশের ক্রিকেট যেন যাত্রা করলো উল্টোরথে। কিন্তু কী কারণে পেছনের পথে হাঁটতে শুরু করলো বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনাময় দলটি?

সম্প্রতি জাতীয় ক্রিকেট দলের বর্তমান অবস্থাকে ‘নোংরা পরিবেশ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন দলের দায়িত্বে থাকা খালেদ মাহমুদ সুজন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি সিরিজের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি আর আগ্রহী না। আমার আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গেই কাজ করতে ইচ্ছে করছে না আর। নোংরা লাগছে সবকিছু।’

সাংবাদিকরা এই নোংরা পরিবেশের জন্য দায়ী কারা জানতে চাইলে সুজন কোনো মন্তব্য করেননি। উল্টো ‘গণমাধ্যম বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ক্ষতি করছে’ এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করতে তিনি দ্বিধা করেননি।সুজনের এ ধরণের মন্তব্য তৈরী করেছে অনেক প্রশ্ন। সবাই জানতে চায় কী এমন ঘটছে বাংলাদেশ দলের ভেতরে যা পরিবেশকেই নোংরা করে দিচ্ছে?খেলোয়াড়রা কোচের প্রয়োজনীয়তা না দেখলেও বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান কোচ নিয়োগ দিতে এখন বদ্ধপরিকর।বাংলাদেশ ঠিক কী কারণে এমন খারাপ করলো, সবার সঙ্গে কথা বলে তা জানার চেষ্টা করেছেন বিসিবি বস।দেশে ফিরেই সায়মন হেলমেটকে ডেকেছিলেন, কথা বলেছেন ওয়ালশ আর সুজনের সঙ্গেও । জানার চেষ্টা করেছেন কী হয়েছিল। জানা গেছে কিছু তথ্যও পেয়েছেন তিনি।উপদলীয় কোন্দলে বিভক্ত সিনিয়র খেলোয়াড় আর কিছু বোর্ড কর্মকতার জটিল রাজনীতিই আজকে আমাদের ক্রিকেটের ভবিষ্যতকে ঘিরে দিয়েছে শঙ্কার পর্দায়।

কিন্তু এখন তো দল নিয়ে গবেষণার জন্য খুব বেশী সময়ও হাতে নেই বাংলাদেশের। মার্চে শ্রীলঙ্কায় স্বাগতিকদের সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশকে নিয়ে হবে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট নিধাস ট্রফির লড়াই। শোনা যাচ্ছে, আবার মাশরাফীকে নিয়েই ঘুরে দাঁড়াতে চায় বোর্ড। এখন সবচাইতে বড় প্রশ্ন হচ্ছে দলের এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে হাল ধরবেন কি না মাশরাফি?এই শ্রীলংকা সফর করেই টি-টুয়েন্টিকে না বলেছিলেন মাশরাফি।সম্প্রতি এক টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি টি-টুয়েন্টিতে ফিরবেন না বলে সোজাসাপ্টা জানিয়েও দিয়েছেন।দলের ভবিষ্যত দলনেতা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে নির্বাচকদের এখন। অথচ আজকের এই পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে কিন্তু অন্দর মহলেই। চট্টগ্রাম টেস্ট ড্র করার পর মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে একাদশ থেকে বাদ দেয়া হয়। এ নিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়, ‘প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীর হয়ে মোসাদ্দেককে খেলাতে জাতীয় দল থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।’ সোশ্যাল মিডিয়াতেও এনিয়ে কম সমালোচনা হয়নি।সুজন অবশ্য রাগ ঝাড়লেন গণমাধ্যমের ওপর।জানালেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের ক্ষতি করছে এই গণমাধ্যমই। কিন্তু সুজনের পর বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রধান নির্বাচক নান্নু কিন্তু উল্টো সুরে গাইলেন। তাঁর ভাষায়, গনমাধ্যমের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট অনেক উচ্চতায়।

বাংলাদেশের ড্যাশিং ওপেনার তামিম ইকবাল সম্প্রতি এক জাতীয় দৈনিকে  দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “সিরিজের ফল যা হয়েছে তাতে তিনি (হাথুরুসিংহে) এখন যে কোন কথাই বলতে পারেন।আমাদেরও সেগুলো মুখ বুজে শুনতে হবে।ফল যদি বিপরীত হতো, এই হাথুরুসিংহেই তখন আর কোনো কথা বলতেন না। কোনো সন্দেহ নেই, সিরিজ শেষে তিনি যেটা বলেছেন, সেটা ভুল নয়। আমাদের সম্পর্কে তিনি অনেক কিছুই জানেন, এটা তো সব দলই সব দল সম্পর্কে জানে। একটা দলের খেলোয়াড়দের সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এখনকার দিনে কোনো বড় কিছু নয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে গোপন বলে কিছু নেই। যদি হাথুরুসিংহেই শ্রীলঙ্কার সাফল্যের কারণ হয়ে থাকেন তাহলে জেমি সিডন্স আসার পর আমরাও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সব ম্যাচ জিততাম। তিনিও তো অস্ট্রেলিয়ার সহকারী কোচ ছিলেন। কই আমরা তো অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পারিনি!”

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করে মিরপুর হোম অব ক্রিকেট ভেন্যু এখন নিষিদ্ধ হওয়ার পথে।জবাবদিহিতার জায়গায় দায়িত্ব নিতে নারাজ বোর্ডের কর্তাব্যাক্তিরা।অজুহাত মীরপুর গ্রাউন্ড বিশ্রাম পাচ্ছে না।কর্মকর্তাদের মতো খেলোয়াড়াও কম অজুহাত দিচ্ছেন না।তারা আঙুল তুলেছেন পীচের দিকে। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া হয় পীচ কন্ডিশন ভালো ছিলো না তাহলে পাল্টা যুক্তি সামনে আসে-এই পীচেই তো লঙ্কানরা রান তুলেছে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা পারছেন না কেন ? বল হাতে লঙ্কানরা পারলে বাংলাদেশ বোলারদের সমস্যা কোথায়? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।

অধিনায়ক না থাকলে সহ অধিনায়কই অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেন।লঙ্কানদের বিপক্ষে সাকিব খেলতে পারবে না জানার পরও ১৫ সদস্যের দলে তাঁর নাম রাখাটা কোন দায়িত্ব বোধের পরিচয় এমন প্রশ্নের উত্তরও সম্ভবত কর্মকর্তাদের কাছে নেই। টি-টুয়েন্টির সহ অধিনায়ক তামিম দলে থাকা সত্বেও রিয়াদকে অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়াটাও প্রশ্নবিদ্ধ।

বিসিবি’র টাকায় হকির জন্য বিদেশী কোচের সংস্থান করা হলো, কাবাডিতে বিদেশী কোচ খুঁজে দিল ক্রিকেট বোর্ড। শুধু সিনিয়র খেলোয়াড়দের কথায়, ক্রিকেট দলে হেড কোচ না রাখার বিসিবি’র সিদ্ধান্তটিও কারো বোধগম্য হয়নি।সমালোচকরা পুরো ব্যাপারটাকেই অপেশাদার মনোভাব বলে চিহ্নিত করেছেন। তবে শেষ খবর জানা গেছে, কর্টনি ওয়ালশ আগামী শ্রীলঙ্কা সফরে বাংলাদেশ দলের হেড কোচের দায়িত্ব পাচ্ছেন।

হাতুরুসিংহের শুন্যস্থান পূরনে দ্রুত হাই প্রোফাইল বিদেশী কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনেকটাই এগিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ( বিসিবি)। রিচার্ড পাইবাস, ফিল সিমন্সকে এনে তাদের প্রেজেন্টেশন দেখেছে বিসিবি। আরো কয়েকজন হাই প্রোফাইল কোচ ছিল বিসিবি’র পছন্দের তালিকায়। কিন্তু দলের সিনিয়র ক্রিকেটার আর বিদ্যমান কোচিং স্টাফের মতামত নিতে যেয়েই ভুল করেছেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ, টেস্ট এবং টি-২০ সিরিজে বিদেশী কোচের দরকার নেই, নিজেরাই বাড়তি দায়িত্ব পালন করবেন, হাতুরুসিংহের কাজটা ভাগাভাগি করে নেবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন বিসিবি সভাপতিকে। সেই মতামত নিয়ে বড্ড ভুল করেছেন বিসিবি সভাপতি, তিনটা সিরিজের প্রতিটার ট্রফি হাতুরুসিংহের শ্রীলংকা জিতে নেয়ায় তা উপলদ্ধি করছেন বিসিবি সভাপতি। ফিল সিমন্স বাংলাদেশের জন্য লম্বা সময় অপেক্ষা করে যোগ দিয়েছেন আফগানিস্তান ক্রিকেট দলে।আফগানিস্তান দলকে তিনি ধীরে ধীরে নিয়ে যাচ্ছেন অন্য এক উচ্চতায়। বিসিবি’র পছন্দের পাইবাস আবারও ওয়েস্টইন্ডিজ দলে যোগ দিয়েছেন।তাঁর এই কোচিং দক্ষতা নিয়ে খোদ ক্যারাবীয়ান দল এখন দ্বিধাবিভক্ত।খেলোয়াড়রা জড়িয়ে পরেছেন কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ।

গত ৪ বছরের দেখা বাংলাদেশ দলের সঙ্গে আজকের দলকে মেলাতেই পারছেন না বিসিবি সভাপতি।  দলের পারফরমেন্সে নাকি মনই ভেঙ্গে গেছে বিসিবি সভাপতির। তাঁর ভাষায়, “এটা বাংলাদেশ দল আমার কাছে মনে হয়নি। সত্যি বলতে কি, ফাইনাল খেলার দিন আমার মনটা একেবারে ভেঙ্গে গেছে।” তার মতো মন ভেঙ্গেছে কোটি টাইগার ভক্তদের। সিদ্ধান্তে কঠোরতার অভাব, বোর্ডের কর্তাব্যাক্তি ও সিনিয়র ক্রিকেটারদের  মাঝে দড়ি টানাটানি আর ক্রিকেট রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভবিষ্যত যে খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াবে তাতে অভিজ্ঞ মহলের কোনো সন্দেহ নেই।

ছবিঃ  গুগল