পার্কে প্রেমের দিন

ইরাজ আহমেদ

আমাদের এক বন্ধু বলতো পার্কের সবুজ ঘাসের আচ্ছাদনের মাঝে মাঝে দাঁত বের করে মাটি বের হওয়ার কারণ হচ্ছে প্রেমিক যুগল। প্রেমিক-প্রেমিকাদের কথা ফুরিয়ে গেলে তারা পার্কের ঘাসও ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে দেয়। আর তাতেই জায়গায় জায়গায় এমন দুরাবস্থা।

লিখতে বসে বন্ধুটির কথা মনে পড়লো। আর ওর কথার সূত্রে মনে পড়ে গেলো এই শহরে পার্কে প্রেম পর্বের কথা।বছর তিরিশ আগে এই রাজধানী শহরে কয়টা পার্ক ছিলো? নতুন শহরে বিখ্যাত রমনা পার্ক আর সোহরাওয়ার্দিী উদ্যান। পুরনো শহরে বলদা গার্ডেন আর মিরপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেন। সবুজে মোড়া আর গাছে ছাওয়া জায়গাগুলোই একদা ছিলো নাগরিক ভালোবাসা বিকশিত হওয়ার অভয়ারণ্য।যুগলরা পার্কে যেতো প্রেম করতে। পার্কে প্রেমিকা অথবা প্রেমিককে নিয়ে বসে প্রকৃতি উপভোগ করা আর মনের কথার অর্গল খুলে দেয়ার সংস্কৃতিটা অবশ্য এই শহরে বেশ প্রাচীনই ছিলো। ছোটবেলায় পড়তাম ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী স্কুলে। স্কুল শেষে সিদ্ধেশ্বরী এলাকার বাড়িতে ফেরার পথের বেশীরভাগটা জুড়েই ছিলো রমনা পার্ক আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। দুপুরের রোদ উপেক্ষা করে সেখানে তখনও দেখা যেতো সিমেন্টের তৈরী বেঞ্চে যুগলদের বসে থাকতে। মাঝে মাঝে তাদের ঘনিষ্ট অবস্থান দেখে শিহরিতও হতাম। অনেকের প্রেমের প্রথম চুমুর সাক্ষীও হয়তো এইসব পার্ক আর উদ্যান।

তখন এখনকার মতো চেইন রেস্তোরাঁয় ভরে যায়নি শহর। মাত্র কয়েকটি চৈনিক রেস্তোরাঁর লড়াই চলতো পার্কের সঙ্গে। এখন তো ভালোবাসা আসে ডাকাতের মতো মশাল জ্বালিয়ে। পার্কের সেই মিষ্টি বিকেল অথবা ঝকঝকে রোদের দুপুরের স্বাদ মুছে গেছে।বড় বড় চেইন রেস্তোরাঁর শীতল হাওয়ায় বসে চড়া স্বরে বাজা গানের সঙ্গে চলে প্রেমের আয়োজন। সামনে থাকে রাশি রাশি খাবার। সেই বাদাম ভাঙ্গার কাল শেষ হয়ে গেলো এই শহরে।

বাদামওয়ালারা ছিলো তখন পার্কের বিশাল এক চরিত্র। গলায় গামছা বেঁধে বাদামের ঝুড়ি নিয়ে তারা ঘুরতো যুগলদের আশপাশে। মাঝে মাঝে যুগলদের একান্ত নিভৃতির মাঝে ঢুকে পড়ে বিরক্তির কারণও হয়ে দাঁড়াতো তারা।চুমু খেয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। আসতো পানি বিক্রেতা বালক। তখন পার্কে আরেক বিচিত্র চরিত্র ছিলো কান পরিস্কার করার লোক। এরা নানা রকম তেল আর পাখির পালক নিয়ে বসে থাকতো শিকার ধরার জন্য। বহু বেকার মানুষ কান পরিস্কারের উছিলায় এসে প্রেমিক-প্রেমিকাদের কাছাকাছি কোনো বেঞ্চে অবস্থান নিতো। অবলোকন করাই ছিলো তাদের একমাত্র কাজ। এ ধরণের যুগলদের তখন পার্কের ঝোপড়া গাছের তলায়ও বসতে দেখা যেতো। দয়িতার হাতে সামান্য একটু স্পর্শ অথবা ঠোঁটে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চুম্বন এঁকে দিতে এই আড়াল হয়ে উঠতো অসাধারণ।

পার্কের বেঞ্চের কাঠের তৈরী হেলান দেয়ার জায়গায় অথবা গাছের গায়ে ছুরি দিয়ে নিজেদের নাম লিখে যাওয়া ছিলো প্রেমিকদের বড় একটি কাজ।নিজের নামের সঙ্গে যোগ চিহ্ন দিয়ে লেখা হতো প্রেমিকার নাম। নিচে অগোছালো হাতে কেটে কেটে আঁকা হতো হৃদয় চিহ্ন।

তখন বলছিলাম বাদামের কথা। পাঁচ টাকার বাদাম কিনলে অনন্ত সময় কেটে যেতো পলকে। সঙ্গে সামান্য একটু মরিচ মাখানো লাল রঙের লবণ। চা-ওয়ালা বলে কারো দেখা মিলতো না পার্কে। ঈদ অথবা যে কোন বড় উৎসবে যুগলদের পদচারণায় ভরে উঠতো পার্ক। দেখা মিলতো আইসক্রীমওয়ালা আর বেলুন বিক্রেতার।কষ্ট করে পকেটের পয়সা গুনে কিনতে হতো সেসব। সোহরাওয়ার্দিী উদ্যানে আশির দশকেও বসতো বেলুন আর এয়ার গান নিয়ে কিছু মানুষ। পাঁচ টাকায় বেলুন ফুটো করার খেলা।অনেক প্রেমিক তার প্রেমিকার কাছে নিজের বীরত্ব প্রর্দশন করতে মেতে উঠতো গুলি করে বেলুন ফুটো করার খেলায়।

আসলে প্রেমের রঙ তখন সাদা ছিলো।ঘাসের রঙ ছিলো সবুজ। পৃথিবীর বাতাসকেও আমরা এতোটা দূষিত করে তুলিনি। তখন প্রেমের শরীরে পড়েনি এতো রঙ, এতো আলো। তার শ্রবণ ভারী হয়ে ওঠেনি এতোটা কলরবে। তাই পার্কে বসে অথবা হাঁটতে হাঁটতে প্রেম নিঃশ্বাস নিতো খোলা হাওয়ায়। তেমন প্রেমের দিন বোধ হয় এখন জাদুকরের ফুসমন্তরে উধাও-ই হয়ে গেলো।

ছবিঃ গুগল