নিউইয়র্কারদের ফাস্ট ফুড উন্মাদনা

স্মৃতি সাহা

জেগে থাকা নিউইয়র্ক শহর। কবি লোরকার ভাষায় স্লিপলেস সিটি। সেই শহরে স্বপ্নও যেন নির্ঘুম। এই শহরের দিনরাত্রির রোজনামচা স্মৃতি সাহার কলমে প্রাণের বাংলায় নিউইয়র্ক থেকে ধারাবাহিক ভাবে।

সামনে পিৎজার প্লেট অথবা কফি কাপের সঙ্গে ছোট্ট মাফিন, বসে আছেন নিউ ইয়র্ক শহরের কোনো ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয়। কাচের জানালার বাইরে বয়ে যাচ্ছে চলমান মানুষের ভীড়। ভেতরে চমৎকার সব খাবারের সুঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম নগরী নিউইয়র্ক। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে হয় এই নগরীতে। প্রতিটি মুহূর্তকে সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সর্বোত্তম ব্যবহারে সচেষ্ট থাকে সকল নাগরিক। আর ঠিক এ কারণেই এই শহর এত গতিশীল। শুধু গতিই নয়, প্রাণচাঞ্চল্যও এই শহরকে খুব সহজেই পৃথক করে অন্য যে কোন শীতের শহর থেকে। না ঘুমানোর এই শহর যেমন সদা জাগ্রত তেমনি নিজের নাগরিকদের সব রকম নাগরিক সুবিধা দিতেও সদা প্রস্তুত। তা দিন হোক বা রাত। মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে আনুষঙ্গিক সবকিছু নির্বিঘ্নে পেয়ে যায় এই শহরের নাগরিকরা। শুধু তাই নয় বিনোদন বা রিক্রিয়েশনের সকল ব্যবস্থাও আছে শহরজুড়ে। আর এ কথার সূত্র ধরেই আজ এই শহরের নাগরিকদের কিছু পছন্দনীয় রেস্টুরেন্টের গল্প বলবো।
বেশ কিছুদিন আগে নিউইয়র্কারদের কফি প্রীতি আর স্ট্রিট ফুড নিয়ে বলেছিলাম। আজ বলবো নিউইয়র্কারদের ফাস্ট ফুড উন্মাদনা নিয়ে। নিউইয়র্কের প্রায় প্রতিটি জায়গায় রয়েছে এই ফাস্ট ফুডের দোকান। বলতে গেলে প্রায় দু’চার ব্লকে একটি করে ফাস্ট ফুডের দোকান খুঁজে পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখ করা যায় ম্যাকডোনাল্ড’স,বার্গার কিং, হোয়াইট ক্যাসেল, কে এফ সি, উইন্ডিজ, চেকারস্, আরবিস, সাবওয়ে, পিজ্জা হাট সহ আরোও বেশকিছু ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্টের নাম। এই সকল রেস্টুরেন্টের মেন্যু প্রায় কাছাকাছি হলেও প্রত্যেক রেস্টুরেন্টের আলাদা বা স্বতন্ত্র রয়েছে খাবারের স্বাদের দিক থেকে। সাধারণত বার্গার, স্যান্ডুইচ, নাগেটস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্ন্যাক র্যাপ, বিভিন্ন ধরণের রিফ্রেশমেন্ট, সোডা এই রেস্টুরেন্টগুলোর মূল খাবার, যা প্রায় দিনভর পাওয়া যায়। আবার কোন কোন রেস্টুরেন্টে সকালের জলখাবারের ভিন্ন ব্যবস্থা থাকে। হটকেক, সসেজ মাফিন, সসেজ বিস্কুট, ফ্রুট-ম্যাপেল ওটমিল,হ্যাস ব্রাউন আরোও অনেক ধরণের খাবার থাকে সকাল বেলা। আমি আগেই বলেছি, ফাস্ট ফুড নিয়ে নিউইয়র্ক তথা আমেরিকান নাগরিকদের উদ্মাদনা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত, আবার কোথাও কোথাও সারা দিনরাত নিউইয়র্কারদের পদচারণায় মুখর থাকে এই রেস্টুরেন্টগুলো। আর সবচেয়ে অবাক করা আরেকটি বিষয় হলো বিভিন্ন বয়সের সকলকেই দেখা যায় এই সব রেস্টুরেন্টে তা সে বাচ্চা হোক বা বৃদ্ধ। সকল বয়সীদের কাছেই সমান জনপ্রিয় এই ফাস্ট ফুড এবং তার রেস্টুরেন্ট। নিউইয়র্কে এইসব ফাস্ট ফুডের রেস্টুরেন্টগুলোর চেইন স্টোর রয়েছে। তাই অসংখ্য শাখা ছড়িয়ে আছে বিশাল শহর জুড়ে। এখানে একটি কথা উল্লেখ করতেই হয়, তা হলো সকল রেস্টুরেন্ট একইভাবে জনপ্রিয় হলেও “ম্যাকডোনাল্ড” এর জনপ্রিয়তা একটু বেশী বা ঈর্ষনীয় পর্যায়ের। সকল বয়সী নিউইয়র্কারের মধ্যে ম্যাকডোনাল্ডের প্রতি দূর্বলতা খুব লক্ষ্য করা যায়। আবার অন্যদিকে “কে এফ সি” বা ” পিজ্জা হাট” এর জনপ্রিয়তা ম্যাকডোনাল্ডের তুলনায় একটু ম্রীয়মাণ বলেই চোখে বাধে। আর ঠিক এ কারণেই মনে হয় এই শহরের আনাচে কানাচে যত ম্যাকডোনাল্ড’স এর শাখা দেখতে পাওয়া যায় তার তুলনায় অন্য স্টোরগুলোর শাখা কম।
এইসব ফাস্ট ফুডের দোকানের সঙ্গে নিউইয়র্কের অর্থনীতির বেশ একটা সম্পর্ক আছে। কারণ এই শহরের বেশ বড় একটি জনগোষ্ঠীর আয়ের সংস্থান করে থাকে এইসব স্টোরগুলো। শিফট বেইজড এইসব স্টোরের কাজগুলো একদম নতুন আসা অভিবাসীদের জন্য বেশ উপযোগী হিসেবে কাজ করে। তাছাড়া এখানকার স্টুডেন্ট-রাও পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট টাইম জব হিসেবে এইসব স্টোরের জব-ই বেছে নেয়। পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল এই শহরে জীবিকা নির্বাহে ফাস্ট ফুডের এই স্টোরগুলো খুব গুরুত্ববহ ভূমিকা পালন করে। তাই বলা যায়, সব সময় ছুটে চলা এই শহরের মানুষগুলো যেমন দু’দন্ড জিরিয়ে নিতেই একটা বার্গার বা হট চকোলেট নিয়ে বসে এসব স্টোরে আবার অন্যদিকে শহরের জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ টিকে থাকে এসব স্টোরের জীবিকা দিয়েই। আর এইজন্যই মনে হয় ফাস্ট ফুড এই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে গভীর ভাবে।

ছবিঃ গুগল