ধুলোভরা বাতাসে…

আশিকুজ্জামান টুলু

(কানাডা থেকে): যারা একবার ইমিগ্রেশনের জন্য অ্যাপলাই করে, তাদের মনটা বাংলাদেশ থেকে ছুটে যায়, অস্থির হয়ে যায় মন, শুধু মনে হয় কখন যাবো কখন যাবো, কবে একসেপ্টেন্স লেটার আসবে । মনটা শুধু গেয়ে ওঠে “না মনো লাগেনা, এ জীবনে কিছু যেন ভালো লাগে না, না মনো লাগেনা” । ৬ মাস যায়, ১ বছর যায়, অস্থিরতা বাড়তে থাকে, শুধু মনে হয় কবে যাবো । দেড় বছর কাটে, দেখতে দেখতে ২ বছর চলে যায়, এবার শুরু হয় আত্মীয় স্বজনদের প্রশ্ন “কি হলো তোমাদের যাওয়ার? আমার এক আত্মীয় বললো যে কানাডায় নাকি আর ইমিগ্রেশন দিবেনা, আর তোমাদের কেসটাও নাকি ফাইনালি একসেপ্ট হবেনা, আর তাছাড়া ওখানেতো কোন জব নাই, সবাই ট্যাক্সি চালায়, এই ভালো আমরা যারা দেশে আছি, আমাদের বাবা অতো মাথা ব্যথাও নাই কোথাও যাওয়ার জন্য”

এরপর বউয়ের প্রশ্ন শুরু হয় “কি হলো??!! এতো দেরি হচ্ছে কেন?? আমাদের কি তাহলে হবেনা??
এসব শুনতে শুনতে মনটা একেবারে বিষিয়ে যায় । মানুষ জনের কথাবার্তা এই জ্বালাকে আরও দ্বিগুণ করে দেয় । আত্মীয় স্বজনরাও কষে তালি বাজাতে থাকে । কি যে এক অশান্তি আর জ্বালা । তারপর যখন সময়টা ৩ বছর ছোঁয় তখন ধীরে ধীরে আশাটা অবশ হতে থাকে, মনটাকে আবার বাঁধতে হয় খাঁচার মধ্যে । আর ভালো লাগেনা কিছুই, দেশের সব কিছুকেই যন্ত্রণা লাগতে থাকে বহু আগে থেকেই । শুধু মনে হয় কবে যাবো, কবে এই যন্ত্রনা শেষ হবে । 

হঠাৎ একদিন খুব সকালে চলে আসে একটা ডিএইচএল এর খাম, ব্যাস সব কিছুর সমাপ্তি – একসেপ্টেন্স লেটার । কেন যেন আর আনন্দ লাগেনা, আনন্দ লাগার অনুভুতিটা নষ্ট হয়ে যায়, অবশ হয়ে যায় মনের ভিতরটা মানুষের গঞ্জনায় । যাওয়া যতো কাছে আসতে থাকে অবচেতন মনে এক ধরনের খুশীর জোয়ার মনকে কানায় কানায় ভরে দেয়, সবাইকে ভালবাসতে ইচ্ছা করে, নিজেকে কেমন যেন অপরিচিত লাগতে থাকে চিরচেনা সবার মাঝে । রিক্সাওয়ালা, কাজের মানুষ, চা’ওয়ালা বা খেটে খাওয়া গরিব মানুষকে ইচ্ছা করে যতটুকু সম্ভব টাকা দিয়ে সাহায্য করতে । আস্তে আস্তে ভালোলাগা শুরু হয় । যারা এতদিন অনেক কথা বলেছিলো, তারাই প্রথমে এগিয়ে আসে কমপ্লিমেন্ট দিতে । টিকেট কাটা হয়ে যায়, বাক্স গোছানো হয়ে যায় এবং একদিন যাওয়ার দিনটাও ঘনিয়ে আসে ।সবশেষে পাখী উড়াল দেয় সুদুর নীলিমায়, ঠিক ওই গানটার মতো “একদিন পাখী উড়ে, যাবে যে আকাশে, ফিরবেনা সেতো আর কারো আকাশে” । আসলেই আর কোনদিনও ফেরা হয়না সেই চিরচেনা মেঘলা আকাশে বা ধুলোভরা বাতাসে কিংবা হাজার হাজার গাড়ী ঘোড়ার শহরে, প্রিয় জনপদে, পুরোনো শেকড়ে ।

ছবি: গুগল