বাংলা-ইংরেজি ভাষা শেখার প্রথম পাঠশালা

শ্যামলী আচার্য

(কলকাতা থেকে): আমাদের কিশোর বয়সে খবরের কাগজ ছিল বাংলা-ইংরেজি ভাষা শেখার প্রথম পাঠশালা। সেই তাগিদেই বাড়িতে গুরুজনেরা নিয়মিত দুটি খবরের কাগজ পড়ার পরামর্শ দিতেন। একটি বাংলা, অন্য একটি ইংরেজি। বলাই বাহুল্য টিভি তখনো জাঁকিয়ে বসেনি। ইন্টারনেটের, বা বলা ভালো গুগল জ্যাঠার থাবার কবলেও পড়িনি তখনো।
কাজেই কানে শুনি রেডিও, চোখে দেখি খবরের কাগজ। পড়ে ফেলি ঠোঙা থেকে শুরু করে তথাকথিত যা কিছু অপাঠ্য। সেই সময়েই দৈনিক খবরের কাগজে এই নামটির সঙ্গে আমার জান-পহেচান। তিনি সুমন চট্টোপাধ্যায়। সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায়। যদিও ওনার রিপোর্ট যখন আসে পাঞ্জাব, আফগানিস্তান বা রাশিয়া থেকে, সেই বিক্ষুব্ধ সময়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের চেয়েও আমাকে বেশি টেনেছিল সে লেখার প্রসাদগুণ… হার্ড নিউজের অমন সুরম্য পরিবেশনা তার আগে বা পরে অত দাগ কেটে বসেনি।

সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায়

কি এক কাকতালীয় ভাবে আমাদের প্রজন্ম ইশকুল গন্ডি ছেড়ে কলেজে পা রাখা মাত্রই আর-এক চাটুজ্যে সুমন আমাদের প্রভাবিত করে ফেলতে লাগলেন। আর সমনামী দু’জনের ক্ষেত্রেই রাজনীতি-অনভিজ্ঞ আমি আশ্চর্যজনক এক সাদৃশ্য খুঁজে নিতে শুরু করেছি সেই সময় থেকেই।
সেই সাদৃশ্য বাঙালিয়ানার। সে সাদৃশ্য আন্তর্জাতিক স্তরে দাপটের সঙ্গে নিজেদের জাত চিনিয়ে দেওয়ায়। এবং অবশ্যই সপাট সাবলীল স্পষ্ট বাংলা ভাষা ব্যবহারে। সত্যি কথা বলতে কি, রাজনৈতিক খবরের বিশ্লেষণ হোক, বা সমাজের কোন বাঁকবদল, দুজনের কাছেই আমার পড়ুয়া-জীবনে আকণ্ঠ ঋণী হয়ে থাকা।

প্রেক্ষাগৃহে বসে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গান শোনা ছাড়া গায়ক সুমনের সঙ্গে তেমন কোনও মনে রাখার মত সাক্ষাৎ আমার ঘটেনি। যেটুকু ঘটেছে, সেটুকু না ঘটলেই নয়, এইরকম কারণবশত। এখানে এ বিষয়ে বলতেও বসিনি।
কিন্তু খবরের কাগজের জগতে তিন যুগ ধরে ধারালো যুক্তি সাজিয়ে নিজেকে প্রায় ব্র্যান্ড করে তুলেছেন যিনি, সেই সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার প্রথম মুখোমুখি আমার মত এক চুনোপুঁটির কাছে অন্তত এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।

মজার কথা হল, আমি সেদিন একটি ছোটখাটো কাগজের ফিচার-লেখক, সুমনদা তখন ‘একদিন’ পত্রিকার যাবতীয় দায়িত্ব সামলে চলেছেন। বাজারে জোর খবর, একটি নতুন বাংলা কাগজ অচিরেই ঝাপিয়ে পড়তে চলেছে। আর সেই কাগজ-কর্তৃপক্ষ সর্বময় কর্তার দায়িত্বে চায় এই অভিজ্ঞ মানুষটিকেই। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক অংশটি হলো আমার অ্যাসাইনমেন্ট। চিরকাল আমাকে ‘ইন্টারভিউ নিয়ে আসুন’ বলে গায়ক-নায়ক-লেখক ইত্যাদি মানুষ-জনের কাছে পাঠানো হয়। এবার নির্দেশ, সুমনদার একটা ইন্টারভিউ নিয়ে আসবেন?
উত্তেজনা তো আছেই, সঙ্গে সংশয়। এই সদ্যোজাত খবরের কাগজটির প্রতিনিধিকে কতটা সময় দেবেন তিনি? কেনই বা দেবেন? জানতে চাওয়ার বিষয় অসংখ্য। সাধ সীমাহীন। দুঃসাহসও কম থাকলে এসব ক্ষেত্রে চলে না। অতএব দূরভাষে প্রথম অনুরোধজ্ঞাপন। প্রত্যুত্তরে ওনার না-লুকনো বিস্ময়। তারপর বেলেঘাটায় ‘একদিন’ পত্রিকার অফিসে ডেকে পাঠানো। সেদিন দেখা মিলেছিল, সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়ে গেলেন এবং বাড়িতেও চলে গেলাম নির্দিষ্ট দিনে।
ঘন্টা দেড়েক সময় কোথা থেকে উড়ে গেল। আফগানিস্তান থেকে শ্রীলংকা, বেনজির ভুট্টো থেকে ইন্দিরা গান্ধী– রাজনীতি এড়িয়ে শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ। স্মৃতির মধ্যে ফিরে আসে বাড়িতে সকাল থেকে বেজে চলা আকাশবাণী, মায়ের গান শোনার অদম্য নেশায় নিজের মনে গেঁথে যাওয়া যত বাংলা গান, অধ্যাপক বাবার ইতিহাস চর্চা, বহু সাহিত্যিক-সাংবাদিকের সান্নিধ্য, নিয়ম করে পড়া তরুণ কবির বাংলা কবিতা… আরও অনেক কিছু।
অফিসে ফিরে আসি। সে ইন্টারভিউ ছাপা হয়নি। কারণ অজ্ঞাত। সুমনদাকে টেলিফোনে কুণ্ঠাভরে জানাই সে কথা। স্বভাবসিদ্ধ ঔদার্যে আমার সেদিনের অস্বস্তি মুছে দেন। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্যের পর্ব আরও বাকি ছিল। আমার সেই মোবাইল রেকর্ডারটিও তার কয়েকদিন পরে হারিয়ে যায়। কাজেই, সেই ‘হঠাৎ-আলোর ঝলকানি’ দেড় ঘণ্টা সময় আমার মাথার মধ্যে কোনও এক প্রকোষ্ঠে বসে থাকে। কিছু ঝাপসা, আবছা, কিছু স্পষ্ট। বরং ঐ দেড় ঘণ্টার সাক্ষাৎকার আমাকে পৌঁছে দেয় ‘একদিন’ পত্রিকার দরজায়। আমি যেদিন অফিসে ঢুকি, তার ঠিক আগের দিন সুমন চট্টোপাধ্যায় চলে গেছেন ‘এই সময়’-এর দফতরে।

ধানসিড়ি প্রকাশন উনার একটি অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করতে চলেছে জেনে আবার মনে পড়ে গেল সেই সব কিছু শোনা, কিছু আবছা হয়ে যাওয়া কথাবার্তা। চটপট বই জোগাড় করে পড়েও ফেলি গোগ্রাসে। যদিও ‘ধুত্তোর সম্পাদকীয়’ অনেকদিন ধরেই বুঝিয়ে দিয়েছে সুমনদা এবার তাঁর চার দশকের সাংবাদিক জীবনের যাবতীয় অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে মণি-মুক্তো তুলে আনছেন। তবু, শুভাশিসদার মত এক অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন সুমনদার মুখোমুখি, তখন কিছু বাড়তি আগ্রহ তো তৈরি হবেই। বেশ কয়েকবার পড়ি। এই পড়া তো ঠিক অজানাকে জানার কৌতূহল নয়, বরং কোন রসায়নে একজন ব্যক্তি নিজে ‘ব্র্যান্ড’ হয়ে ওঠেন… মনের জোর, সাহস, অপরিসীম পরিশ্রমের ধকল নেবার ক্ষমতা, নিজেকে ক্রমাগত শিক্ষিত করে চলা… এবং অবশ্যই অস্বাভাবিক ঝুঁকি নেবার প্রবণতা।
আর একটি গুণ। যে গুণ বাঙ্গালিকে আন্তর্জাতিক করেছে। সে গুণ, বাংলা এবং ইংরেজি– দুটি ভাষাতেই সমান দক্ষতা। সুমন চট্টোপাধ্যায় চাইলেই ইংরেজি সাংবাদিকতায় যেতে পারতেন। যাননি। কারণ, মাতৃভাষার প্রতি দুর্বলতা। চেয়েছেন বেঙ্গল টিমের ক্যাপ্টেন হতে। তাই হয়েছেন। যে সময়ে বাঙালি ছেলেমেয়ে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়েও ইংরেজিতেও সমান দক্ষ হয়, উনি সেই উদাহরণ তুলে আনেন কয়েক লক্ষ। দ্বিভাষিক জাতি হিসেবে বাঙালির যে গর্ব ছিল, একের পর এক যুক্তি দেখিয়ে বলেন, তার সুফল বাঙালি সবকিছুতে পেয়েছে। তার সাহিত্য, সংস্কৃতি– সর্বত্র। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায় বা নীরদ সি চৌধুরীর কথা যদি সরিয়ে রাখি, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ থেকে শক্তি চাটুজ্যে বা উৎপল দত্ত, সমর সেন, সরোজ আচার্য, শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্ত পর্যন্ত বাঙালির এই দুটি ভাষায় সমান দক্ষতা তাকে ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক ‘দাদাগিরি’তে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছে। এই প্রজন্মের সাংবাদিকতার পেশায় আসা ছেলেমেয়েরা ভাবতেই পারবে না, সন্তোষ কুমার ঘোষ প্রথমে ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’ এডিটরিয়াল বলে যেতেন, তারপরেই আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়। রাত্রিবেলা প্রেসে দাঁড়িয়ে লোহার সেটিংএর বাঁদিকের পাতা করতেন ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’য়ের, ডানদিকে করতেন আনন্দবাজার। একসঙ্গে।
আজ তো অধিকাংশ বাঙালি ছেলেপুলে একটাই ভাষা জানে, তাও ভাল করে জানে না, তার নাম বাংলা। আর যারা ইংরেজি মাধ্যম, তারা শুধুই ইংরেজি। তারা মনে করে, বাংলা ভাষা কোন শিক্ষিত লোকের ভাষাই নয়!

এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে, এই কথাগুলোই আবার ভাবছি বসে।

‘শিয়রে সুমন’

একটি জম্পেশ নামের আড়ালে মুহুর্মুহু আলোর ঝলকানি।

ছবি: গুগল