বাকী থাক তবে কিছুটা…

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

হলদে আলোর ঘন ধোঁয়া কেটে গাড়িটা এগোচ্ছে…। স্পিড বড় জোর ১২-১৫..। তার বেশি তোলা যাচ্ছে না একটুকুও…। চাকাটা এক পাক গড়িয়ে যতটা যায়, ততটা দূরও দেখা যাচ্ছে না কিছু…। ড্রাইভারের সিটে বাদলদা…। হাত স্টিয়ারিংয়ে থাকলেও, শরীরের অর্ধেকটা জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আছে…। কারণ উইন্ডস্ক্রিন ঢেকে যাচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে…। বারবার ভিতর-বাইরে মুছেও বাড়ছে না তার স্বচ্ছতা…। পাশের সিটে আমি বসে শরীরের অর্ধেকটা বার করে রেখেছি বাঁ দিকে…। বলতে থাকছি, কয়েক ইঞ্চি দূর পর্যন্ত দেখা যাওয়া রাস্তায় কোনও বাধা আছে কি না…।

প্রায় গরম পড়ে যাওয়া বসন্তে এত গভীর ধুলো-আলো-কুয়াশার পরত আমাদের অচেনা…। পেছনের সিটে বসে সৌভিকদা, তাপসদা, বোবো…। বোবোও চুপচাপ হয়ে গিয়েছে…। মাঝে মাঝে শুধু পাছু দিয়ে আর মাথা দিয়ে তাপসদাকে প্রচণ্ড গুঁতিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করার চেষ্টা করছে…। তাপসদার আর্ত চিৎকারে বনপথের নৈঃশব্দ্য ভাঙছে প্রায়ই…। ঝাড়গ্রাম স্টেশনে নেমে এই কুয়াশার দেশে ঢোকার আগে পর্যন্ত আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম সাঁ সাঁ করে…। তখন বোবোও বেশ ফূর্তিতে ছিল…। সিটের মাঝখান থেকে মুখ বাড়িয়ে বারবার কনুই চেটে দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল, ‘‘এই মাঝরাতে হঠাৎ তুমি এসে পড়ায় আমি বেশ খুশি হয়েছি…।’’ কিন্তু এই কিচ্ছু না-দেখতে পাওয়া অসমান রাস্তায় চালানোর দক্ষতা বা সাহস কোনওটাই আমার নেই…। তাই বাদলদাই ভরসা…।

মেন রাস্তা থেকে ঝিল্লির পথ ধরার পরে খানিক হালকা হল কুয়াশার পরত…। এই করে করে ৬০ কিলোমিটার পথ আমাদের লাগল আড়াই ঘণ্টা…। ফলে রাত একটায় ট্রেন থেকে নেমে পড়লেও, সাড়ে তিনটেয় আমি পদার্পণ করলাম ঝিল্লি পাখিরালয়ে…। এক দিনের জন্য আমাদের ফুসফুসটাকে একটু শান্তি-সবুজে ধুয়ে নিতে…। আমার জন্য এক দিন, বাকিদের জন্য দু’দিন…। শুক্রবার অর্থাৎ দু’তারিখ সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছিল সৌভিকদা, সুদীপ্তাদি, গোবু, বোবো, বাদলদা, তাপসদা, তপনদা, আহেলী…। আমি অফিস নামক রাজকার্য সেরে রাতের ট্রেন ধরে পৌঁছলাম শনিবার ভোররাতে…।
তার পর মাংস-ভাত খেয়ে বসে আছি ঝিলের ধারে…। গভীর রাত আর কাকভোরের ঠিক মাঝের সময়টা বয়ে যাচ্ছে ঘড়িতে…। চরাচর ধুয়ে যাওয়া জ্যোৎস্নায় বিশাল এক কাচের মতো পায়ের নীচে বিছিয়ে আছে ঝিল…। শুরু-শেষ ঠাহর করা যায় না ভাল…। কেবল চোখে পড়ে গভীরতম বাঁধনে সব দিক দিয়ে তাকে ঘিরে রেখেছে বৃদ্ধ গাছেরা…।

পরের দিন অর্থাৎ শনিবার ঘুম ভাঙল কড়া রোদ্দুর চোখের পর্দায় ঝাঁপিয়ে পড়ার পরে…। চা, পাঁউরুটি, ডিমসেদ্ধ এসে পৌঁছনো পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে পারল না আহেলীর ব্যাগে ভরা রং, আবির, পিচকিরিগুলো…। হৈ হৈ করে শুরু হয়ে গেল আমাদের ছোট্ট বসন্ত উৎসব…। রঙে-জলে-আবিরে সবাই সবাইকে ঢেকে ফেলার পরে রিটায়ার করলো পিচকিরিরা…। তখন বালতিসুদ্ধ মাথার উপরে উপুড় করার পালা…। বোবো মহা উৎসাহে দূর থেকে চিৎকার করছে…। নিজে তো মাখতে পারছে না, তাই চেঁচিয়েই আশ মেটাচ্ছে…। একটা সময়ের পরে গোবু পাগল হয়ে গেল…। এক বার মগে করে রং তুলে নিজের মাথায় ঢালে, এক বার নিজের মাথা চুবিয়ে দেয় রংভরা বালতিতে…। তার পরে একমুঠো আবির নিয়ে নিজের বুকে-পেটে আচ্ছা করে মাখলো…।

এ সব নানা রঙ্গ সেরে দুপুর বাড়তেই ঝপাং করে ঝিলে ঝাঁপ…। স্নান সেরে ডিমের ঝোল দিয়ে ভাত সাবাড় করে কেউ ঘুমোল, কেউ কেউ অপেক্ষা করতে লাগল বিকেলের…। অপেক্ষার উপকরণ হিসেবে দোলনা-স্লিপ আছে, আছে গান, আছে ঘাটে বাঁধা নৌকো…। ও দিকে, যে কোনও কারণেই হোক বোবো সারা দিন কিছু খায়নি…। আমি থালা ভরা খাবার নিয়ে গল্প বলতে বলতে ওকে খাওয়তে বসলাম…। কিছুতেই খাবে না, জেদি বাচ্চারা যেমন হয় আর কি…। শেষে যখন বলতে শুরু করলাম, ‘‘জানিস কত কুকুর খেতে পায় না… জানিস, হোস্টেলে গেলে তোর আর এই বাড়ির খাওয়া জুটবে না…’’ — তখন দিব্যি সুড়সুড় করে খেয়ে নিল ছেলে…।

পাশাপাশি শুরু হল সন্ধের কাবাব আর রাতের বিরিয়ানি তৈরির প্রস্তুতি…। তাপসদা দায়িত্ব নিয়েছিল শনিবারের এই গ্র্যান্ড মেনুর…। আমি শিওর ছিলাম, ব্যাপারটা ছড়াবে…। এত সোজা নাকি…!! কিন্তু আমরা আড্ডা দিতে বসার আধ ঘণ্টা পর থেকেই যখন তুলতুলে নরম চিকেন রেশমি কাবাব মুখের সামনে এসে পৌঁছতে শুরু করল, সত্যি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম…।

ও দিকে কাঁসার থালার মতো খুনি চাঁদটা জঙ্গলের দেওয়াল ভেঙে মাথা চাড়া দিয়েছে…। ঝিলের গায়ে তার অপরূপ এবং স্পষ্ট প্রতিবিম্ব…। বেশি ক্ষণ চেয়ে থাকা যায় না…। ভয় হয়, দৃষ্টি হয়তো আর সরাতেই পারব না..! নৌকো নিয়ে বেরোলাম কিছু ক্ষণের জন্য…। দুধের সরের মতো জ্যোৎস্না বিছিয়ে আছে ঝিল জুড়ে…। কিছু ক্ষণ ভেসে থাকার পরে শরীর-মন অবশ হয়ে আসে…। এত চাঁদের আলো বুঝি ভাল নয়…! ভাল-খারাপের বোধ হারিয়ে চাঁদ কিন্তু তার আলোর তীব্রতা বাড়িয়েই চলে…। ঠিক যেমন আমরা মায়া বাড়িয়ে চলি কোনও কিছু না ভেবেই…। যেমন কিছুতেই আগল তুলতে পারি না বুকের ভিতরের মায়াঘরের দুয়ারে…। যেমন স্রোতের মতো সে বয়েই চলে মন থেকে মনে, দেহ থেকে দেহে…। আলোর পাশাপাশি, রহস্যময় নিস্তব্ধতায় অন্ধকারও বাড়তে থাকে ঘিরে থাকা জঙ্গলে…। কোথাও বুঝি দুঃস্বপ্ন দেখে ককিয়ে ওঠে এক রাতচরা পাখি…। চার পাশে যেন থোকা থোকা নেশা, রাশি রাশি মোহ…। বেঁচে থাকার লোভ চড়তে থাকে হু হু করে…। এ জীবন ভালবেসে তোমাকে চাইতে ইচ্ছে করে গভীর ভাবে…। এমনি করেই কি মানুষ চন্দ্রাহত হয়…?

এত্ত কম সময়ে বানিয়ে ফেলা সুপার-টেস্টি বিরিয়ানির জন্য এ বছরের নোবেল পুরস্কারের নমিনেশনে তাপসদার নাম পাঠিয়ে দিয়েছি আমি…। এমনি তৃপ্তি করে বিরিয়ানি এর আগে খুব কমই খেয়েছি আমরা…। এর পরের বাকি রাত মন খারাপিয়া…। কারণ জানি, ঘুম ভাঙলেই শুরু হবে ফেরার প্রস্তুতি…। এ ফেরা আসলে ফেরা নয়, যাওয়া…। শহরে যাওয়া…। শহরে আমাদের যাওয়া হয়, থাকা হয়, দিনের পর দিন পার করা হয়, কিন্তু বাঁচা হয় কই…! ফেরা মানে তো শান্তি, ফেরা মানে স্বস্তি…। ফেরা মানে বুক ভরা প্রশ্বাস…। তেমনটা এই এক-দু’দিনের বাঁধন ছেঁড়া দিয়েই অনুভব করা যায় কেবল…। কংক্রিটের ক্যাকোফনিতে নয়…।

ব্যাগ গুছিয়ে, সব মিটিয়ে ফেরার পথ…। সিস্টেমে বাজে পার্বতী বাউল, আর বুকের ভিতরে মন খারাপ…। ঘণ্টা ছয়েকের পথ ফুরোয়…। হাইওয়ে পার করে হুট করে শহরে ঢুকে পড়ে আমাদের গাড়ি…। এক সময় মুখের সামনে এসে যায় অফিসের গেট…। আর কোনও গল্প তৈরি হয় না, মায়া তৈরি হয় না…। খটখটে শুকনো কাজের দুনিয়ায় ঢুকে পড়ি ক্লান্ত শরীরে…। খালি মনে পড়ে, কাল এই সময় চাঁদ উঠছিল, এই সময় জলে ভাসছিলাম, এই সময় উপুড় হয়ে ঘাসের গন্ধ শুঁকছিলাম…।

ঘাসের গন্ধ মাখা জীবনের স্বপ্ন দেখতে দেখতেই শুরু হয় পরের বাঁধন ছেঁড়ার পরিকল্পনা…। পলাশের সঙ্গে দেখা হয়নি এ যাত্রা…। বাকি থেকে গিয়েছে বুকপকেটে লাল শরীরের ফুল জমানো…। বাকি থাক…। কিছু বাকি থাকা ভাল…।
কারণ তুমি তো জানোই, সব পেলে নষ্ট জীবন…:)

ছবি: লেখক