নারীদিবস এবং বাংলাদেশের নারী

আন্জুমান রোজী,(টরন্টো প্রতিনিধি)

নারীদিবসের গুরুত্ব, মহাত্মা অনেকের কাছে খুবই হেয় এবং গৌণ মনে হয়। এমন কি বুদ্ধিজীবী লেবেলের কবি, সাহিত্যিক, লেখকদের মধ্যেও কেউ কেউ বলেন, এখন আর নারীদিবসের দরকার কি? নারীদিবসের দরকার কি কথাটার উত্তর দিতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে, স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্ব কি! বিজয়দিবসের গুরুত্ব কি! মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব কি! আমরা কেন এসব দিনগুলো গুরুত্বসহকারে পালন করি! কেন এর মর্মার্থ তুলে ধরি! কেন বারবার স্মৃতির দরজায় টোকা দিয়ে তাকে জাগিয়ে তুলি! যেন মানুষ স্মৃতিভ্রষ্ট না হয়। মানুষ যেন বুঝতে পারে তার শিকড় কোথায়। যতই এই শিকড়ের সন্ধান মানুষ করবে ততই মানুষ তার অবস্থানকে মজবুত করবে এবং চিন্তা-চেতনার জায়গাকে শাণ দিবে। সেইসঙ্গে করবে জীবনকে ঋদ্ধ। বুঝে নেবে তার করণীয় সবদিক,  দিব্যচোখে দেখে নেবে  ভবিষ্যৎকে। যার জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের শুরু বা শিকড়টা বারবার বুঝে নিতে হয়। নারীদিবসটা সেই অর্থে গুরুত্ব রাখে সর্বাগ্রে।

নারী অধিকার, নারী সচেতনতার মূলমন্ত্র নারীদিবস। এই দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরতে হলে তার ইতিহাসকে প্রথমে তুলে ধরতে হয়। এতে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্রে  সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা  মজুরি পুরুষের  সমান পাওয়ার জন্য  ১৮৫৭ সালে এই আন্দোলন শুরু করে। শুধু মজুরিই নয়, কাজের ঘন্টা আর অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করে। সেইসময় নারীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়ন চলে। তারপর ১৯০৮ সালে জার্মানের সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়।  এরপর ১৯১০ সালে  আবার ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। তাতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় প্রতি বছর ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারীদিবস পালন করা হবে। এই সম্মেলনে ১০০জন নারী নেতৃত্ব অংশগ্রহণ করেন।  অতঃপর ১৯৭৫ সালে ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিকভাবে নারীদিবসকে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং জাতিসংঘ বিভিন্ন রাষ্ট্রকে দিবসটি পালনের জন্য আহবান করে। স্বাধীনতার পূর্বকাল  থেকে বাংলাদেশেও দিবসটি বিশেষভাবে পালিত হয়ে আসছে। বলতে গেলে ১৮৫৭ থেকে নারী অধিকার আদায়ের আন্দলনের  সূত্রপাত হলেও আজ অবধি সেই একই ধারায় নারীদের এই যুদ্ধ চলছে। যদিও সময় বদলেছে,  কিন্তু সমাজের মানসিকতা সেভাবে পরিবর্তন হয়নি। তাই  নারীদিবস  সমগ্র পৃথিবীজুড়ে নারীর সমঅধিকার আদায়ের একটি বিশেষদিনে পর্যবসিত হচ্ছে।

এক এক প্রান্তে নারীদিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য এক এক রকম হয়। কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপনের মুখ্য বিষয় হয়, আবার কোথাও মহিলাদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা পাওয়া বেশি গুরুত্ব পায়। তৃতীয় বিশ্বে নারীর আর্থিকমুক্তি এবং নারীর সচেতনতা বৃদ্ধির দিকটি বেশি গুরুত্ব পায়;  গুরুত্ব পায় নারীর শিক্ষার হার বৃদ্ধির। এই দিকগুলো মাথায় রেখে সচেতন নারীরা  আন্দোলন,  প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন। দৃশ্যত নারীরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারছে না অস্থির রাজনীতি আর ধর্মীয় আগ্রাসনের কারণে। তারপরেও পরিবর্তন যে একেবারে আসছে না তা নয় কিন্তু, আসছে। প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়েও নারীরা জেগে উঠছে। নারীশিক্ষার হার যেদেশে বেশি সেদেশই সর্বাংশে উন্নতির সোপানে আছে।  তাছাড়া নারীদিবসের গুরুত্ব শুধুমাত্র নারীর জন্য ভাবলে ভুল হবে, এরসঙ্গে পুরুষের বিষয়টাও জড়িত।  কারণ, নারীই হলো সৃষ্টির মূলের কারিগর। নারী শিক্ষিত মানে পুরো মানবজাতি শিক্ষিত। 

 সেই অর্থে বাংলাদেশের চিত্র লক্ষ্য করলে বোঝা যায় নারীর অবস্থানটা কোথায়।  এখানে নারীকে অবলা ভেবেই মূল্যায়ন করা হয় বেশি। সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আছে। নারী পুরুষের মুখাপেক্ষী হয়ে চলবে বা থাকবে, এটাই হলো বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের মানসিকতা।  এই মানসিকতার বেড়াজাল ভেঙ্গে নারী এখন বেরিয়ে আসছে। নারী নিজেও একক মানুষস্বত্বা তা বুঝিয়ে দেয়ার সবরকম কৌশল নারী এখন খাটাচ্ছে। অকপটে নিজেকে উগরে দিচ্ছে, লেখায়, কথায়, কাজে ; বুঝিয়ে দিচ্ছে আমরাও পারি। যদিও ধর্মীয় মৌলবাদী গুষ্টি নারীর চলার পথে চরম বাঁধা হয়ে আছে। তবে এ বাঁধার প্রাচীর একদিন সচেতন নারীকুল ভাঙবেই এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যেটুকু পরিবর্তন এসেছে নারীদের ক্ষেত্রে, তাতে একটা ইতিবাচক দিক আছে বলে আমি মনে করি। অনেকে মনে করেন, বেগম রোকেয়া যেভাবে নারীকে শিক্ষা, দীক্ষায়, সচেতনতায় স্বয়ম্ভর করে তুলতে চেয়েছেন, সেই অর্থে নারী এগিয়ে যায়নি। কিন্তু রেগম রোকেয়ার সেই দীক্ষা কেউ কেউ এখনো  বহন করছে বলে নারী সচেতনতার দ্যুতি চারদিকে ছড়াচ্ছে। তবে বাস্তবতা বলে  বেশিরভাগ নারীই নারীস্বাধীনতা নামে স্বেচ্ছাচারিতায় ভুগছে।  হয়তো এভাবেই নারী তার অবস্থান দৃঢ় করছে, হয়তো এভাবেই নারী প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে। পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হলে কোনো কোনো নারী মনে করেন,  নারীকেও কখনো কখনো স্বেচ্ছাচারী হতে হয় বৈকি। একে নেতিবাচক অর্থে যতটুকু মূল্যায়ন করা হয়, তার থেকে কিছুটা হলেও ইতিবাচক দিকগুলো খুঁজলে হয়তো নারীর সমস্যাগুলো বোঝা যাবে, যা থেকে নারীর চলার দিকনির্দেশনা বের করা সম্ভব। তবে সবকিছুই সময়ের ওপর নির্ভর করে। ভাঙ্গাচোরার মধ্য দিয়েই একটি অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছাতে হয়। বাংলাদেশ হয়তো সেই সন্ধিক্ষণেই আছে।  একদিন বাংলাদেশের নারীরাও জেগে উঠবেই এবং নারীদিবসের মর্মার্থ ধারণ করেই এগিয়ে যাবে।

ছবিঃ গুগল