আমাদের শেষ উঠান

ইরাজ আহমেদ

আমার শেষ উঠানটা ছিলো বেশ অগোছালো। বাড়ির পেছন দিকে সেই উঠানের একপাশে একটা লেবু গাছ। একটু দূরে বিশাল এক শিউলি গাছ ছিলো্। উঠান থেকে রাস্তায় যেতে অনেকদিন ধরে বন্ধ একটা কাঠের দরজা।যতদূর মনে পড়ে একটা মুরগির খোয়াড়ও ছিলো, বৃষ্টির দিনে কুকুরদের থাকার জন্য জং ধরা টিন দিয়ে তৈরী ছোট্ট একটা চালা।কিন্তু ওই উঠানটাকে ভালোবাসতাম আমি। ভাড়াটে বাড়ির সামনে একটু উঠান।

এই শহরে উঠানের গল্প ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। ষাট অথবা সত্তরের দশকে আমার শৈশবে এই শহরের বহু বাড়ির সামনেই দেখা যেতো উঠানের অস্তিত্ব। সেখানে কেয়ারি করা ফুলের গাছ লাগানো থাকতো, বেড়ে উঠতো সবুজ ঘাস, মাথা তুলতো পেয়ারা, আমলকি অথবা আম গাছ।উঠানের সবুজ রঙ করা দরজায় লেখা থাকতো ‘কুকুর হইতে সাবধান’, উঠানের একপাশে ঠেস দেয়া থাকতো পুরনো সাইকেল।তখন উঠান থেকে রাতের আকাশ দেখা যেতো। টের পাওয়া যেতো শীত, বসন্ত। বহুকাল আগে এক বাড়ির উঠানে প্রথম কুয়া দেখেছিলাম। বালতি ফেলে দিলে অনেক নিচে পানিতে পতনের শব্দ শোনা গিয়েছিলো…কেমন এক রহস্যে ভরে উঠেছিলো মন। পুরনো শহরের অনেক বাড়ির উঠানে কুয়া দেখা যেতো।সেই কুয়ার ওপর ছায়া বিস্তার করে থাকতো একটা শিরিষ অথবা পেয়ারা গাছ। কুয়ার পাশে দাঁড়িয়ে  গনগনে তাপে পোড়া কোনো চৈত্রের দুপুরে কাউকে দেখা যেতো বালতি বালতি পানি তুলে গোসল করতে। উঠানের ওপর টানানো তারে মানুষ ভেজা কাপড় মেলে দেয়া হতো। মনে আছে, শীতে এই উঠানে হতো ছোটখাটো পিকনিকের আয়োজন। মাটি দিয়ে তৈরী চুলায় হতো রান্নার ব্যবস্থা। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে চাল, ডাল ধার করে এনে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন হতো।কেউ কেউ আবার তাদের রান্না করা খাবারই পাঠিয়ে দিতেন আমাদের জন্য।খুব গরমের দিনের সন্ধ্যায় বিভিন্ন বাড়ির মেয়েদের দেখা যেতো উঠানে জমায়েত হতে। দেয়ালের বাইরে থেকে শোনা যেতো তাদের হাসি। পাড়ার ছেলেদের তখন মহা উৎসাহ থাকতো ওই বাড়ির আশপাশে ঘুরে বেড়ানোতে।

ওই যে শুরুতে বলছিলাম অগোছালো একটা উঠানের কথা। ওই উঠানে নানা জায়গা থেকে গাছ এনে পুঁতে দিতাম কোনো বসন্তে ফুল ফোটানোর আশায়। এলোমেলো ভঙ্গীতেই সেসব গাছ কখনো বেঁচে থাকতো আবার মরে যেতো। কখনো ফুল ফুটতো, আবার কখনো ফুটতো না। এই উঠানকে একদা আঙ্গিনা নামে ডাকা হতো। আমাদের ওই আঙ্গিনাতে প্রতি শীতে শ্রীহীন কোনো না কোনো পথের কুকুর অনেক বাচ্চা প্রসব করতো। পুরো শীতকাল সেই নাদুস নুদুস বাচ্চাগুলো ঘুরে বেড়াতো আঙ্গিনা জুড়েেএই

উঠান কখনো হয়ে উঠতো আমার একাকিত্বের আশ্রয়। যখন কোথাও কোনো কিছুই আর ভালো লাগতো না তখন চুপ করে বারান্দায় বসে থাকতাম উঠানকে সঙ্গী করে। উঠানে ঝরে পড়া শুকনো পাতা হাওয়ায় উড়তো অথবা বৃষ্টির ধারায় ভিজে যেতো মাটি। প্রথম বৃষ্টিতে মাটির সুঘ্রাণ ভেসে আসতো নাকে। আমি চুপ করে বসে থেকে সেই উঠানের প্রেমে পড়ে যেতাম আবারো।

এই শহরে উঠানের ব্যবহার ফুরিয়ে গেলো আশির দশকের অন্তিমে এসে।বাড়ির বাসিন্দাদের মনে হলো হয়তো বাসার সামনে এটুকু খোলা জায়গায় আরো কয়েকটা ঘর উঠতে পারে, দেয়া যেতে পারে দোকান। ব্যাস, মানুষের আগ্রাসী মনোভাবের সূত্র ধরে এই শহরের খালি উঠান ভরাট করে উঠতে শুরু করলো বাড়িঘর। ঢেকে গেলো উঠনের নিজস্ব নির্জনতা। মুছে গেলো আমাদের কত বেলা অবেলার গল্প সেইসব উঠানকে ঘিরে। যাকে একদিন আমরা আদর করে আঙ্গিনা বলে ডাকতাম।

ছবিঃ গুগল