স্ক্যান্ডালঃ ক্রিস্টিন কেলার

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে গোটা বিশ্বে সংবাদের শিরোনাম  হয়েছিলেন ক্রিস্টিন কেলার। জন্মসূত্রে বৃটিশ নাগরিক এই সুন্দরী তরুণী মডেল জড়িয়ে পড়েছিলেন বৃটেনের রাজনীতির উঁচু মহলে। যৌন কেলেংকারীর ঢেউ সে সময় ব্রিটিশ সরকারের গদিও টালমাটাল করে দিয়েছিলো।

ক্রিস্টিন কেলার

সে সময়ে এক রুশ গুপ্তচরের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো ক্রিস্টিনের। তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ ছিলো গুপ্তচরবৃত্তির। তার শয্যাসঙ্গী হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন বৃটিশ যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী প্রফিউমো। ক্ষমতা থেকে পতন ঘটেছিলো তখন ক্ষমতায় থাকা ম্যাকমিলিয়ান সরকারের।
ক্রিস্টিন কেলার ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। বেশ কয়েক বছর ধরে শ্বাসকষ্টজনিত জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি।
ক্রিস্টিনের মা ছিলেন লন্ডনের সোহোতে এক বারের ক্যাবারে ড্যান্সার। ক্রিস্টিনের জন্ম হয় লন্ডনের অক্সব্রিজ, মিডলসেক্সে।

জন প্রফুমো

বাবা কাজ করতেন ব্রটেনের রাজকীয় বিমান বাহিনীতে। তবে খুব অল্প বয়সে কন্যা আর স্ত্রীকে ফেলে ভদ্রলোক উধাও হয়ে যান। বাবার প্রস্থানের পর ক্রিস্টিনের জীবন নতুন করে শুরু হয় মা এবং তার পুরুষ বন্ধু টেড হিউশের সঙ্গে। ক্রিস্টিনের জীবন তখন উল্টোপাল্টা স্রোতে ঝরে পড়া কোনো পাতার মতো; এলোমেলো ভেসে চলা শুধু। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ক্রিস্টিন গর্ভবতী হন। তার সঙ্গী ছিলেন এক আমেরিকান। পুত্র সন্তানের মা হয়েছিলেন ক্রিস্টিন। নাম রেখেছিলেন পিটার। তবে জন্মের ছয় দিন পরেই পিটার মারা যায়।

সময়টা পঞ্চাশের দশকের শেষপ্রান্ত। ক্রিস্টিন সন্তানের মৃত্যুর পর বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। এক বন্ধুর সহায়তার তিনি সোহোর সেই দুঃসহ জীবন পেছনে ফেলে পালিয়ে চলে আসেন এবং কাজ নেন এক ক্যাবারে ক্লাবে।

সেখানেই ক্রিস্টিন কেলারের জীবন নাটকের নতুন অঙ্কের সূচনা হয় যা তাকে ঠেলে দিয়েছিলো দুনিয়া কাঁপানো স্ক্যান্ডালের ঘটনার আবর্তে।

ইউজেন আইভানভ

সেই ক্যাবারে ক্লাবটি ছিলো লন্ডন শহরের ধনী এবং ক্ষমতাবান মানুষদের আড্ডার জায়গা। মধ্যবয়সী পুরুষরা সেখানে ভীড় জমাতো নারীর উন্মোচীত শরীর দর্শনের জন্য। সেখানেই নাচতেন স্ক্রিস্টিন। আর নাচতে নাচতেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় এক জমির দালাল পিটার রিচম্যান ও তার বান্ধবী ম্যান্ডি রাইস ডেভিসের সঙ্গে। খুব দ্রুত ম্যান্ডির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ক্রিস্টিনের।এই দুই বান্ধবী ওই বারেই সম্পর্ক গড়ে তোলে লন্ডন শহরের ক্ষমতাবান মানুষদের সঙ্গে।

ক্রিস্টিনের বয়স তখন ১৯, ম্যান্ডির ১৬। সুন্দরী দুই নর্তকীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো স্টিভেন ওয়ার্ড নামে এক নামকরা হাঁড়ের ডাক্তারের, যাঁর ওঠাবসা ছিল সমাজের ওপরতলার বহু মানুষের। স্টিভেন ওয়ার্ড নিজে নারীসঙ্গ না করলেও এ ধরণের মেয়েদের সমাজের উঁচুতলার মানুষদের সঙ্গে নিয়মিত পরিচয় করিয়ে দিতেন। ক্রিস্টিন পরে তার বইতে লিখেছেন, ‘ওয়ার্ড কখনোই আমার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেনি।’
ওয়ার্ডের বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিলেন লর্ডস সভার সদস্য বিল অ্যাস্টর, ক্লিভডনে যাঁর আনন্দের ফোয়ারা ছিটকে দেয়া বাগানবাড়ি নিয়মিতভাবে ভীড় করতো অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েরা। বিল অ্যাস্টরই তাদের আমন্ত্রণ জানাতেন বৃটেনের উঁচু মহলের মানুষদের মনরঞ্জনের জন্য। এই ক্লিভড্‌নেই বিংশ শতাব্দীর সব চাইতে আলোচিত রাজনৈতিক কেলেংকারীর সূচনা হয়েছিলো। সূচনা হয়েছিলো কুখ্যাত এক প্রণয় অধ্যায়ের।
১৯৬১ সালের জুলাই মাসে ক্লিভডনে এক পার্টিতে আমন্ত্রণ পেয়ে গিয়েছিলেন আলোচিত এই প্রণয়-কান্ডের কেন্দ্রীয় চরিত্র ক্রিস্টিন কেলার। সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে সুইমিং পুলে নেমে সাঁতার কাটছিলেন ক্রিস্টিন। আর ঠিক তখনই সেখানে সস্ত্রীক উপস্থিত হন ব্রটেনের তৎকালীন যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জন প্রফুমো। ক্রিস্টিনকে দেখেই চোখ আটকে যায় বৃটিশ মন্ত্রীর। তিনি জড়িয়ে পড়েন ক্রিস্টিনের প্রেমে। এই একই সময়ে ইউজেন আইভানভ নামে রুশ দূতাবাসে কর্মরত নৌবাহিনীর একজন উর্ধ্বতন অ্যাটাশের প্রেমেও জড়িয়ে পড়েন ক্রিস্টিন। আইভানভ ছিলো দারুণ আকর্ষণীয় এক পুরুষ। কিন্তু এই ব্যক্তিটিই ছিলো তৎকালীন রুশ গোয়েন্দা বিভাগের একজন এজেন্ট। আইভানফের সঙ্গে মাত্র একটা রাতই কাটিয়েছিলেন ক্রিস্টিন। তারপর মন্ত্রীর সঙ্গেও তার প্রণয় পর্ব দ্রুত সমাপ্তির পথে আগায়। তাদের এই বিচ্ছেদও ঘটেছিলো সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশেই। কিন্তু বিধি বাম। ক্রিস্টিনের সঙ্গে মন্ত্রী এবং রুশ গুপ্তচরের গোপন সম্পর্কের গুঞ্জন ততদিনে স্থান করে নিয়েছে পত্রিকার পৃষ্ঠায়।
ক্রিস্টিন আর ইউযেন আইভানফ মাত্র একটা রাত একসঙ্গে কাটিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরেই জন প্রফিউমোর সঙ্গে ক্রিস্টিনের সম্পর্কের ইতি ঘটে – এবং সেটা ঘটে ।এই কাহিনির ইতিও সেখানেই ঘটার কথা ছিল। কিন্তু সরকারের একজন মন্ত্রী এবং সোভিয়েত এক গুপ্তচরের সম্পর্ককে ঘিরে নানা রসালো গুজব তখন লন্ডনের বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। এই গুঞ্জন ক্রমশ ডালপালা বিস্তার করতে শুরু করে। বৃটেনের সংসদে এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সাংসদদের জেরার মুখে পড়েন প্রফুমো। প্রথমে তিনি ক্রিস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করলেও টানা তিন মাস ধরে চলা বিতর্কের মুখে ভেঙ্গে পড়েন তিনি; স্বীকার করেন লুকিয়ে রাখা প্রেম উপাখ্যানের কথা। ১৯৬১ সালে বৃটেনের পত্রপত্রিকায় প্রফুমো ছাড়াও তখনকার প্রখ্যাত পপ সঙ্গীত শিল্পী লাকি গর্ডন আর এক খুচড়া মাস্তান জনি এজকম্বির সঙ্গে ক্রিস্টিনের প্রেমের গল্প খবরের শিরোণাম হয়। এসবের সূত্র ধরে ক্রিস্টিনের বিরুদ্ধে সরকারী ভাবে তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে রুশ গুপ্তচর আর মন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে মুখ খোলেন ক্রিস্টিন। দুনিয়াজুড়ে শুরু হয় মহা হৈচৈ। ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে এসব অভিযোগ মাথায় নিয়ে নেয় মাসের জন্য জেলে চলে যান ক্রিস্টিন। পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রফুমো। কমন্স সভায় দাঁড়িয়ে তাকে স্বীকার করতে হয় এর আগে ক্রিস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলেছিলেন তিনি। ওয়ার্ডের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় নারী সরবরাহের অভিযোগে। অবশ্য ওই মামলার রায় হওয়ার আগেই ওয়ার্ড কলঙ্ক থেকে নিষ্কৃতি পেতে আত্নহত্যা করে।
ক্রিস্টিন কেলারের বাকী জীবনও কুসুমাস্তীর্ণ হয়নি। বার বার নিজেকে একটি ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি করলেও বৃটিশ সমাজ তাকে ক্ষমা করেনি। এর পর দু দুবার বিয়ে করে সংসারি হতে চেয়েছেলেন ক্রিস্টিন। কিন্তু দুবারই তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। বেঁচে থাকার জন্য লন্ড্রীতে, কোনো পণ্যের বিক্রেতা হয়ে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু যখনই মালিকরা জানতে পেরেছে তার আসল পরিচয় তখনই চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন। এজন্য এক সময় নিজের পদবী পাল্টেও কাজের সন্ধানে ঘুরেছেন এই আলোচিত, সমালোচিত নারী।
নিজের জীবনের ক্ষত বিক্ষত সময়ের কাহিনী নিয়ে নিজেই বই লিখেছেন ক্রিস্টিন-দি ট্রুথ এট লাস্ট:মাই স্টোরি। তার জীবন নিয়ে বই লিখেছেন আরো অনেকে, তৈরী হয়েছে সিনেমা।
ক্রিস্টিন কেলার মন্তব্য করেছিলেন, ‘জীবনে এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাইনি যে ভালো, এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাইনি যাকে বিশ্বাস করা যায়’। এই বিশ্বাস করতে না-পারা আর বিশ্বাস হারানো বেদনা নিয়েই তিনি বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ দি গার্ডিয়ান, বিবিসি
ছবিঃ গুগল