বুক পকেটে হাসিকান্না

প্রিয়ম সেনগুপ্ত

বইটা উড়োজাহাজে চেপে কলকাতা থেকে উড়ে এলো হাতে, ‘বুক পকেটঃ ফার্স্ট ইনিংস’। দেখতে শুনতে বেশ নিরীহদর্শন। আকারে বুক পকেটের চাইতে একটু বড়, পেপারব্যাক। বেশ অনেকটা ব্যাঙ্গের ভঙ্গীতেই ঝকঝকে প্রচ্ছদে বুক পকেটের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।আগেই বলে নেয়া ভালো, বইটা এসেছে প্রাণের বাংলার সম্পাদকের ঠিকানায়। তিনিই বই হাতে দিয়ে নির্দেশ দিলেন আলোচনা লিখে দিতে। বইয়ের লেখক প্রিয়ম সেনগুপ্ত তার একজন বন্ধু লেখক। সম্পাদকের বন্ধু বলে কথা। আলাদা পালিশ দিয়ে তার বইয়ের আলোচনা লিখে দিতে হবে এমনটাই মনে মনে ভেবে নিলাম। কয়েকদিন লেখার টেবিলে পড়েছিলো বইখানা। ভাবছিলাম কোত্থেকে শুরু করবো, কী ভাবে করবো? ভাবতে ভাবতে একদিন পৃষ্ঠা উল্টাতে শুরু করলাম। প্রথমেই দৃষ্টি আটকে গেলো বইয়ের শেষ ফ্ল্যাপে লেখক পরিচিতির শেষ লাইনে। প্রিয়ম নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে লিখেছেন, কোলবালিশ ছাড়া আর কাউকে আপনজন হিসেবে ভরসা করেন না। চমকে উঠলাম লাইনটা পড়ে। একবিংশ শতাব্দীর মানব প্রজন্মের যাপিত জীবনের এক শ্বাশত ছবি ফুটে উঠলো চোখের সামনে, ফুটে উঠলো তাদের ঘরবাড়ি আর অন্দর মহলের ছবি।অতঃপর কলমবাজের ভূমিকা থেকে সরে এসে কলম্বাসের ভূমিকায় অবতীর্ণ আমি। শুরু করে দিলাম বইয়ের পৃষ্ঠায় কালো কালো অক্ষরের আড়ালে লেখক প্রিয়ম সেনগুপ্তকে খোঁজার অভিযান।

বইটার নামের সূত্র ধরে প্রথমেই বুকপকেট হাতড়াই। আর তাতেই ফরফর করে ম্যাজিকের পাখির মতো ডানা ঝাপটে বের হয়ে পড়ে একগুচ্ছ লেখা। বাক্যের বিন্যাসে, ব্যাঙ্গের ছুরির নিপুন চালনায় আর চোখ ছলছল করে ওঠো নিজের জীবনের গল্পে তারা অনুধাবনের আয়ত্তে আসার আগেই উড়ে যায়। একটি লেখা শেষ হতেই মনের মধ্যে অন্য আরেকটি লেখা পাঠ করার জন্য তৈরী হয় প্রবল তাড়না।

জীবনের ওপর নানা কৌণিকে আলো ফেলেছেন প্রিয়ম তার লেখায়। তার প্রক্ষিপ্ত সেই আলো কিন্তু শ্লেষ আর বিদ্রুপের ধারে ঝলসে ওঠা ছোরার মতোই। ভালোবাসা, দাম্পত্য, পরকীয়া, বাসযাত্রী দাদু, আফগান নাগরিক, বিরিয়ানি, বেশ্যার ছেলে, কাল্পনিক চরিত্র ফেকলুদা, চুম্বন-কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন প্রিয়ম। পুরো বইটা স্যাটায়ারের ঠোঙ্গার ভেতরে ঢোকানো থাকলেও লেখকের জীবনবোধ উপলব্ধি করা আর জীবনকে দেখার বহুমাত্রিক দৃষ্টিটা কিন্তু আড়ালে থাকেনি।

‘খানকীর ছেলে’ লেখাটা পড়তে পড়তে কান্না নামে মনের মধ্যে। ‘কলকাত্তা’ নামের লেখাটিদে দাউদ খান চরিত্রটি মনে করিয়ে দেয় মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’-এর কথা।অনেক বছর পর রবীন্দ্রনাথের গল্পের ভেতর থেকে বের হয়ে এসে জীবন পায় যেন কাবুলিওয়ালা।‘বাবাদিবস’ লেখাটাও শেষ লাইনে এসে বুকের মধ্যে জমা হয় দীর্ঘশ্বাস। প্রিয়মের বুক পকেটে জমা হওয়া এমনি সব গল্পের ঝুলি বেদনা জাগিয়ে তোলে দিন শেষে। আবার তার ‘বিরিয়ানি খাওয়ার নিয়ম-কানুন’ পড়ে হাসির ঝর্ণা অবিরল ধারায় গড়িয়ে পড়ে। খাদ্যরসিক না হলে বোধ হয় হাস্যরসিক হওয়া কঠিন। প্রিয়ম সেনগুপ্ত মনে হয় পাকস্থলী দিয়েও তার লেখার জয়যাত্রা পরিচালনা করতে আগ্রহী। বেদনা অথবা হাসি দুটো আবেগকেই ধারণ করতে তিনি সমান দক্ষ। হাসির গল্পের নোটিশ ঝুলিয়ে রেখে নিপুন কৌশলে উন্মোচীত করেন তিনি দুঃখের নাটকের পর্দা। আর তাতে হাসির ফোয়ারার মাঝেও লেগে থাকে কান্নার হীরক কুচি।

শুনেছি সাংবাদিকতা পেশার পাশাপাশি তিনি একজন মিউজিশিয়ান এবং সমাজসেবক। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা অসুস্থ মানুষের জন্য জোগাড় করেন রক্ত আর চিকিৎসার অর্থ।তার কলম আর লেখা বেঁচে থাকুক আরো আরো অনেক দিন এই কামনাই করি।

বইটি প্রকাশ করেছে কলকাতা থেকে দ্য কাফে টেবিল। প্রচ্ছদের পরিকল্পনা করেছেন পূজা মৈত্র সেনগুপ্ত। সঙ্গে আছেন অম্লান সরকার, সংযুক্ত পাল ও তৌসিফ হক।

ইরাজ আহমেদ